শতবর্ষে পথের দাবি: নিষিদ্ধ ও নমস্য

প্রতিকৃতি: ফারজিন জামান খান
ভারতীর প্রেমেই পড়েছিলাম বলা যায়। আমি তখন কৈশোরোত্তীর্ণ। আগে পিছে শরৎবাবুর অনেক উপন্যাস পড়েছি। পথের দাবি সেগুলোর মতো নয়। এখানে তত্ত্বের কচকচি, ভারী ভারী সব কথা। তবু ভারতী, পথের দাবি আমাকে টেনে রেখেছিল ভারতীকে দিয়ে। ‘অপদার্থ’ অপূর্ব তো নয়ই, সুপারম্যান সব্যসাচীও নয়।
কী আছে ভারতীর মধ্যে? তার দেশপ্রেম, কর্মনিষ্ঠা, সেবাপরায়নতার বাইরেও ভালবাসার এক আশ্চর্য অপরিসীম ক্ষমতা যা মনকে মোহগ্রস্ত করে তোলে। ভারতীর মধ্যে, সব্যসাচীর কথা ধার করেই বলতে পারি, ‘যে হৃদয় স্নেহে প্রেমে করুণায় মাধুর্য্যে এমন পরিপূর্ণ হয়ে উঠেচে, সে আমার প্রয়োজনকে অতিক্রম করে বহু উর্ধে চলে গেছে।’
তবে উপন্যাসের মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবের যে আগুন তার ওমটা যে উপভোগ করিনি তা নয়। সাহেবদের বেঞ্চিতে বসার অপরাধে একরকম গলা ধাক্কা খেয়ে স্বাধীনতার প্রয়োজনটা টের পায় অপূর্ব এবং যোগ দেয় পথের দাবী নামক সামাজিক সংগঠনে, কারখানার গরীব শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন যাদের আপাতলক্ষ্য, চূড়ান্ত লক্ষ্য স্বাধীনতা। এই সংগঠনেরই নেতা সব্যসাচী ওরফে ডাক্তারবাবু স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সুভাষচন্দ্রের লাইনেই হাটতে চান, রক্তপাতে তার আপত্তি নেই। কিন্তু ভারতীর যথেষ্ট আস্থা গান্ধীর মতো রাজনীতিবিদদের উপর, নিয়মতান্ত্রিক উপায়েই দেশের ভালো করা সম্ভব বলে মনে করে সে। অার মাতৃভক্ত, কুসংস্কারাচ্ছন্ন অপূর্বর জীবনের লক্ষ্যই যেন ব্রাক্ষ্মন হয়ে টিকে থাকা। তার ভেতর দেশপ্রেম আছে, কিন্তু সামান্য আঘাতেই তা উবে যায়, এমনকি যুক্ত হয় কৃতঘ্নতা। তারপরেও এই অপূর্ব বাবুকেই ভালোবাসে ভারতী। মায়ের মৃত্যুর পর অবশ্য ভারতীর 'ভালো কাজের' সঙ্গী হয় অপূর্ব।
ভারতী এবং ডাক্তারের কথোপকথনে শরৎচন্দ্র দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক প্রস্তাবনা তুলে ধরেছেন উপন্যাসে। লেখকের ঝোঁক যে সব্যসাচীর দিকে, অন্তত ওই পথটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেন, সেটা সব্যসাচীর চরিত্রচিত্রণেই স্পষ্ট। গান্ধীর অহিংস আন্দোলনে সমাজের এতদিনের পুরনো শেকল ভেঙে ফেলা সম্ভব, এটা শরৎচন্দ্রও বিশ্বাস করতেন না। মনে করতেন, আঘাত দিয়েই সমাজকে বদলাতে হবে। সূর্যসেনের মতো বিপ্লবীরা যখন স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছিলেন তখন শরৎচন্দ্র মন্তব্য করেছিলেন, “পথের দাবীর বাস্তব প্রতিফলন ঘটাচ্ছে সূর্যসেন। আমার আশীর্বাদ রইলো তার সাথে।”
শরৎচন্দ্রের এই মনোভাবই ফুটে উঠেছে সব্যসাচীর মাধ্যমে। তার নানারকম ক্যারিশমা আর আগুনঝড়া বক্তব্য নিয়ে উপন্যাসটা হয়ে উঠেছে বিপ্লবীদের মেনিফেস্টো। তাই অনিবার্যভাবে প্রকাশের পরপরই 'পথের দাবী' উপন্যাস নিষিদ্ধ করে ব্রিটিশ সরকার।
দুই.
কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতা যেরকম ছাপার কাগজে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল কিংবা তার ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ শিকার হয়েছিল রাজরোষের, উপন্যাসের ক্ষেত্রে অনেকটা সেরকমই হয়েছিল পথের দাবি প্রকাশনায়। ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ৪১৬ পৃষ্ঠার উপন্যাসটি বাজারে আসে। ৬৭ হ্যারিসন রোডের কটন প্রেস থেকে সত্যকিঙ্কর ব্যানার্জি কর্তৃক মুদ্রিত এবং ৭৭ আশুতোষ মুখার্জি রোড, ভবানীপুর কলকাতা থেকে উমাপ্রসাদ মুখার্জি কর্তৃক প্রকাশিত। সাদা কাগজে বোর্ড বাঁধাই করা বইটির প্রচ্ছদে লাল অক্ষরে লেখা ছিল- ‘পথের দাবী’। দাম তিন টাকা মাত্র। অথচ এই বই পঞ্চাশ, একশো, এমনকি দুশো টাকা দিয়ে কেনার জন্যও হুড়োহুড়ি পড়ে গেল।
বিপ্লবীদের মধ্যে প্রবল আলোড়ন তুলেছিল পথের দাবি। প্রকাশের কিছুদিন পরে ব্রিটিশ পুলিশ কমিশনার শরৎচন্দ্রকে বলেছিলেন, ‘জানেন শরৎবাবু, পথের দাবী লিখে আপনি আমাদের কত বড় ক্ষতি করেছেন। যেখানেই আমরা বিপ্লবীদের ধরতে যাই, দেখি তাদের কাছে অন্তত দু’টি বই নিশ্চয়ই আছে। একটি ‘গীতা’ আর অপরটি ‘পথের দাবী’। এ বই বিপ্লবীদের ক্ষেপিয়ে তুলেছে।’ বই পড়েও অনেক তরুণ-তরুণী বিপ্লবের পথে নামতে শুরু করেছে তখন।
বহিরাবরণে নিতান্তই মামুলি হলেও এর পাতায় পাতায় কালো হরফে স্বাধীনতার সূর্যোদয়ের যে আকাঙ্ক্ষা রোপিত হয়েছিল তা বিপুল উন্মাদনা তৈরি করেছিল বিপ্লবীদের মধ্যে আর ক্ষুদ্ধ করে তুলেছিল বৃটিশরাজকে।
মজার ব্যাপার, ধারাবাহিকভাবে পথের দাবি যখন বঙ্গবাণীতে ছাপা হয় তখন কিন্তু এতোটা সাড়া পড়েনি। সরকার বিষয়টি যে আমলে নেয়নি তা নয়, দ্রুত এর অনুবাদ করে উপন্যাসে রাষ্ট্রদ্রোহের উপাদান আছে কী না তা খতিয়ে দেখার উদ্যোগও নিয়েছিল। কিন্তু ২৪ পর্বে গোটা উপন্যাস ছাপা হওয়ার কোন পর্যায়েই তারা এ নিয়ে উচ্চবাচ্য করেনি।
গোল বাধল উপন্যাসটি গ্রন্থাকারে প্রকাশের সময়। এমসি সরকার অ্যান্ড সন্সের মালিক সুধীরচন্দ্র সরকার বইটি ছাপানোর আগ্রহ দেখান। এমনকি নগদ ১ হাজার টাকা সম্মানীও পাঠিয়ে দেন শরৎচন্দ্রকে। কিন্তু পুরো পাণ্ডুলিপি পড়ার পর সুধীরবাবুর কপালে একটু চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সেটা আরো গভীর হলো তার আইনজীবীর সতর্কবার্তায়- এ উপন্যাসে রাষ্ট্রদ্রোহের উপাদান আছে। বই ছাপালে মামলা অনিবার্য। আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করে সুধীরচন্দ্র তখন পাণ্ডুলিপির কিছু অংশ বদলে দেয়ার অনুরোধ করলেন শরৎচন্দ্রের কাছে। শরৎচন্দ্র বললেন, ‘একটি শব্দও না।’
শেষে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ছেলে উমাপ্রসাদ মুখার্জী এগিয়ে এলেন। শরৎচন্দ্র তাঁকে বললেন, ‘ছাপিয়ে যদি জেল হয় তোমার’? উমাপ্রসাদ হেসে বললেন, ‘জেল হলে তো একা প্রকাশকেরই হবে না। লেখকেরও হবে। দুজনে একসঙ্গে জেলে থাকব। আপনার সঙ্গে থাকা- সে তো মহাভাগ্যের কথা।’
তবে বিট্রিশরাজ লেখক-প্রকাশকের দিকে না গিয়ে শুধু বইটি বাজেয়াপ্ত করল, ১৯২৭ সালের ১৩ জানুয়ারি, ততদিনে প্রায় তিন হাজার বই পাঠকের, বিশেষ করে বিপ্লবীদের হাতে চলে গেছে। নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে পাঠকেদের মধ্যে বইটি নিয়ে আগ্রহ আরো বেড়ে গিয়েছিল। অজ্ঞাত প্রেস থেকে নূতন সংস্করণ বার হয়ে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। উমাপ্রসাদ পরে লিখেছেন, ‘হাতে-লেখা সম্পূর্ণ বই-এর কপিও আমি দেখেছি।’
