মহাশ্বেতা দেবী
মহাকাব্যে সব মহাজন, সাধারণ মানুষ উপেক্ষিত
- প্রয়াণদিবসে স্মরণ

মহাশ্বেতা দেবী (১৪ জানুয়ারি ১৯২৬ – ২৮ জুলাই ২০১৬)
বাংলা কথাসাহিত্যে প্রতিবাদী ধারার অন্যতম প্রধান লেখিকা, সমাজসেবী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মহাশ্বেতা দেবী ১৯২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি ঢাকায় জন্মেছিলেন। তার পিতা ছিলেন ‘যুবনাশ্ব’ ছদ্মনামে পরিচিত বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক মনীশ ঘটক এবং মাতা ধরিত্রী দেবী। ভাইবোনদের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়।
মহাশ্বেতা দেবীর শিক্ষাজীবন শুরু হয় ঢাকায়। দেশভাগের পর তিনি পশ্চিমবঙ্গে চলে যান এবং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠভবনে ভর্তি হন। স্নাতক শেষে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ১৯৬৪ সালে বিজয়গড় কলেজে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে তার কর্মজীবন শুরু হলেও তিনি একাধারে সাংবাদিকতা ও সৃজনশীল লেখালেখি চালিয়ে যান।
ব্যক্তি জীবনে ১৯৪৭ সালে তিনি নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্যকে বিয়ে করেন এবং তাদের ছেলে নবারুণ ভট্টাচার্য পরবর্তীকালে খ্যাতিমান কবি ও ঔপন্যাসিক হিসেবে আবির্ভূত হন। পরে ১৯৬২ সালে তিনি অসিত গুপ্তকে বিবাহ করেন।
মহাশ্বেতা দেবীর সমগ্র সাহিত্যকর্মে লোধা ও শবর উপজাতি, নারী এবং দলিত সমাজের প্রান্তিক মানুষ মুখ্য হয়ে উঠেছেন। জমিদার, মহাজন ও দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মচারিদের অত্যাচারের চিত্র তিনি তার কথাসাহিত্যে তুলে ধরেছেন। ‘ঝাঁসির রাণী’ দিয়ে গবেষণামূলক রচনার সূচনা হলেও ‘নটী’, ‘অরণ্যের অধিকার’ ও ‘হাজার চুরাশির মা’- এর মতো উপন্যাস তাকে বাংলা সাহিত্যে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। ১৯৮০ সাল থেকে সাহিত্যকে পূর্ণকালীন পেশা হিসেবে গ্রহণ করে তিনি অজস্র গল্প, উপন্যাস ও কিশোর সাহিত্য রচনা করেছেন।
শুধু সাহিত্য নয়, বাস্তব জীবনেও তিনি ছিলেন বলিষ্ঠ প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। বিরসা মুন্ডার শৃঙ্খলিত মূর্তিকে শৃঙ্খলমুক্ত করার দাবিতে আন্দোলন, পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন সরকারের শিল্পনীতির বিরোধিতা এবং কৃষিজমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে নন্দীগ্রাম আন্দোলনে বুদ্ধিজীবীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। এমনকি শান্তিনিকেতনের বাণিজ্যিকীকরণেরও তীব্র সমালোচনা করেছিলেন তিনি।
