প্রিয় ৫ বই
- অডিসি অব আ মডার্ন সিক্যুয়েল— নিকোস কাজানজাকিস
- রেজারেকশন— লিও টলস্টয়
- ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট— ফিওদর দস্তয়েভস্কি
- খোয়াবনামা— আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
- অ্যারো অব গড— চিনুয়া আচেবে

আমার এ-জীবনে এমন কিছু বই আছে যারা আমাকে গড়েছে, ভেঙেছে এবং আবার নতুন করে গড়েছে। ব্যক্তিগত পাঠের সেই মানচিত্র থেকে পাঁচটি বইয়ের নাম যদি করতেই হয়, তবে সে তালিকায় প্রথমেই আসবে নিকোস কাজানজাকিসের ‘ওডিসি অব আ মডার্ন সিক্যুয়েল’। হোমারের ওডিসিয়াস ইথাকায় ফেরার পরও যে থামেনি, আবার পাল তুলেছে অজানার উদ্দেশে, কাজানজাকিস তাকে টেনে নিয়ে গেছেন এক দীর্ঘ আধুনিক মহাকাব্যে; ৩৩,৩৩৩ পঙক্তির এই বিপুল আয়োজন আসলে এক আধ্যাত্মিক অভিযাত্রা, যেখানে মানুষ একই সঙ্গে দেহ ও আত্মার মুক্তি খোঁজে।
দ্বিতীয় বই টলস্টয়ের ‘রেজারেকশন’। অনেকের কাছে ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ বা ‘আনা কারেনিনা’ শীর্ষে থাকলেও, টলস্টয়ের শেষ জীবনের এই উপন্যাসটি আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয়। রাজকুমার নেখলুদভ যখন আদালতে জুরি হিসেবে বসে আবিষ্কার করে, পতিতা হয়ে যাওয়া কাতুশা সেই মেয়ে যাকে একদিন সে প্রতারণা করেছিল, তখন তার ভেতরের নৈতিক জাগরণ যেন এক মহাপ্রলয় হয়ে নামে। এ উপন্যাস অনুতাপ আর সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নকে এমন তীব্রভাবে তোলে যে পড়তে পড়তে বারবার নিজের ভেতরেও এক ‘পুনরুত্থান’-এর তাড়না অনুভব করি।
তৃতীয় বইটি দস্তয়ভস্কির ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’। অসুস্থ, দারিদ্র্যপীড়িত এক তরুণ রাস্কলনিকভ নিজেকে অসাধারণ মানুষ প্রমাণ করতে গিয়ে খুন করে বসে বৃদ্ধা সুদখোরকে; তারপর শুরু হয় তার বিবেকের নরকযন্ত্রণা। দস্তয়ভস্কি অপরাধের চেয়েও শাস্তির এই মনস্তাত্ত্বিক নরককে এঁকেছেন এমন গভীরতায় যে, প্রতিটি পৃষ্ঠায় শিরদাঁড়া বেয়ে অপরাধবোধের শীতল স্রোত নামে। দস্তয়ভস্কির জগতে এটাই আমার সবচেয়ে প্রিয়, সবচেয়ে আপন।
চতুর্থ বইটি আমার জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত—আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’। বগুড়ার কাৎলাহার বিলকে ঘিরে গড়ে ওঠা গিরিরডাঙা-নিজগিরির ডাঙার প্রত্যন্ত জনপদের কাহিনি এটি। তেভাগা আন্দোলন, সিপাহি বিদ্রোহের স্মৃতি, ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের লোকশ্রুতি আর ১৯৪৭-এর দেশভাগের উত্তাল সময়—ইতিহাসের এই সব পরতে পরতে আখতারুজ্জামান মিশিয়ে দিয়েছেন মিথ, স্বপ্ন আর জাদুবাস্তবতার এক মায়াবী জাল। ফকির আর তমিজের বাপের চরিত্রের ভেতর দিয়ে বাংলার কৃষকসমাজের বিক্ষুব্ধ সময় এমন শিল্পে উত্তীর্ণ হয়েছে যা বারবার বিস্মিত করে। একে শুধু বই বললে কম বলা হয়—এ যেন বাংলার মাটি-জল-মানুষের স্বপ্নময় দলিল।
আর পঞ্চম বইটি হলো চিনুয়া আচেবের ‘অ্যারো অব গড’। আচেবের ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’-এর কথা বেশি বলা হয়, কিন্তু আমার মতে ‘অ্যারো অব গড’ আরও সুগভীর। ইগবো গ্রামের প্রধান পুরোহিত এজুলু যখন ঔপনিবেশিক শাসন আর খ্রিষ্টান মিশনারিদের প্রতাপের মুখে নিজের কর্তৃত্ব ও বিশ্বাসের জগৎ ধরে রাখতে চায়, তখন তার একার ট্র্যাজেডি হয়ে ওঠে গোটা একটি সভ্যতার চূর্ণ হওয়ার প্রতীক। আচেবে পিতৃ-অধিষ্ঠিত এই ক্ষমতার ভাঙনকে যে অনিবার্য করুণরসে ভিজিয়ে দিয়েছেন, তা আমাকে গভীরভাবে আপ্লুত করে।
অনুলিখন: শিমুল সালাহ্উদ্দিন