বাজার থেকে ব্রিটিশ সরকার হাতে পেল মাত্র একখান কপি। তাই নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণের পর সে বছর সরকার প্রকাশিত বর্ষপঞ্জিতে লেখা হলো: বইটির প্রায় সব পাতায় অত্যন্ত শক্তিশালী রাষ্ট্রদ্রোহের উপাদান রয়েছে।
কলকাতার পুলিশ কমিশনার বাংলা সরকারের চিফ সেক্রেটারিকে কাগজে-কলমে জানিয়ে দেন- ‘বইটি ফৌজদারি কার্যবিধির ৯৯/এ ধারা অনুসারে বাজেয়াপ্ত করার যোগ্য এবং ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪/এ অনুসারে লেখক ও মুদ্রাকরকে অভিযুক্ত করা যেতে পারে।’ চিফ সেক্রেটারি আরেক কাঠি সরেস। তিনি এ রিপোর্টের উপর তার মন্তব্য লিখে দেন- ‘এটা একটা বিষাক্ত সৃষ্টি। বইটিকে অভিযুক্ত করা যায় কিনা, সে সম্পর্কে আমাদের উচিত অ্যাডভোকেট জেনারেলের মতামত নেয়া।’
অ্যাডভোকেট জেনারেল স্যার ব্রজেন্দ্রনাথ মিত্র বাঙালি। শরৎচন্দ্রের খ্যাতির কথা তার অবিদিত ছিল না। কিন্তু তিনি তো বৃটিশের চাকুরি করেন। বইটি পড়ে তাই লেখকের সাহিত্যকৃতির উল্লেখ করার পরে তিনিও মন্তব্য করেন, ‘উপন্যাস হিসেবে বইটি শিল্পগুণসম্পন্ন নয়। …এ বইয়ের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ঘৃণা ও অসন্তোষ সৃষ্টি করা। …এই বইয়ে সরকারের বিরুদ্ধে ঘৃণার উদ্রেগ করার অপচেষ্টা যথেষ্টভাবে পরিষ্কার... আমি মনে করি এই বইটি ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪/এ ধারার আওতায় পড়ে এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৯৯/এ ধারা অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়ার যোগ্য।’
ব্যবস্থা নেওয়ার উত্তম উপায় হতো লেখক ও প্রকাশকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করা। কিন্ত ও পথে হাটলেন না ব্রিটিশ সরকার। কেন? তার উত্তর আছে ১৪ ডিসেম্বর ১৯২৬ সালে করা বাংলা সরকারের চিফ সেক্রেটারির নোটে:
‘…বর্তমান অবস্থায় এবং অ্যাডভোকেট জেনারেলের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে আমি ‘পথের দাবী’ নামক বইটিকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৯৯/এ ধারার বিধান অনুযায়ী বাজেয়াপ্ত করার পক্ষে, দণ্ডবিধির ১২৪/এ ধারা অনুযায়ী মামলা দায়ের করার পক্ষে নই। একটি মামলার সাফল্য নিয়ে আমার মনে অনেক প্রশ্ন আছে, তার মানে এই নয় যে আমি অ্যাডভোকেট জেনারেলের সাথে দ্বিমত পোষণ করছি— কারণ একটি মামলায় আদালত চাইলে অভিযুক্তকে বেনিফিট অব ডাউটের সুযোগে অব্যাহতি দিয়ে দিতে পারে। কিন্তু ৯৯/এ ধারার অপরাধে ৯৯/বি-তে আনীত অভিযোগে তিনজন বিচারকের বেঞ্চে অভিযোগটি উত্থাপিত হবে। সেখানে লেখক কিংবা মুদ্রণকারীকে সাজা দেবার প্রশ্ন আসবে না, কেবল বিবেচনা করা হবে প্রকাশনাটিতে রাষ্ট্রদ্রোহের উপাদান আছে কি নেই। ’
অতঃপর পুলিশ কমিশনার, অ্যাডভোকেট জেনারেল এবং চিফ সেক্রেটারি সহমত পোষণ করায় বাংলা সরকার ১৯২৭ সালের ৪ জানুয়ারি শ্রী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখিত ‘পথের দাবী’ গ্রন্থটিকে বাজেয়াপ্ত করার ঘোষণা দিল। ১৩ জানুয়ারি ক্যালকাটা গেজেট নিষিদ্ধকরণের আদেশটি ছাপাল।
তিন.