তার সাহিত্যকীর্তি ও সমাজসেবার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার (১৯৭৯), পদ্মশ্রী (১৯৮৬), জ্ঞানপীঠ পুরস্কার (১৯৯৬), রামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার (১৯৯৭), পদ্মবিভূষণ (২০০৬) ও বঙ্গবিভূষণসহ (২০১১) অসংখ্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মানে ভূষিত হন। ২০০৬ সালের ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় তার দেওয়া ‘আমার দেশ, ক্ষয়প্রাপ্ত, ছিন্নভিন্ন, গর্বিত, সুন্দর... ভারত আমার দেশ’ ভাষণটি ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। শেষ জীবন পর্যন্ত তীক্ষ্ণ ও বৈপ্লবিক এই লেখিকা ২০১৬ সালের ২৮ জুলাই পরলোকগমন করেন। মহাশ্বেতা দেবী চিরকাল বাংলার সাহিত্য ও সমাজজীবনে এক অনন্য প্রতিবাদী প্রতিভূ হিসেবে অমর থাকবেন।
তার এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন ভারতীয় টেলিভিশন সাংবাদিক, তথ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক রাজীব মেহরাত্রা। তিনি ভারতের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল দূরদর্শনে দীর্ঘদিন ধরে প্রচারিত টক শো ‘ইন কনভারসেশন’-এর উপস্থাপক ও পরিচালক হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। এই অনুষ্ঠানে তিনি বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। এছাড়াও তিনি আধ্যাত্মিকতা, শিক্ষা ও সামাজিক বিষয়ক বেশ কিছু বই এবং তথ্যচিত্র রচনা ও পরিচালনা করেছেন। দালাই লামার ওপর তার নির্মিত তথ্যচিত্র এবং রচিত বই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি ‘দ্য ফাউন্ডেশন ফর ইউনিভার্সাল রেসপনসিবিলিটি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও যুক্ত।
সাক্ষাৎকারটি আগামীর সময়ের পাঠকদের জন্য ভাষান্তর করেছেন শিমুল সালাহ্উদ্দিন।
মুখোমুখি মহাশ্বেতা দেবী
রাজীব মেহরাত্রা: হ্যালো এবং স্বাগতম আমার এই ধারাবাহিক আলাপচারিতায়, যেখানে আমি কথা বলি সেই নারী ও পুরুষদের সঙ্গে, যাদের ভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং দর্শন আমাদের সমসাময়িক পৃথিবী কী সিদ্ধান্ত নেবে তা নির্ধারণ করে। আজ আমার অতিথি একজন লেখক এবং একজন সক্রিয় কর্মী— যার দুই ভূমিকা একে অপরকে প্রভাবিত করে। প্রায় পাঁচ দশকের কর্মজীবনে তিনি লিখেছেন শ’খানেক উপন্যাস, ২০টি ছোটগল্প সংকলন প্রকাশিত হয়েছে তার; পেয়েছেন সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার, গান্ধী পুরস্কার, ম্যাগসাইসাই পুরস্কার এবং বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে অসংখ্য পুরস্কার ও স্বীকৃতি। আমি আনন্দের সঙ্গে স্বাগত জানাচ্ছি কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীকে। আমরা এই কথোপকথন রেকর্ড করছি, কার্যত ইন্দিরা গান্ধী জাতীয় সংহতি পুরস্কার প্রদানের প্রাক্কালে। এই পুরস্কার এই সময়ে আপনার কাছে কী অর্থ বহন করে?
