অরাজকতা রোধে ইসলামের নীতিমালা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ইসলাম শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের ধর্ম নয়; এটি এমন একটি জীবনব্যবস্থা, যার অন্যতম লক্ষ্য একটি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন করা। এ কারণেই কোরআন ও সুন্নাহ সামাজিক বিশৃঙ্খলা বা ‘ফাসাদ’ সৃষ্টিকে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করেছে। কারণ, একটি সমাজে যখন আস্থা ভেঙে যায়, মানুষের জানমাল ও সম্মান অনিরাপদ হয়ে পড়ে, তখন পুরো সমাজই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বর্তমান বিশ্বে হত্যা, সন্ত্রাস, গুজব ছড়ানো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য প্রচার, ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করার মতো নানান রূপে সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে দেখা যায়। এগুলোর প্রতিটিই কোনো না কোনো মাত্রায় ‘ফাসাদ ফিল আরদ’ বা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত।
আরবি ‘ফাসাদ’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ নষ্ট হয়ে যাওয়া, ভারসাম্য বিনষ্ট হওয়া বা কল্যাণের বিপরীত অবস্থা সৃষ্টি হওয়া। ইসলামি পরিভাষায় এর অর্থ আরও বিস্তৃত। এমন সব কাজ, যা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের শান্তি ও নিরাপত্তা ধ্বংস করে, তা-ই ফাসাদ।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘তোমরা পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার পর সেখানে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৫৬) আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে কাসির (রহ.) লিখেছেন, আল্লাহ পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের উপযোগী করেছেন এবং ন্যায়বিচার ও কল্যাণের বিধান দিয়েছেন। সেই শৃঙ্খলা ধ্বংস করাই হলো ফাসাদ।
অন্যত্র আয়াতে এসেছে, “যখন তাদের বলা হয়, পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করো না, তখন তারা বলে, ‘আমরা তো কেবল সংশোধনকারী।’ জেনে রাখো, তারাই প্রকৃত অশান্তি সৃষ্টিকারী; কিন্তু তারা তা উপলব্ধি করে না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১১-১২)
এই আয়াত মানব ইতিহাসের একটি চিরন্তন বাস্তবতা তুলে ধরেছে। অনেক সময় মানুষ অন্যায়কে ন্যায়ের নামে, সহিংসতাকে সংস্কারের নামে কিংবা বিভেদকে আদর্শের নামে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কিন্তু ইসলামে উদ্দেশ্যের পাশাপাশি কর্মের বাস্তব ফলও গুরুত্বপূর্ণ। যে কাজ মানুষের নিরাপত্তা নষ্ট করে, তা কখনোই কল্যাণকর হতে পারে না।
বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেছিলেন, ‘তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মান তোমাদের জন্য এ দিনের, এ মাসের এবং এ নগরের পবিত্রতার মতোই পবিত্র।’ (বুখারি, হাদিস: ১৭৪১)
সামাজিক বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধ শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব নয়; পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতৃত্ব, গণমাধ্যম এবং প্রত্যেক নাগরিকেরও দায়িত্ব রয়েছে
এটি ইসলামি মানবাধিকার সনদের অন্যতম ভিত্তি। এখানে রাসুল (সা.) মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানকে সমান মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ফলে যে ব্যক্তি সমাজে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করে, যেখানে মানুষের জানমাল অনিরাপদ হয়ে পড়ে, সে ইসলামের মৌলিক শিক্ষার বিরোধিতা করে।
পবিত্র কোরআনের অন্যতম মানবিক ঘোষণা হলো, ‘যে ব্যক্তি কোনো প্রাণের বিনিময় কিংবা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি ছাড়া কাউকে হত্যা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল। আর যে একজনের জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে জীবন দান করল।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ৩২)
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেছেন, নিরপরাধ মানুষের জীবন রক্ষা করা শরিয়তেরই মৌলিক শিক্ষা। এই আয়াত শুধু হত্যার নিষেধাজ্ঞা নয়; বরং এমন সব কাজের বিরুদ্ধেও সতর্কবার্তা, যা মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়।
ডিজিটাল যুগে গুজব, অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য সামাজিক অস্থিরতার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি মিথ্যা তথ্য মুহূর্তেই মানুষের মধ্যে ভীতি, ঘৃণা বা সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে। পবিত্র কোরআন নির্দেশ দেয় যে, ‘হে ঈমানদারগণ! কোনো ফাসিক ব্যক্তি যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করে নাও; অন্যথায় অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে ফেলবে, পরে তোমরা অনুতপ্ত হবে।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে যা শোনে, তা-ই বলে বেড়ায়।’ (মুসলিম, হাদিস: ৫)
আজকের তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এই আয়াত ও হাদিসের গুরুত্ব বহু গুণ বেড়ে গেছে। যাচাইহীন তথ্য প্রচার কখনো কখনো অস্ত্রের আঘাতের চেয়েও ভয়াবহ সামাজিক ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সমগ্র জীবন ছিল সংঘাত নিরসন ও সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার শিক্ষা। মদিনায় হিজরতের পর তিনি মদিনা সনদ প্রণয়ন করেন। যেখানে মুসলিম, ইহুদি ও অন্যান্য গোত্রের পারস্পরিক অধিকার, নিরাপত্তা ও দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়। যা ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সামাজিক চুক্তি হিসেবে বিবেচিত।
মক্কা বিজয়ের দিনও তিনি প্রতিশোধের পথ বেছে নেননি; বরং ঘোষণা করেছিলেন, ‘আজ তোমাদের প্রতি কোনো ভর্ৎসনা নেই; তোমরা সবাই মুক্ত।’ যা প্রমাণ করে, ইসলামের লক্ষ্য প্রতিশোধ নয়; বরং সমাজে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।
সামাজিক বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধ শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব নয়; পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতৃত্ব, গণমাধ্যম এবং প্রত্যেক নাগরিকেরও দায়িত্ব রয়েছে। আমাদের উচিত গুজব ও যাচাইহীন তথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকা। মতভেদকে সহিংসতায় রূপ না দেওয়া। মানুষের জানমাল ও সম্মানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা। আইন, ন্যায়বিচার ও সামাজিক শৃঙ্খলার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা।
মূলত ইসলাম এমন একটি সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যেখানে প্রত্যেক মানুষ নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা পায়। একজন মুমিনের পরিচয় ক্ষমতা প্রদর্শনে নয়; বরং মানুষের জন্য নিরাপত্তার উৎস হয়ে ওঠায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুসলমান সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।’ (বুখারি, হাদিস: ১০)
অতএব, কোরআন-সুন্নাহর আলোকে বলা যায়, শান্তি প্রতিষ্ঠা শুধু রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়; এটি প্রত্যেক মুসলমানের নৈতিক ও ঈমানি দায়িত্ব। আর যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সমাজে অস্থিরতা, ভয় ও বিভেদ সৃষ্টি করে, তারা শুধু মানুষের অধিকারই লঙ্ঘন করে না; আল্লাহর পছন্দনীয় সামাজিক ব্যবস্থারও বিরোধিতা করে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক




