শতবর্ষে পথের দাবী নিষিদ্ধ ও নমস্য

প্রতিকৃতি: ফারজিন জামান খান
ভারতীর প্রেমেই পড়েছিলাম বলা যায়। আমি তখন কৈশোরোত্তীর্ণ। আগেপিছে শরৎবাবুর অনেক উপন্যাস পড়েছি। ‘পথের দাবী’ সেগুলোর মতো নয়। এখানে তত্ত্বের কচকচি, ভারী ভারী সব কথা। তবু ভারতী, ‘পথের দাবী’ আমাকে টেনে রেখেছিল ভারতীকে দিয়েই। তার সহানুভূতি, সুমিষ্ট সলজ্জ ব্যবহার, ভালোবাসার অপরিসীম ক্ষমতা একধরনের মোহ তৈরি করেছিল। তবে উপন্যাসের মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবের ওমটাও যে উপভোগ করিনি তা নয়।
সাহেবদের বেঞ্চিতে বসার অপরাধে একরকম গলা ধাক্কা খেয়ে স্বাধীনতার প্রয়োজনটা টের পায় অপূর্ব এবং যোগ দেয় ‘পথের দাবী’ সমিতিতে, শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন যাদের আপাত লক্ষ্য, চূড়ান্ত লক্ষ্য স্বাধীনতা। এ সংগঠনেরই নেতা সব্যসাচী ওরফে ডাক্তারবাবু স্বাধীনতার জন্য সুভাষচন্দ্র বসুর লাইনেই হাঁটতে চান, রক্তপাতে তার আপত্তি নেই। কিন্তু ভারতী মনে করে নিয়মতান্ত্রিক উপায়েই দেশের ভালো করা সম্ভব।
ভারতী এবং সব্যসাচীর কথোপকথনে শরৎচন্দ্র দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক প্রস্তাবনা তুলে ধরেছেন। লেখকের ঝোঁক বিপ্লবের দিকে, সেটা সব্যসাচীর চরিত্রচিত্রণেই স্পষ্ট। সব্যসাচীর নানারকম ক্যারিশমা আর আগুনঝরা বক্তব্য নিয়ে উপন্যাসটা হয়ে উঠেছে বিপ্লবীদের মেনিফেস্টো। ফলে অনিবার্যভাবে ‘পথের দাবী’ নিষিদ্ধ করে ব্রিটিশ সরকার।
২
কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ যেরকম ছাপার কাগজে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল কিংবা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ শিকার হয়েছিল রাজরোষের, সেরকমই হলো ‘পথের দাবী’র ক্ষেত্রে। ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ৪১৬ পৃষ্ঠার উপন্যাসটি বাজারে আসে। দাম তিন টাকা হলেও এই বই পঞ্চাশ, একশ, দুইশ টাকায় কেনার জন্যও হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। প্রবল আলোড়ন তুলল বিপ্লবীদের মধ্যে। প্রকাশের কিছুদিন পর ব্রিটিশ পুলিশ কমিশনার শরৎচন্দ্রকে বলেছিলেন, “শরৎবাবু, যেখানেই আমরা বিপ্লবীদের ধরতে যাই, দেখি তাদের কাছে অন্তত দুটি বই নিশ্চয়ই আছে। একটি ‘গীতা’ আর অপরটি ‘পথের দাবী’। এ বই বিপ্লবীদের ক্ষেপিয়ে তুলেছে।” ফলে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষুব্ধ ব্রিটিশরাজ।
এ ভয়েই বইটি ছাপাতে অনেক প্রকাশক রাজি হয়নি প্রথমে। কিছু অংশ বাদ দিয়ে ছাপার প্রস্তাব দিলে শরৎচন্দ্র রাজি হননি। শেষে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ছেলে উমাপ্রসাদ মুখার্জী রাজি হলেন। শরৎচন্দ্র তাকে বললেন, ‘ছাপিয়ে যদি জেল হয় তোমার?’ উমাপ্রসাদ হেসে বললেন, ‘জেল হলে তো একা প্রকাশকেরই হবে না। লেখকেরও হবে। দুজনে একসঙ্গে জেলে থাকব। আপনার সঙ্গে থাকা— সে তো মহাভাগ্যের কথা।’