মহাশ্বেতা দেবী: জাতীয় সংহতি, National Integrety— বড় কথা। কেউ কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, আমার নাম জাতীয় কোনো পুরস্কারের জন্য যদি সুপারিশ করা হয়, আমি তা গ্রহণ করব কি না। আমি বলেছিলাম, আমি একজন ভারতীয়, আর এটি যদি জাতীয় পুরস্কার হয়, তাহলে আমি গর্বের সঙ্গে তা গ্রহণ করব। আমি ভারতেরই একজন।
রাজীব মেহরাত্রা: আপনার কাজের একটা বড় অংশ জুড়ে আছে আদিবাসী মানুষেরা, যারা ভারতের জনসংখ্যার ছয় ভাগের এক ভাগ। আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে, এমন একটা ভারত আছে, এমন মানুষ আছেন যারা হিন্দু সভ্যতারও অনেক আগে থেকে রয়েছেন। এই মানুষগুলো বঞ্চিত, শোষিত, আর আপনি তাদের পক্ষে এত আবেগী হয়ে লিখেছেন, তাদের জন্য এনজিও তৈরি করেছেন, তাদের জন্য কাজ করে চলেছেন। এটা কি পরিহাসের মতো নয় যে, আমরা জাতীয় সংহতির কথা বলছি, অথচ আপনি সারা জীবন এই মানুষগুলোকেই সংহত করার জন্য কাজ করেছেন? আপনি তাদের বর্ণনা করেছেন কণ্ঠহীন, নিপীড়িত মানুষ হিসেবে, যারা তাকিয়ে দেখছেন ভারত একুশ শতকের দিকে এগিয়ে চলেছে।
মহাশ্বেতা দেবী: দেখুন, তারা আগে ছিলেন, আমরা এসেছি পরে। যদি আমরা ভারতকে একটা জাতি হিসেবে ভাবি তাহলে তারা আগে এসেছিলেন, তারা এখানে ছিলেন, আমরা এসেছি পরে। তারপরও যদি ভারতকে একটা পূর্ণাঙ্গ জাতি হিসেবে দেখি, তাহলে তারাই প্রকৃত সভ্য সমাজের মানুষ। তাদের সমাজে ছেলে-মেয়ে ভেদাভেদ নেই, একটি মেয়ে আর একটি ছেলে— দুজনেই সমান ভালোবাসা, সমান মর্যাদা পায়, পণপ্রথা নেই। ভেবে দেখুন, ছেলে-মেয়েতে ভেদাভেদ করা আর পণপ্রথা ভারতের কী ভয়াবহ ক্ষতি করেছে এবং এখনো করে চলেছে। বিধবা বিবাহ— আমরা বিধবা বিবাহ চালু করার জন্য বিদ্যাসাগর, অন্যেরা মহারাষ্ট্রে, যেখানেই হোক, শিক্ষিত উদার মনের মানুষজনকে কত লিখতে হয়েছে, কত আন্দোলন করতে হয়েছে। কিন্তু তাদের সমাজে বিধবা বিবাহ একেবারে, প্রায় বাধ্যতামূলক বলতে পারেন। বিবাহবিচ্ছেদ, যা ভারতে মুসলিম বা খ্রিস্টান সমাজে ছিল বটে, কিন্তু বাধ্যতামূলক ছিল না, আদিবাসী সমাজে তা প্রায় স্বাভাবিক। কারণ সেখানে কেউ একা থাকে না। কোনো মেয়ে যদি অল্পবয়সী হয়, অল্পবয়সী না হলেও তার বিয়ে হয়। বিয়ে কোনো ব্যাপারই নয়— আবার বিয়ে করা, সন্তান নেওয়া, দৈনন্দিন জীবন চালিয়ে যাওয়া। এই সমস্ত বিষয় আমার কাছে টিকে থাকা এক অতি প্রাচীন সভ্যতার চিহ্ন বলে মনে হয়।
রাজীব মেহরাত্রা: এটা কি পরিহাসের মতো নয় যে, আমরা যাদের শহরে, শিক্ষিত সমাজে, উচ্চবর্ণের মধ্যে থেকে আধুনিক অর্থে আদিম বলে মনে করি, তারা আসলে এমন মূল্যবোধ প্রদর্শন করেন, যাকে আমরা উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করতে শুরু করেছি?
মহাশ্বেতা দেবী: দেখুন, এটা আরো কৌশলগত ব্যাপার। এমন মানুষ আর মানুষ আমাকে সবসময় জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি তো বড় ভালো কাজ করছেন, ওদের মূলস্রোতে আনার চেষ্টা করছেন।’ আমি বলি, ‘না, আমি আনি না।’ কারণ মূলস্রোতের কাছে দেওয়ার মতো কিছুই নেই। ওরাই সভ্য। আমি বহুবার আদিবাসী সমাবেশে গিয়েছি— কুড়ি হাজার, পঁচিশ হাজার মানুষ বসে একা আমার কথা শোনে, কিন্তু দেখুন ওদের শরীরী ভাষা, যেভাবে বসে থাকে, যেভাবে শোনে, কী বিপুল শ্রদ্ধায় ভরা। শরীর স্থির, পুরো অচঞ্চল। এমনকি শিশুরাও এত সভ্য যে নিশ্চয়ই এটা বলা যায়, ওরা এখনো বহন করে চলেছেন এক অতি প্রাচীন সভ্যতার প্রতিনিধিত্ব। এটা ওদের রক্তে রয়েছে, ওদের সমাজে রয়েছে।
রাজীব মেহরাত্রা: আপনি একজন লেখক হিসেবে, ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে, যখন ‘সভ্য’ শব্দটি ব্যবহার করেন, তখন তা কী অর্থে বোঝেন?
মহাশ্বেতা দেবী: আমার মনে হয়, আমার ‘চাট্টি মুন্ডা ও তাঁর তির’ বইয়ে আমি বারবার সেটা লিখেছি, বুড়ো চাট্টি মুন্ডাকে যখন কিছু জিজ্ঞেস করা হয়, সে শুধু বলে, ‘দেখো, তুমি তো চাট্টি মুন্ডা, আমি এমন একজন যে তোমাকে সবসময় ঘৃণা করেছি, মেরেছি, থেঁতলে দিয়েছি, হয়তো শারীরিকভাবে আঘাতও করেছি। কিন্তু আমি যখন কোনো আকস্মিক বিপদে পড়ি, তুমি এগিয়ে এসে আমাকে উদ্ধার করো, আর তার জন্য তুমি কোনো কৃতজ্ঞতা প্রত্যাশা করো না, তুমি তোমার কাজটা করে যাও। হঠাৎ পরে অন্যরা এসে আহত ব্যক্তির দায়িত্ব নেয়, তারা বলে, ‘কেন তুমি ওকে সাহায্য করতে গেলে?’ সে শুধু বলে, ‘কাকিয়াজানে, কী আর করব! ও এমনই একজন মানুষ— ও কিছু অন্যভাবে করতে পারে না।’ সব আদিবাসীকেই যে এরকম সন্ত ভাববেন, তা নয়, তাদের মধ্যেও নানা রকম মানুষ আছে। কিন্তু সাধারণভাবে যদি ভাবি, আর অনেক উপজাতি আছে, খুব বেশি ধনী নয়, অথচ কত পরিচ্ছন্ন। সাঁওতাল, মুন্ডা গ্রাম আছে, যেখানে মেঝেতে বসে খাওয়া যায়।
রাজীব মেহরাত্রা: আপনি কী ধরনের নমুনা দেখেন, মানে আপনি কি এমন কিছু দেখতে চান, যাতে আদিবাসীরা নিজেদের একটি আলাদা শক্তি হিসেবে উঠে দাঁড়ায় এবং সুশীল সমাজে অংশ নেয়? কী কী উপায়ে?
