শত বছর পেরিয়েও রক্তকরবী
সময়কে প্রশ্ন করা নাটক

নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ের রক্তকরবীতে নন্দিনী চরিত্রে অপি করিম
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘রক্তকরবী’ নাটকটি গত আগস্ট মাসে মঞ্চায়ন করেছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্রামা অ্যান্ড থিয়েটার ফোরাম। অন্যদিকে গত রবিবার অস্ট্রেলিয়ার সিডনির ব্রায়ান ব্রাউন থিয়েটার অ্যান্ড ফাংশন সেন্টারে নাটকটি মঞ্চায়ন করেছে আঙ্গিক থিয়েটার। গত সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে ঢাকার নাগরিক নাট্যাঙ্গন মঞ্চে এনেছে ‘দুই পাখি ও নন্দিনী’ নামে আরেকটি নাটক, যেখানে রক্তকরবী নাটকের নন্দিনী চরিত্রের মধ্য দিয়ে খাঁচা ভাঙার বার্তা দেওয়া হয়েছে। ১৯২৪ সালে প্রথম ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল ‘রক্তকরবী’। এরপর ১৯২৬ সালে পুস্তক আকারে প্রকাশের পর থেকে ১০০ বছর পার হলেও নাটকটি যেন নতুন সময়ে নতুন ভাষায় আরও আধুনিক হয়ে উঠেছে। নাট্যবোদ্ধাদের মতে, যক্ষপুরী কিংবা নন্দিনীর প্রতীকী চরিত্রগুলো চিরন্তন। যুগে যুগে যখনই রাষ্ট্র, পুঁজি কিংবা শক্তির অহংকার মানুষের স্বাধীনতাকে রুদ্ধ করতে চায়, তখনই ‘রক্তকরবী’ নতুন প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে নাট্যমঞ্চে ফিরে আসে। নাট্যজন লাকী ইনামের ভাষায়, ‘রক্তকরবীর নন্দিনী শুধু একটি চরিত্র নয়— সে পুরো নাটকের প্রাণ আর যৌবনের প্রতীক। নন্দিনীর দর্শন হলো মুক্তি আর মানবতা।’ প্রকাশের আগেই নাটকটি মঞ্চস্থ করার প্রবল আগ্রহ ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। তবে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে তার জীবদ্দশায় প্রথম এটি আনে ‘দ্য ট্যাগোর ড্রামাটিক গ্রুপ’। বিহার ভূমিকম্পের ত্রাণ তহবিলের সহায়তায় ১৯৩৪ সালের ৬ এপ্রিল কলকাতার নাট্যনিকেতনে প্রমথনাথ ঠাকুরের প্রযোজনায় নাটকটির প্রথম প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। পরে ১৯৫৪ সালে কলকাতার ‘বহুরূপী’র ব্যানারে শম্ভু মিত্রের নির্দেশনায় ‘রক্তকরবী’র প্রথম ঐতিহাসিক সফল মঞ্চায়ন ঘটে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘রক্তকরবী’ নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছেন শ্রেয়শ্রী সরকার। তিনি বলেছেন, ‘রক্তকরবী’ আমার কাছে শুধু একটি নাটক নয়; এটি মানুষ, ক্ষমতা এবং মুক্তির অনন্ত অনুসন্ধানের এক নাট্যভাষা। সময়ের সঙ্গে শোষণের রূপ বদলায়, ক্ষমতার মুখোশ বদলায়, কিন্তু মানুষের স্বাধীন সত্তাকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা একই থাকে। তাই এই নাটক আজও আমাদের সময়কে গভীরভাবে প্রশ্ন করে।’এই সময়ে কেন রক্তকরবী? তার জবাবও মেলে শ্রেয়শ্রীর কথায়— “রক্তকরবীকে কোনো ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে নয়, সমকালীন বাস্তবতার আলোয় পুনরায় পাঠ করার চেষ্টা করা হয়েছে। উন্নয়নের ভাষ্য, ভোগবাদ, অদৃশ্য ক্ষমতার কাঠামো এবং মানুষের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার ভেতর আমরা যক্ষপুরীকে নতুন করে আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছি। আমাদের কাছে যক্ষপুরী কোনো দূরবর্তী কল্পলোক নয়। এটি আমাদের চারপাশের সমাজেরই এক প্রতীক। এই ভাবনাকে প্রকাশ করতে আমরা শরীর, কোরাস, সংগীত, আলো, প্রতীকী দৃশ্যবিন্যাস এবং সমকালীন মঞ্চভাষাকে একত্র করেছি। উদ্দেশ্য, রবীন্দ্রনাথকে আধুনিক করে তোলা নয়; বরং তার চিন্তার সঙ্গে আমাদের সময়ের একটি সৃজনশীল সংলাপ নির্মাণ করা। আজ, যখন মানুষ উৎপাদনের এককে পরিণত হচ্ছে, তখন ‘রক্তকরবী’ আমাদের আবার মানুষকে তার স্বপ্ন, ভালোবাসা এবং প্রতিবাদের শক্তিকে চিনে নিতে শেখায়।” নাট্যকার ও গবেষক অপু মেহেদী আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘লোভ, ধনতন্ত্রের স্পৃহা ও ক্ষমতার মধ্যে চিরকাল টিকে থাকার যে আকাঙ্ক্ষা— রক্তকরবী নাটকে রাজা চরিত্রটি তারই প্রতীক। এটি আসলে একটি গভীর সামাজিক অসুস্থতার লক্ষণ। যেকোনো মূল্যে টিকে থাকার এই বাসনা আজও আমাদের দেশ ও সমাজে নানা রূপে বিদ্যমান। ফলে রক্তকরবীও ভীষণ রকম প্রাসঙ্গিক।’