বইটি নিষিদ্ধ হওয়ার পর তীব্র সমালোচনা হলো। বাংলার সংসদে নেতাজি সুভাষ চন্দ্রসহ অনেকেই প্রতিবাদ করলেন। কোন কাজ হলো না। বিদেশ থেকেও প্রতিক্রিয়া এলো। রোমাঁ রোলাঁ মন্তব্য করলেন, ‘শরৎচন্দ্র একজন প্রথম শ্রেণির শিল্পী। বাংলা সরকারের কিছু কর্তাব্যক্তি শরৎচন্দ্রের একটি উপন্যাসে রাজদ্রোহের গন্ধ পেয়েছেন। সুতরাং এটি এমন বই- যা সমাজের পক্ষে বিপজ্জনক, নাকি আমলাতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক?’
পত্রপত্রিকায়ও লেখালেখি হলো। কল্লোল পত্রিকা লিখল, ‘বাংলাদেশের একখানা উপন্যাসকেও শেষকালে খাস-দখলে টানিতে হইল! বাংলা সাহিত্যের পরম ক্ষতি যে একখানি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস এরূপে বন্ধ হইয়া গেল।’ ‘আত্মশক্তি’ লিখেছে, ‘শরৎচন্দ্র সত্যই বলিয়াছেন, আমাদের এ পরাধীন দেশে সাহিত্যের সম্যক স্ফূর্তি ও প্রকাশ সম্ভব নহে। সরকারের হস্তে তাঁহার এই প্রথম পরাজয়ে, কিংবা বিজয়ে, আমরা তাঁহাকে আন্তরিক অভিনন্দিত করিতেছি। তাঁহার লেখনী হইতে আরও দাবী প্রকাশিত হউক, ইহাই আকাঙ্ক্ষা।’
শরৎচন্দ্র রবীন্দ্রনাথকে ধরলেন, ‘পথের দাবী’র প্রকাশ ও প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নিতে কবিগুরু যেন সরকারের ওপর চাপ দিন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সম্মত হলেন না। এ নিয়ে দুজনের একটু মন কষাকষিও হলো। রবীন্দ্রনাথ চিঠি লিখলেন ২৭ মাঘ, ১৩৩৩। নিচে পুরো চিঠি উদ্ধৃত করা হলো:
কল্যাণীয়েষু,
তোমার ‘পথের দাবী’ পড়া শেষ করেছি। বইখানি উত্তেজক। অর্থাৎ ইংরেজের শাসনের বিরুদ্ধে পাঠকের মনকে অপ্রসন্ন করে তোলে। লেখকের কর্তব্যের হিসাবে এটা দোষের না হতে পারে— কেননা লেখক যদি ইংরেজরাজকে গর্হণীয় মনে করেন তাহলে চুপ করে থাকতে পারেন না। কিন্তু চুপ করে না থাকার যে বিপদ আছে, সেটুকু স্বীকার করাই চাই। ইংরেজরাজ ক্ষমা করবেন এই জোরের উপরেই ইংরেজরাজকে আমরা নিন্দা করব, সেটাতে পৌরুষ নেই। আমি নানা দেশ ঘুরে এলাম, আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তাতে এই দেখলেম, একমাত্র ইংরেজ গভর্নমেন্ট ছাড়া স্বদেশী বা বিদেশী প্রজার বাক্যে বা ব্যবহারে বিরুদ্ধতা আর কোন গভর্নমেন্টই এতটা ধৈর্যের সঙ্গে সহ্য করবে না। নিজের জোরে নয়, পরন্তু সেই পরের সহিষ্ণুতার জোরেই যদি আমরা বিদেশী রাজত্ব সম্বন্ধে যথেচ্ছ আচরণের সাহস দেখাতে চাই তবে সেটা পৌরুষের বিড়ম্বনা মাত্র— তাতে ইংরেজরাজের প্রতিও শ্রদ্ধা প্রকাশ করা হয়, নিজের প্রতি নয়। রাজশক্তির আছে গায়ের জোর, তার বিরুদ্ধে কর্তব্যের খাতিরে যদি