মহাশ্বেতা দেবী: এগুলো এত ভয়ানক, এত ভয়ংকর, সারা বিশ্বজুড়ে। দেখুন, এটা শুধু ভারতের আদিবাসীদের প্রশ্ন নয়, আমেরিকার আদিবাসী ইন্ডিয়ানদেরও নয়। ভাবুন তো আফ্রিকার কথা, আফ্রিকার কী হয়েছে! সারা বিশ্বেই এক অবস্থা। আমাদের কি প্রাচীনকালের মতো আরেকজন গান্ধী দরকার? হ্যাঁ, আর না। আমাদের আবার গোড়া থেকে শুরু করতে হবে, অথবা আমাদের যা আছে তা নিয়েই শুরু করতে হবে। আমাদের শিখতে হবে সেই পুরনো শিক্ষায় ফিরে যেতে, যেটা আমরা ছেলেবেলায় শিখেছিলাম— সাধারণ জিনিস: গরিবের সঙ্গে সব ভাগ করে খাবে, যাদের কিছু নেই তাদের কাছে যাবে, কম চাইবে, লোভ কম করবে, বেশি কাজ করবে। আর কাজ, কাজ, শুধু কাজের কথা ভাবি। কারণ ভারতকে যদি বলি, দুঃখিত হয়ে বলতে হয়, আজকের ভারত কি একটা স্বাধীন দেশ? স্বাধীনতা কোথায় পড়ে থাকে? কে স্বাধীন, কে মুক্ত? ভারতের প্রায় সব স্বার্থ এখন— খনিজ সম্পদ, গাছপালা, বন, সব কিছু— অন্য অর্থ-লুটেরাদের কাছে টুকরো টুকরো করে বিক্রি হয়ে চলেছে।
রাজীব মেহরাত্রা: আপনি কাজ, কাজ আর কাজের কথা বলছিলেন। আপনি যে পরিমাণ কাজ করেন— প্রায় পঞ্চাশ বছরে একশো কুড়ি বই, মানে বছরে দুটোরও বেশি বই— আর বিপন্ন মানুষের জন্য আপনি সব সময় প্রস্তুত থাকেন, কলকাতায় যেখানে থাকেন সেখানে এনজিও তৈরি করেছেন, আদিবাসীদের সঙ্গে তৃণমূল পর্যায়ে নেমে কাজ করেন— এই যে এত কাজ, কীসের প্রেরণা আপনাকে চালিয়ে নিয়ে যায়? এটা কি গান্ধীবাদী অর্থে কোনো স্রষ্টার প্রতি ভক্তি, আধ্যাত্মিকতা, না কি রাগ?
মহাশ্বেতা দেবী: ঠিক ওভাবেই, ওই পথেই আমি নিজের সঙ্গে থাকতে পারি। এটা আমার ভেতর থেকে আসে। আমি গান্ধীজিকে খুব শ্রদ্ধা করি, অনেক মানুষকেই শ্রদ্ধা করি, যেখানেই কাজের মানুষ দেখি, কাজ দেখলেই শ্রদ্ধা করি। আমার এখনো মনে পড়ে, যখন আমার বয়স দশ বা চোদ্দ-পনেরো ছিল, তখন সারা ভারতে গরমকালে গাছতলায় কেউ না কেউ পথিকদের জল দিত। সারা ভারত জুড়েই এই কাজ মানুষ স্বেচ্ছায় করত, কারণ এই সময়টাতেই মানুষের জল দরকার, তারা পিপাসার্ত। এই জলদানে কোনো পুণ্য আছে কি না, জানি না। তারা ভাবত কি না তাও জানি না। আমাদের পুরনো জমিদার বা গ্রামপ্রধানের কথা ভাবুন, তারা পুকুর কাটত, জলাশয় খনন করত। বলত, ‘কী করতে চাও? আমাদের ছেলেমেয়েদের জীবনটা দেখে যাও, আমরা তোমাদের সব দেব। আমরা তোমাদের রাস্তা বানিয়ে দেব, দুপাশে কাঁঠাল গাছ আর আমগাছ দিয়ে, যাতে গাছের ছায়ায় রাস্তা ঠান্ডা থাকে আর তুমি কিছু ফলও পেতে পার।’