যখনই রাষ্ট্র, পুঁজি কিংবা শক্তির অহংকার মানুষের স্বাধীনতাকে রুদ্ধ করতে চায়, তখনই ‘রক্তকরবী’ ফিরে আসে
বাংলাদেশের মঞ্চে রক্তকরবী নিয়ে অপু মেহেদীর লেখা একটি গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নাট্যমঞ্চে রক্তকরবীর আগমন শুধু সাহিত্যচর্চা ছিল না; এটি ছিল এক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ইতিহাস। ১৯৫৭ সালের নভেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ছাত্রী হল কর্মপরিষদ’-এর উদ্যোগে এবং অধ্যাপক নীলিমা ইব্রাহিমের নির্দেশনায় পূর্ববঙ্গে প্রথম ‘রক্তকরবী’ মঞ্চস্থ হয়। এরপর ১৯৫৮ সালে ‘ড্রামা সার্কেল’ মকসুদুস সালেহীনের নির্দেশনায় এবং ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকীতে বজলুল করীম ও মকসুদ সালেহীনের যৌথ নির্দেশনায় এটি মঞ্চে আনে। পাকিস্তানি শাসনামলে রবীন্দ্রসংগীত ও রবীন্দ্রসাহিত্যের ওপর বিভিন্ন বিধিনিষেধের মুখে ‘রক্তকরবী’ হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক মুক্তির হাতিয়ার। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ১৯৭০ সালের ৩ জানুয়ারি বাংলা একাডেমি মাঠে নির্মিত অস্থায়ী মঞ্চে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি সংসদ’-এর পরিবেশনায় সৈয়দ হাসান ইমামের নির্দেশনায় নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। ১০ হাজারের বেশি দর্শকের সামনে অনুষ্ঠিত সেই প্রদর্শনীকে বাংলাদেশের আধুনিক নাট্য-ইতিহাসে এক মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে মোস্তফা মনোয়ারের নির্দেশনায় নাটকটি প্রথম টেলিভিশন নাট্যরূপ পায়। ১৯৭৪ সালে চট্টগ্রামের সাধারণ রঙ্গশালার দ্বিশতবার্ষিকীতে কামাল এ. খানের নির্দেশনায় এবং ১৯৭৮ সালে সুশান্ত সাহার নির্দেশনায় ‘ঢাকা নন্দনিক’ নাটকটি মঞ্চে নিয়ে আসে। পরে ১৯৯৬ সালে চট্টগ্রামের ‘তির্যক নাট্যদল’ আহমেদ ইকবাল হায়দারের নির্দেশনায় ‘রক্তকরবী’ মঞ্চায়ন শুরু করে। ২০০১ সালে ‘নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়’ আতাউর রহমানের নির্দেশনায় নাটকটি নতুন শতকের দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করে, যেখানে খালেদ খান ও অপি করিমের অভিনয় প্রশংসিত হয়। ২০০৮ সালে ‘প্রাঙ্গণেমোর’ নাট্যদল নূনা আফরোজের নির্দেশনায় নাটকটির মঞ্চায়ন শুরু করে। বিভিন্ন নাট্যদলের স্কুলিং প্রোগ্রাম এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও ‘রক্তকরবী’ নিয়মিত মঞ্চায়িত হয়ে আসছে। ১৯৯০ সালে ‘থিয়েটার স্কুল’-এর প্রথম ব্যাচের সমাপনীতে ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশনায়, ২০১০ সালে চট্টগ্রামের ‘ফেইম স্কুল অব ড্রামা’-য় অসীম দাশের নির্দেশনায় এবং ২০২৪ সালে ‘প্রাচ্যনাট স্কুল অব অ্যাক্টিং অ্যান্ড ডিজাইন’-এ শওকত হোসেন সজীবের নির্দেশনায় নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। ২০২৩ সালে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ‘সিনে অ্যান্ড ড্রামা ক্লাব’ তানভীর নাহিদ খানের নির্দেশনায় ‘রক্তকরবী’ উপস্থাপন করে। পরে ২০২৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফর্ম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ (নির্দেশনা: তানভীর নাহিদ খান) এবং ইউল্যাবের বাংলা বিভাগ (নির্দেশনা: দিদার মুহাম্মদ) নাটকটি মঞ্চে আনে। এ ছাড়া ২০২৬ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ (নির্দেশনা: রেজা আরিফ) নাটকটি মঞ্চায়ন করেছে।



