মায়ের শাড়ি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মেয়েটির নাম মিহি।
বয়স সাত বছর তিন মাস। কেউ সাত বছর বললে সে সঙ্গে সঙ্গে শুধরে দেয়।
সে বলে, সাত বছর তিন মাস।
তার বাবা একদিন বলেছিলেন, মানুষের বয়স বাড়লে মাসের হিসাব বাদ যায়। পরে বছরও বাদ যেতে থাকে।
মিহি জিজ্ঞেস করেছিল, তুমি কত বছর বাদ দিয়েছ?
বাবা বলেছিলেন, এক-দুই বছর।
মিহি তখন খুব হেসেছিল।
এখন সে হাসছে না।
সে মায়ের আলমারির সামনে বসে আছে। আলমারির দরজা খোলা। ভেতরে সারি সারি শাড়ি। নীল, সাদা, হলুদ, কালো। কোনো শাড়িতে ছোট ফুল, কোনো শাড়িতে লাল পাড়।
মিহি হালকা হলুদ রঙের একটি শাড়ি নামিয়েছে। পাড়ে সবুজ পাতা। আঁচলে বাদামি দাগ।
দাগটা চকবার আইসক্রিমের।
এক বিকেলে মা তাকে কোলে নিয়ে ছাদে বসেছিলেন। আইসক্রিম গলে আঁচলে পড়ে গিয়েছিল। মা রাগ করেননি। বলেছিলেন, শাড়িটা এখন আরও সুন্দর হয়েছে।
মিহি শাড়িটা মেঝেতে বিছিয়ে তার ওপর শুয়ে পড়ল। আঁচল টেনে মুখ ঢাকল।
আঁচলের ভেতর অন্ধকার।
পুরনো কাপড়ের গন্ধ। নারকেল তেলের গন্ধ। সাবানের গন্ধ। সামান্য আতরের গন্ধ।
সব গন্ধ মিলে মায়ের গন্ধ।
মিহি গভীর করে শ্বাস নিল। তার মনে হলো, আরেকটু গভীরে মুখ ডুবিয়ে রাখলে মাকে পাওয়া যাবে।
মাকে পাওয়া গেল না।
সে ডাকল, বাবা।
বাবা পাশের ঘরে ছিলেন। কয়েক দিন ধরে তিনি জানালার পাশে চুপচাপ বসে থাকেন। ফোন বাজলে তাকিয়ে থাকেন, ধরেন না। দাড়িও কামাননি।
মিহি আবার ডাকল, বাবা, একটা প্রশ্ন আছে।
বাবা দরজায় এসে দাঁড়ালেন।
মিহি আঁচলের ভেতর থেকে বলল, মানুষ চলে গেলে তার গন্ধ থেকে যায় কেন?
বাবা বললেন, জানি না।
তুমি কিছুই জানো না।
হ্যাঁ। ইদানীং কিছুই জানি না।
মিহি আঁচল সরিয়ে বাবার দিকে তাকাল।
তুমি গোসল করেছ?
না।
মা থাকলে বকত।
হ্যাঁ।
খুব বকত।
হ্যাঁ।
বাবা চলে গেলেন।
মিহির মা তিন দিন ধরে বাসায় নেই।
প্রথম দিন সবাই বলেছিল, মা হাসপাতালে আছেন।
দ্বিতীয় দিন বলেছিল, মা ঘুমাচ্ছেন।
তৃতীয় দিন কেউ কিছু বলেনি।
বাড়িতে অনেক মানুষ এসেছিল। সবাই নিচু গলায় কথা বলেছে। মেজো খালা তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছেন।
মিহি জিজ্ঞেস করেছিল, মা কখন আসবে?
মেজো খালা তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিলেন।
বড়রা ভাবে, চুপ করে থাকলে শিশুরা কিছু বুঝবে না।
২
শিশুরা অনেক কিছুই বোঝে। শুধু ঠিক শব্দ খুঁজে পায় না।
মিহি বুঝেছে, মা আর আসবেন না।
কিন্তু বোঝার মধ্যেও ভুল হতে পারে। একবার দুই আর তিন যোগ করে সে ছয় লিখেছিল। মা বলেছিলেন, খুব ভালো হয়েছে। এক বেশি পেয়েছ।
মা অঙ্কের ভুলেও হাসতে পারতেন।
মাকে না পাওয়ার হিসাবেও নিশ্চয়ই কোথাও ভুল আছে।
বারান্দায় দাদি বসে পান বানাচ্ছিলেন। মিহি মায়ের শাড়ি টেনে টেনে সেখানে গেল।
সে বলল, মা কোথায়?
দাদি বললেন, আল্লাহর কাছে।
আল্লাহ কোথায়?
অনেক ওপরে।
বিমানের চেয়েও ওপরে?
হ্যাঁ।
রকেটের চেয়েও?
হ্যাঁ।
মিহি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, মা তো উঁচু জায়গায় যেতে ভয় পায়। ছাদ থেকে নিচে তাকালেই তার মাথা ঘোরে। সে এত ওপরে গেল কীভাবে?