একটা সময় ছিল যখন মানুষ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিত। কিন্তু এমনকি স্বাধীনতার আগেও, যখন আমরা স্বাধীন হই, তখনকার মূল্যবোধের কী অবস্থা হয়েছিল? আমাদের ঠিক জিনিসগুলো শেখানো হয়েছিল। আজকাল লোকে গর্ব করে বলে, তার বাইশ বছরের ছেলে কত আয় করছে, কত রোজগার করছে। সেটা ঠিক আছে, তারা যোগ্য, আয় করছে, সেটা ভালো। কিন্তু ক্রমশ সমাজ ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে।
রাজীব মেহরাত্রা: আপনার অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক একটি বই, ‘আফটার কুরুক্ষেত্র’ আমি পড়েছি, যেখানে নারীদের প্রশ্নের দিকে তাকানো হয়েছে এবং এক অর্থে বৈপরীত্য আর চমক তৈরি করা হয়েছে।
মহাশ্বেতা দেবী: না, না, শুধু নারী নয়, তারাও আছেন। যখন এই ঘটনাগুলো ঘটে, যখন মহাকাব্য রচিত হয়, এটা লেখা হয়, ওটা লেখা হয়, তখন সাধারণ মানুষ, সাধারণ মানুষের ভূমিকা একেবারেই উপেক্ষিত থেকে যায়। কুরুক্ষেত্রের মতো বিশাল যুদ্ধ যদি সেদিন হয়ে থাকে, তখনকার যোদ্ধাদের মধ্যে খুব কম লোকেরই রথ বা শ্রেষ্ঠ অস্ত্র থাকত। কিন্তু আসল কাজ ছিল পদাতিক বাহিনীর, পায়ে হেঁটে লড়াই করা মানুষদের। একজন অর্জুন যাতে ওই তীর চালাতে পারে, বা একজন রাম, বা অর্জুন, কর্ণ, দুর্যোধন— একজন যোদ্ধার জন্য কত পদাতিক সৈন্যকে প্রাণ দিতে হয়েছে। কারণ তাদের কাছে উচ্চমানের অস্ত্র ছিল না, তাদের ওই রথগুলো বাঁচাতে হত, এমন একটা বায়ুমণ্ডল তৈরি করতে হত যেখানে বড়ো বড়ো যুদ্ধ লড়া যেত, মানুষ জিততে পারত। এটা চিরদিনই ছিল। ‘আফটার কুরুক্ষেত্র’ ঠিক তাই। আমার ইচ্ছে হয় আরো বেশি করে গান্ধারী, কুন্তী, রূপ— একেকজনের কথা বলতে, কিন্তু তা নিয়ে তেমন কিছু বলা হয়নি।
রাজীব মেহরাত্রা: আপনি একজন লেখক হিসেবে, আর এটা আসলে আপনার আগে ঘটেছে, সক্রিয়তা পরে এসেছে। অধিকাংশ মানুষের কাছে লেখা হল মহাবিশ্বকে সাজানো এবং বোঝার একটা প্রক্রিয়া, নিজের পরিবেশকে বোঝার। আপনার কি কখনো এই বোঝাবুঝিকে বোঝার সময় ছিল?
মহাশ্বেতা দেবী: কখনো সময় ছিল না, কারণ আমাকে রোজগার করতে হত। রোজগার করা খুব জরুরি ছিল।
রাজীব মেহরাত্রা: তাহলে কি আপনি রোজগারের জন্যই লিখতেন? এটা কি সঠিক হবে?