দাঁড়াতেই হয়, তাহলে অপরপক্ষে থাকা উচিত চারিত্রিক জোর— অর্থাৎ আঘাতের বিরুদ্ধে সহিষ্ণুতার জোর। কিন্তু আমার সেই চারিত্রিক জোরটাই ইংরেজরাজের কাছে দাবী করি, নিজের কাছে নয়। তাতে প্রমাণ হয় যে, মুখে যাই বলি নিজের অগোচরে ইংরেজকে আমরা পূজা করি— ইংরেজকে গাল দিয়ে কোনো শাস্তি প্রত্যাশা না করার দ্বারাই সেই পূজার অনুষ্ঠান। শক্তিমানের দিক দিয়ে দেখলে তোমাকে কিছু না বলে তোমার বইকে চাপা দেওয়া প্রায় ক্ষমা। অন্য কোন প্রাচ্য বা প্রতীচ্য বিদেশী রাজার দ্বারা এটি হত না। আমরা রাজা হলে যে হতই না, সে আমাদের জমিদারের ও ভারতীয় রাজন্যের বহুবিধ ব্যবহারে প্রত্যহই দেখতে পাই। কিন্তু তাই বলে কি কলম বন্ধ করতে হবে? আমি তা বলিনে— শাস্তিকে স্বীকার করেই কলম চলবে। যে কোন দেশেই রাজশক্তিতে প্রজাশক্তিতে সত্যকার বিরোধ ঘটেছে, সেখানে এমনিই ঘটেছে— রাজবিরুদ্ধতা আরামে নিরাপদে থাকতে পারে না এই কথাটা নিঃসন্দেহে জেনেই ঘটেছে।
তুমি যদি কাগজে রাজবিরুদ্ধ কথা লিখতে, তাহলে তার প্রভাব স্বল্প ও ক্ষণস্থায়ী হত— কিন্তু তোমার মতো লেখক গল্পচ্ছলে যে কথা লিখবে তার প্রভাব নিয়ত চলতেই থাকবে। দেশে ও কালে তার ব্যাপ্তির বিরাম নেই— অপরিণত বয়সে বালক-বালিকা থেকে আরম্ভ করে বৃদ্ধরা পর্যন্ত তার প্রভাবের অধীনে আসবে। এমন অবস্থায় ইংরেজরাজ যদি তোমার বই প্রচার বন্ধ করে না দিত তাহলে এই বোঝা যেত যে সাহিত্যে তোমার শক্তি ও দেশে তোমার প্রতিষ্ঠা সম্বন্ধে তার নিরতিশয় অবজ্ঞা ও অজ্ঞতা। শক্তিকে আঘাত করলে তার প্রতিঘাত সইবার জন্যে প্রস্তুত থাকতে হবে। এই কারণেই সেই আঘাতের মূল্য— আঘাতের গুরুত্ব নিয়ে বিলাপ করলে সেই আঘাতের মূল্য একেবারেই মাটি করে দেওয়া হয়।
ইতি-২৭ মাঘ ১৩৩৩
১০ই ফেব্রুয়ারী, ১৯২৭।
তোমাদের শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
রবীন্দ্রনাথের চিঠিতে শরৎচন্দ্র সন্তুষ্ট হতে পারেননি সেটা স্পষ্ট। তিনি জবাব লিখলেন ২ ফাগ্লুন, ১৩৩৩।
শ্রীচরণেষু,
আপনার পত্র পেলাম। বেশ তাই হোক। বইখানা আমার নিজের বলে একটুখানি দুঃখ হবারই কথা, কিন্তু সে কিছুই নয়। আপনি যা কর্তব্য এবং উচিত বিবেচনা করেছেন তার বিরুদ্ধে আমার অভিমানও নেই, অভিযোগও নেই। কিন্তু আপনার চিঠির মধ্যে অন্যান্য কথা যা আছে সে সম্বন্ধে আমার দুই-একটা প্রশ্নও আছে, বক্তব্যও আছে। কৈফিয়তের মত যদি শোনায় সে শুধু আপনাকেই দিতে পারি।