তবে সরকার লেখক-প্রকাশকের দিকে না গিয়ে শুধু বইটি বাজেয়াপ্ত করল, ১৯২৭ সালের ১৩ জানুয়ারি, ততদিনে হাজার তিনেক বই পাঠকের হাতে চলে গেছে। নিষিদ্ধ হওয়ায় চাহিদা বাড়ল বইটির। অজ্ঞাত প্রেস থেকে নতুন সংস্করণ ছড়িয়ে পড়তে লাগল। উমাপ্রসাদ পরে লিখেছেন, ‘হাতে-লেখা সম্পূর্ণ বই-এর কপিও আমি দেখেছি।’
সরকার অবশ্য হাতে পেল মাত্র একখান কপি। তাই নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণের পর কলকাতার পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্ট বাংলা সরকারের চিফ সেক্রেটারিকে কাগজে-কলমে জানিয়ে দেন— ‘বইটি ফৌজদারি কার্যবিধির ৯৯/এ ধারা অনুসারে বাজেয়াপ্ত করার যোগ্য এবং ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪/এ অনুসারে লেখক ও মুদ্রাকরকে অভিযুক্ত করা যেতে পারে।’ চিফ সেক্রেটারি আরেক কাঠি সরেস। তিনি রিপোর্টের ওপর মন্তব্য লেখেন— ‘এটা একটা বিষাক্ত সৃষ্টি। বইটিকে অভিযুক্ত করা যায় কি না, সে সম্পর্কে আমাদের উচিত অ্যাডভোকেট জেনারেলের মতামত নেয়া।’
অ্যাডভোকেট জেনারেল স্যার ব্রজেন্দ্রনাথ মিত্র বইটি পড়ে মন্তব্য করেন, ‘...এই বইয়ে সরকারের বিরুদ্ধে ঘৃণার উদ্রেক করার অপচেষ্টা যথেষ্টভাবে পরিষ্কার... আমি মনে করি বইটি ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪/এ ধারার আওতায় পড়ে এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৯৯/এ ধারা অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়ার যোগ্য।’
ব্যবস্থা নেওয়ার উত্তম উপায় রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা। কিন্তু ও পথে হাঁটলেন না ব্রিটিশ সরকার। কেন? তার উত্তর আছে ১৪ ডিসেম্বর ১৯২৬ সালে করা বাংলা সরকারের চিফ সেক্রেটারির নোটে:
‘... (আমি) মামলা দায়ের করার পক্ষে নই। ... মামলায় আদালত চাইলে অভিযুক্তকে বেনিফিট অব ডাউটের সুযোগে অব্যাহতি দিয়ে দিতে পারে। কিন্তু ৯৯/এ ধারার অপরাধে ৯৯/বি-তে আনীত অভিযোগে তিনজন বিচারকের বেঞ্চে অভিযোগটি উত্থাপিত হবে। সেখানে লেখক কিংবা মুদ্রণকারীকে সাজা দেবার প্রশ্ন আসবে না, কেবল বিবেচনা করা হবে প্রকাশনাটিতে রাষ্ট্রদ্রোহের উপাদান আছে কি নেই।’
পুলিশ কমিশনার, অ্যাডভোকেট জেনারেল এবং চিফ সেক্রেটারি সহমত পোষণ করায় বাংলা সরকার ১৯২৭ সালের ৪ জানুয়ারি শ্রী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখিত ‘পথের দাবী’ গ্রন্থটিকে বাজেয়াপ্ত করার ঘোষণা দিল। নিষিদ্ধকরণের আদেশটি ক্যালকাটা গেজেট ছাপল ১৩ জানুয়ারি।
৩
তীব্র সমালোচনা হলো। বাংলার সংসদে নেতাজি সুভাষ চন্দ্রসহ অনেকেই প্রতিবাদ করলেন। কোনো কাজ হলো না। বিদেশ থেকেও প্রতিক্রিয়া এলো। রোমাঁ রোলাঁ মন্তব্য করলেন, ‘বাংলা সরকারের কিছু কর্তাব্যক্তি শরৎচন্দ্রের একটি উপন্যাসে রাজদ্রোহের গন্ধ পেয়েছেন। সুতরাং এটি এমন বই— যা সমাজের পক্ষে বিপজ্জনক, নাকি আমলাতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক?’