মহাশ্বেতা দেবী: হ্যাঁ, হ্যাঁ, লেখা আর রোজগার একসঙ্গেই এসেছে, আর আমি যে মানুষ, আমি আর কী-ই বা করতে পারি।
রাজীব মেহরাত্রা: কিন্তু কতখানি একে অপরকে প্রভাবিত করেছে, একটা আরেকটার দিকে ঠেলে দিয়েছে? মানে, আপনি শুধু আপনার বিষয়বস্তু নিয়ে লিখছিলেন না, আপনি তাদের জন্য অনুভব করছিলেন, তারপর আপনি সেখানে ঢুকে পড়ছিলেন এবং তাদের বিপদ নিয়ে কিছু করছিলেন— যা অধিকাংশ লেখকের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক।
মহাশ্বেতা দেবী: হয়তো আমি বেশি জড়িয়ে পড়েছি। কিন্তু আমাদের শেখানো হয় আমাদের সময়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে। আর কেনই বা নয়? দেখুন, যদি আপনি আমাকে আলাদা একজন ব্যক্তি হিসেবে ভাবেন, আমি একজন মানুষ যে রবিঠাকুরের স্কুলে গিয়েছি, যখন রবীন্দ্রনাথ বেশ সক্রিয় ও জীবিত ছিলেন এবং আমাদের তাঁর কাছে অবাধ যাতায়াত ছিল। আমি ১৯৩৬ থেকে ১৯৩৮ পর্যন্ত শান্তিনিকেতনে ছিলাম, আর সেগুলো শান্তিনিকেতন গড়ে ওঠার বছর, খুব গুরুত্বপূর্ণ। তারপর আমি গান্ধীজিকে দেখেছি, সুভাষ বসুকে দেখেছি। কিন্তু তার চেয়েও বেশি, আমি আমার পরিবারে, ব্যক্তিগত পরিবারের গণ্ডির বাইরেও এমন মানুষ দেখেছি, যাদের কাছে এই জিনিসগুলো— সেই দিনগুলোতে— আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, আপনারা যদি এই ধরনের খোঁজ চালান, তাহলে আমার কথার সমর্থন পাবেন। ধরুন সকাল দশটায়, ছোট-বড় শহর, নানা জায়গায় গরিব ছাত্ররা সবে সাজগোজ করে আসত, তারা কোনো বড়লোকের বাড়িতে গিয়ে খেয়ে তারপর স্কুলে যেত। দেখুন, কোনো ব্যক্তি যদি স্বচ্ছল হয়, তাহলে তারা এই সামাজিক কর্তব্য নিজেদের ওপর তুলে নিত তখনো। তারাও ভাবত, এটা আমাদের কর্তব্য— এই বাচ্চাদের খাওয়ানো যাতে তারা পড়তে যেতে পারে, এখানে সকাল-বিকালে খেতে পারে, যাতে তাদের পড়াশোনা চলতে পারে। এটা আমার মনে হয় সারা ভারতে, অনেক শহর আর জায়গায় পাওয়া যাবে। সুতরাং এটা সমাজে ছিল, জিনিসগুলোর রীতি-প্রকৃতির মধ্যেই ছিল।
রাজীব মেহরাত্রা: তাহলে একটা পুরনো ভারতের জন্য এই যে মায়া, যে ভারত এক অর্থে সঠিক পথে ছিল, কীভাবে ...
মহাশ্বেতা দেবী: সেই ভারত তো এখনো এখানেই আছে। আমার ভারত খুবই বিদ্যমান আছে আমার চারপাশে।
রাজীব মেহরাত্রা: তাহলে আপনি যখন ইন্দিরা গান্ধী জাতীয় সংহতি পুরস্কারের মতো কিছু পান, আপনি কি হতাশা বোধ করেন যে ভারতে এত বিভাজন এখনো রয়েছে?
মহাশ্বেতা দেবী: সেটাও তো আছেই, নিশ্চয়ই। যে আমি ভারতকে এত নিয়ে ভাবি, আপনি বলতে পারেন ‘আমার ভারত’, যেমন গর্বাচেভ বলেছিলেন, আমি সরকারের একজন ভক্ত— হ্যাঁ, আমি আমার ভারতের কথা ভাবি। কিন্তু ঠিক আছে। পুরস্কারের নামই জাতীয় সংহতি, আমি কিছু করতে পারি না। আমি জানি, ব্যক্তিগতভাবে আমি খুব বেশি কিছু করিনি। দেখুন, আমি সেই লেখকদের একজন, যে শহরে বসবাস করেও ওই মানুষগুলোর চিঠি পায়, আমাকে সারাক্ষণ যুক্ত থাকতে হয়।
রাজীব মেহরাত্রা: ভারতে লেখকের সক্রিয়তার এই যে সংযোগস্থল, সে সম্পর্কে একটু বলুন। আসুন একটু আপনার লেখার প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলি। কী ঘটে, কী সেই তাড়না লেখার? আপনি একটু আগেই বলেছিলেন, আপনি শহরে বসে থাকেন আর এই চিঠিগুলো আপনার কাছে আসে; আমার মনে হয় সেটা নিজের সম্পর্কে সঠিক বর্ণনা নয়। আপনি আসলে ওই জনসমাজে বেরিয়ে যান, তাদের সঙ্গে বসবাস করেন, তাদের সঙ্গে যুক্ত হন, এবং তাদের অধিকার, চাহিদা ও দায়িত্ব সম্পর্কে সোচ্চার হতে উদ্বুদ্ধ করেন। তাহলে, কোনো গল্পের উৎস কি কোনো ঘটনা থেকে আসে, নাকি যন্ত্রণা থেকে আসে, পরিবর্তনের ইচ্ছা থেকে আসে, কোন ক্যাথারসিস থেকে?