আপনি লিখেছেন ইংরেজরাজের প্রতি পাঠকের মন অপ্রসন্ন হয়ে ওঠে। ওঠবারই কথা। কিন্তু এ যদি আমি অসত্য প্রচারের মধ্যে দিয়ে করবার চেষ্টা করতাম, লেখক হিসেবে তাতে আমার লজ্জা ও অপরাধ দুইই ছিল। কিন্তু জ্ঞানতঃ তা আমি করিনি। করলে Politician-দের Propaganda হত, কিন্তু বই হত না। নানা কারণে বাংলা ভাষায় এ ধরনের বই কেউ লেখে না। আমি যখন লিখি এবং ছাপাই তার সমস্ত ফলাফল জেনেই করেছিলাম। সামান্য অজুহাতে ভারতের সর্বত্রই যখন বিনা বিচারে অবিচারে অথবা বিচারের ভান করে কয়েদ নির্বাসন প্রভৃতি লেগেই আছে তখন আমিই যে অব্যাহতি পাব, অর্থাৎ রাজপুরুষেরা আমাকেই ক্ষমা করে চলবেন—এ দুরাশা আমার ছিল না। আজও নেই। কিন্তু বাঙলাদেশের গ্রন্থকার হিসাবে গ্রন্থের মধ্যে যদি মিথ্যার আশ্রয় না নিয়ে থাকি এবং তৎসত্ত্বেও যদি রাজরোষে শাস্তি ভোগ করতে হয় তো করতেই হবে—তা মুখ বুজেই করি বা অশ্রুপাত করেই করি, কিন্তু প্রতিবাদ করা কি প্রয়োজন নয়?
রাজবন্দিরা জেলের মধ্যে দুধ, ছানা, মাখন পায় না। চিঠি লিখে কাগজে কাগজে রোদন করায় আমি লজ্জা বোধ করি। কিন্তু মোটা ভাতের বদলে যদি Jail authority-রা ঘাসের ব্যবস্থা করে, তখন হয়ত তাদের লাঠির চোটে তা চিবোতে পারি, কিছু ঘাসের ড্যালা কণ্ঠ রোধ না করা পর্যন্ত অন্যায় বলে প্রতিবাদ করাও আমি কর্তব্য মনে করি।
কিন্তু বইখানা আমার একার লেখা। সুতরাং দায়িত্ব একার। যা বলা উচিত বলে মনি করি, তা বলতে পেরেছি কিনা এইটেই আসল কথা। নইলে ইংরাজ সরকারের ক্ষমাশীলতার প্রতি আমার কোন নির্ভরতা ছিল না। আমার সমস্ত সাহিত্যসেবাটাই এই ধরনের। যা উচিত মনে করেছি তাই লিখে গেছি। আমার প্রশ্ন ইংরাজ রাজশক্তির এ বই বাজেয়াপ্ত করবার Justification যদি থাকে পরাধীন ভারতবাসীর পক্ষে Protest করার Justification তেমনি আছে।
আমার প্রতি আপনি এই অবিচার করেছেন যে আমি যেন শাস্তি এড়াবার ভয়েই প্রতিবাদের ঝড় তুলতে চেয়েছি এবং সেই ফাঁদে নিজে গা ঢাকা দেবার চেষ্টা করেছি। কিন্তু বাস্তবিক তা নয়। দেশের লোকে যদি প্রতিবাদ না করে আমাকে করতেই হবে। কিন্তু সে হৈচৈ করে নয়, আর একখানা গ্রন্থ লিখে।
আপনি যদি শুধু আমাকে এইটুকু আদেশ দিতেন যে, এ বই প্রচারে দেশের সত্যকার মঙ্গল নেই, সেই আমার সান্ত্বনা হোতো। মানুষের ভুল হয়, আমারও হয়েছে মনে করতাম।
আমি কোনরূপ বিরুদ্ধ ভাব নিয়ে এ চিঠি আপনাকে লিখিনি, যা মনে এসেছে তাই অকপটে আপনাকে জানালাম। মনের মধ্যে যদি কোন ময়লা আমার থাকত আমি চুপ করেই যেতাম। আমি সত্যকার রাস্তাই খুঁজে বেড়াচ্ছি, তাই সমস্ত ছেড়ে-ছুড়ে নির্বাসনে বসে আছি। অর্থে সামর্থ্যে সময়ে কত যে গেছে সে কাউকে জানাবার নয়।
আপনার অনেক ভক্তের মাঝে আমিও একজন, সুতরাং কথায় বা আচরণে আপনাকে লেশমাত্র ব্যথা দেবার কথা আমি ভাবতেও পারিনে।