পত্রপত্রিকায়ও লেখালেখি হলো। কল্লোল পত্রিকা লিখল, ‘বাংলাদেশের একখানা উপন্যাসকেও শেষকালে খাস-দখলে টানিতে হইল! বাংলা সাহিত্যের পরম ক্ষতি যে একখানি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস এরূপে বন্ধ হইয়া গেল।’ ‘আত্মশক্তি’ লিখেছে, ‘শরৎচন্দ্র সত্যই বলিয়াছেন, আমাদের এ পরাধীন দেশে সাহিত্যের সম্যক স্ফূর্তি ও প্রকাশ সম্ভব নহে।’
শরৎচন্দ্র রবীন্দ্রনাথকে ধরলেন, ‘পথের দাবী’র প্রকাশ ও প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নিতে কবিগুরু যেন সরকারের ওপর চাপ দিন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সম্মত হলেন না। শরৎচন্দ্রকে চিঠিতে লিখলেন, “... বইখানি উত্তেজক। অর্থাৎ ইংরেজের শাসনের বিরুদ্ধে পাঠকের মনকে অপ্রসন্ন করে তোলে। লেখকের কর্তব্যের হিসাবে এটা দোষের না হতে পারে; কেননা লেখক যদি ইংরেজরাজকে গর্হণীয় মনে করেন তাহলে চুপ করে থাকতে পারেন না। কিন্তু চুপ করে না থাকার যে বিপদ আছে, সেটুকু স্বীকার করাই চাই।...”
শরৎচন্দ্র মন খারাপ করলেন। জবাবে লিখলেন, “... নানা কারণে বাংলা ভাষায় এ ধরনের বই কেউ লেখে না। আমি যখন লিখি এবং ছাপাই তার সমস্ত ফলাফল জেনেই করেছিলাম। সামান্য অজুহাতে ভারতের সর্বত্রই যখন বিনা বিচারে অবিচারে অথবা বিচারের ভান করে কয়েদ নির্বাসন প্রভৃতি লেগেই আছে তখন আমিই যে অব্যাহতি পাব, অর্থাৎ রাজপুরুষেরা আমাকেই ক্ষমা করে চলবেন; এ দুরাশা আমার ছিল না। ... যদি রাজরোষে শাস্তি ভোগ করতে হয় তো করতেই হবে; তা মুখ বুজেই করি বা অশ্রুপাত করেই করি, কিন্তু প্রতিবাদ করা কি প্রয়োজন নয়?”
আরও কিছু শক্ত কথা লিখলেও চিঠিটি তিনি পোস্ট করেননি একটা আশঙ্কায়। রবীন্দ্রনাথ তার চিঠির এক জায়গায় লিখেছিলেন, ‘ইংরেজরা যথেষ্ট সহিষ্ণু, যা আর কোনও দেশে দেখতে পাওয়া যায় না।’ ব্রিটিশ সরকার যদি কোনো অসিলায় এই পত্র পায়, শরৎচন্দ্রের আশঙ্কা, নোবেলজয়ী কবির এ কথাকে তারা বিশ্বময় প্রচার করবে, যা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করবে স্বাধীনতা আন্দোলনকে, বিনা বিচারে জেলে আটক বিপ্লবীরা পড়বে কঠিন বিপদে।
ফলে এ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তার আলাপ আর এগোয়নি।
৪
বিশিষ্ট মানুষদের ধারাবাহিক চেষ্টায়, শরৎচন্দ্রের মৃত্যুর পর, ১৯৩৯ সালে নিষেধাজ্ঞা উঠে যায় এবং ‘পথের দাবী’র দ্বিতীয় সংস্করণ বেরোয়। ৪২৬ পৃষ্ঠার সে বইয়েরও দাম ছিল তিন টাকা। ছাপা হয়েছিল ৫২০০ কপি। প্রকাশক উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।
এরপর বিগত একশ বছর ধরে কত প্রকাশক কত সংস্করণ যে ছাপছেন, তার হিসাব নেই!