দাদি মুখ ফিরিয়ে ফেললেন।
মিহি বলল, তোমরাও কিছু জানো না।
বিকেলে বৃষ্টি নামল।
মা মেঘলা দিন পছন্দ করতেন। বলতেন, মেঘলা দিনে মানুষের গায়ের রঙ সুন্দর দেখায়।
মিহি একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, কাকের গায়ের রঙও?
মা বলেছিলেন, কাক নিজেই সুন্দর। তার মেঘলা দিনের দরকার নেই।
মিহি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখল। ছাট এসে শাড়ির আঁচল ভিজিয়ে দিল। সে তাড়াতাড়ি আঁচল সরিয়ে নিল।
মায়ের শাড়ি ভিজে গেলে মা কি রাগ করবেন?
সম্ভবত না। মা বৃষ্টিতে ভিজতে ভালোবাসতেন।
একবার মিহিকে নিয়ে ছাদে ভিজেছিলেন। বাবা রাগ করে বলেছিলেন, মেয়েটার জ্বর হবে।
মা বলেছিলেন, হলে হবে। আমিও ওর সঙ্গে জ্বর নিয়ে শুয়ে থাকব।
সত্যিই মিহির জ্বর হয়েছিল। মা পাশে শুয়ে কাঁথা টেনে বলেছিলেন, আমারও জ্বর এসেছে।
মিহি মায়ের কপালে হাত দিয়ে বলেছিল, তোমার জ্বর নেই।
মা বলেছিলেন, আমার জ্বর খুব ভদ্র। হাত দিলে লুকিয়ে পড়ে।
সন্ধ্যায় বাবা একটি প্লেট নিয়ে এলেন। ভাত, ডাল আর ডিমভাজি।
তিনি বললেন, খাবে?
মিহি মাথা নাড়ল।
সকালেও কিছু খাওনি।
খিদে নেই।
বাবা বললেন, আমারও নেই।
তাহলে প্লেট নিয়ে এসেছ কেন?
তোমাকে খাওয়াতে।
তুমি পারবে?
চেষ্টা করব।
বাবা ভাত মাখাতে লাগলেন। ভাত বেশি নরম হয়ে গেল। আঙুলের ফাঁক দিয়ে ডাল গড়িয়ে পড়ছে।
মিহি বলল, মা গোল গোল লোকমা বানাত।
বাবা একটি লোকমা বানালেন। গোল হলো না। লম্বাটে হলো।
মিহি বলল, এটা আলুর মতো।
বাবা বললেন, আলু খাও।
মিহি সামান্য হাসল। মুখ খুলে ভাত খেল।
তারপর বলল, মা কি আর আসবে না?
বাবার হাত থেমে গেল।
তিনি মাথা নাড়লেন।
একদমই না?
না।
ঈদের দিনও না?
না।
আমার জন্মদিনে?
না।
আমি অসুস্থ হলে?
বাবা মুখ ঘুরিয়ে ফেললেন।
মিহি বলল, তুমি কাঁদছ?
না। চোখে কিছু পড়েছে।
মিহি মায়ের শাড়ির আঁচল দিয়ে বাবার চোখ মুছে দিল।
দুজন কিছুক্ষণ আঁচল ধরে বসে রইল।
মিহি বলল, মায়ের গন্ধ কি একদিন চলে যাবে?
হয়তো।
শাড়ি ধুলে?
কিছুটা চলে যাবে।
তাহলে এই শাড়ি কোনোদিন ধোয়া যাবে না।
বাবা মিহিকে বুকে টেনে নিলেন।
মিহির মুখ বাবার বুকে গেল না। তার মুখ রইল মায়ের শাড়ির আঁচলে।
বাবা বললেন, আমি আছি, মা।
মিহি বলল, জানি।
তারপর শান্ত গলায় বলল, কিন্তু আমি তো মাকে খুঁজছি।
রাতে বাবা তাকে ঘুম পাড়িয়ে চলে গেলেন।
মিহির ঘুম এলো না।
সে আলমারির সামনে গিয়ে বসল। একে একে সব শাড়িতে মুখ রাখল।
প্রতিটি শাড়ির গন্ধ আলাদা।
নীল শাড়িতে বৃষ্টির দিন। লাল পাড়ের শাড়িতে ঈদ। কালো শাড়িতে কোনো বিয়েবাড়ি। সাদা শাড়িতে হাসপাতালের গন্ধ।
প্রতিটি শাড়ির ভেতর একটি করে দিন লুকিয়ে আছে।
আর প্রতিটি দিনের মধ্যে মা।
দরজার ফাঁক দিয়ে বাবা দাঁড়িয়ে দেখছিলেন। তিনি মেয়েকে ডাকলেন না।
মিহি চোখ বন্ধ করে হাত বাড়াল।
হাতে মা এলেন না।
শুধু মায়ের শাড়ির নরম আঁচল তার আঙুলে জড়িয়ে রইল।