ইতি, ২রা ফাল্গুন, ১৩৩৩।
সেবক
শ্রীশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
লিখলেন বটে, কিন্তু চিঠিটি আর পোস্ট করেননি শরৎচন্দ্র, একটা গুঢ় আশঙ্কায়। রবীন্দ্রনাথ তার চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘একমাত্র ইংরেজ গভর্নমেন্ট ছাড়া স্বদেশী বা বিদেশী প্রজার বাক্যে বা ব্যবহারে বিরুদ্ধতা আর কোন গভর্নমেন্টই এতটা ধৈর্যের সঙ্গে সহ্য করবে না।’ অর্থাৎ ইংরেজরা যথেষ্ট সহিষ্ণু, যা আর কোনও দেশে দেখতে পাওয়া যায় না। ব্রিটিশ সরকার যদি কোন উছিলায় এই পত্র পায়, শরৎচন্দ্রের আশঙ্কা হলো, নোবেলজয়ী কবির এই কথাকে তারা বিশ্বময় প্রচার করবে, যা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করবে স্বাধীনতা আন্দোলনকে। রাধারানী দেবীকে এক চিঠিতে (১০ অক্টোবর ১৯২৭) তিনি এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘‘...কবির এতবড় সার্টিফিকেট তখুনি স্টেটসম্যান প্রভৃতি ইংরাজি কাগজওয়ালারা পৃথিবীময় তার করে দেবে। এবং এই যে আমাদের দেশের ছেলেদের বিনা বিচারে জেলে বন্ধ করে রেখেছে এবং এই নিয়ে যত আন্দোলন হচ্ছে সমস্ত নিষ্ফল হয়ে যাবে।’’
চিঠিটি পোস্ট না করায় এ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তার আলাপ আর এগোয়নি।
চার.
রবীন্দ্রনাথের আচরণে কিছুটা কষ্ট পেলেও সেটা নিয়ে শরৎচন্দ্র উচ্চবাচ্য করেননি। রবীন্দ্রনাথকে তিনি অন্তর থেকেই শ্রদ্ধা করতেন। তবে লেখকদের সামাজিক ও রাজনৈতিক দায় সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে তার মন্তব্যে এটা পরিষ্কার হয়েছে যে, কবিগুরুর কাছে তার প্রত্যাশ্যা ছিল আরো বেশি। পথের দাবি নিষিদ্ধ হওয়ার কয়েক বছর পরেই এক সভায় শরৎচন্দ্র বলেছিলেন যে, সামাজিক বিষয়ে অনেকে নির্ভীকভাবে মত প্রকাশ করেন সত্য, কিন্তু রাজনৈতিক ব্যাপারে সেইরূপ নির্ভীকতা দেখা যায় না। কিন্তু এটা ঠিক নয়। বড় সাহিত্যিকরা বড় জাতির অগ্রদূতস্বরূপ। তাদের সেরকম আচরণই করা উচিত।
যাহোক, সমাজের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের ধারাবাহিক চেষ্টায়, শরৎচন্দ্রের প্রয়াণের পর, ১৯৩৯ সালে উপন্যাসটির উপর থেকে সরকারি নিষেধাজ্ঞা উঠে যায় এবং সে বছরই ‘পথের দাবী’র দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ৪২৬ পৃষ্ঠার ওই বইটারও দাম রাখা হয়েছিল তিন টাকা। ছাপা হয়েছিল ৫২০০ কপি। প্রকাশক উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তার পর থেকে বিগত একশো বছর ধরে কত প্রকাশক যে কত সংস্করণ ছাপছেন তার কোনও ইয়ত্তা নেই।