মহাশ্বেতা দেবী: না, ঠিক এমন নয়। যদিও আমার অনেক গল্প যখন আবার পড়ি, দেখি সেখানে ওই ব্যক্তির ছায়া, ওই ব্যক্তির, ওটাও আসবে, সেটাও ঘটবে। কিন্তু চিঠি শুধু আদিবাসী অঞ্চল থেকে পাই না। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, সদ্য বিবাহিতা তরুণীরাও লেখে। তারা বলে, ‘আমি ভেবেছিলাম এই শাড়িটা কিনব, ওটা কিনব, তারপর মনে পড়ল, আপনি লেখেন যে...’ এ রকম অনেক কিছু। আমি বাংলা পত্রিকায় কলাম লিখি, যার মাধ্যমে আরো অনেক মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়। এত কিছু ঘটে, জীবন সত্যিই বেঁচে থাকার মতো, জীবন যেন এক উৎসব। প্রতিদিন নতুন নতুন অভিজ্ঞতা আসে। আর এই পুরস্কারও এক অর্থে খুব প্রয়োজনীয়, আমি শুধু আর্থিক মূল্যের কথা বলছি না।
রাজীব মেহরাত্রা: কারণ আপনি তো পুরস্কারের টাকা আপনার গড়ে তোলা এনজিওতে দান করে দিয়েছেন, ম্যাগসাইসাই পুরস্কারের ক্ষেত্রেও তাই।
মহাশ্বেতা দেবী: শুধু সেজন্য নয়। আমি তো ভারতীয় মানুষের কাছে যাই, তাদের কাছে এই নামগুলো অনেক ওজন রাখে, অনেক অর্থ বহন করে। যখন তারা বলে, ‘ইন্দিরা গান্ধীকে শ্রদ্ধা করি’, তারা এটা বোঝায় না যে তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের ছিলেন কি না, সেটা দিয়ে তারা বিচার করে না। আমাদের বড় মানুষগুলো সাধারণ মানুষের, গ্রামের মানুষের কাছ থেকে অনেক শ্রদ্ধা ও ভক্তি পান। তাদের কাছে এই নামগুলো, নামগুলো খুব অর্থ রাখে।
রাজীব মেহরাত্রা: ইন্দিরা গান্ধী সম্পর্কে আপনার ধারণা কী? যদি তার স্মৃতিচারণ করতেন!
মহাশ্বেতা দেবী: ইন্দিরা গান্ধীকে আমি তেমন দেখিনি; তার বাবাকে দেখেছি, কারণ আমি আবার শান্তিনিকেতনে বিএ পড়তে গিয়েছিলাম, ঠাকুর-পর্বের পরে। জওহরলালজি শান্তিনিকেতনে আসতেন, ইন্দিরা গান্ধীও তখন সেখানে ছিলেন, কিন্তু ততদিনে আমি শান্তিনিকেতন ছেড়েছি।
রাজীব মেহরাত্রা: তবু তার সম্পর্কে একটা ধারণা তো আছেই, কারণ তিনি প্রায় দুই দশক ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তাহলে আপনার ধারণা কী, আপনি তো তার স্মৃতিসম্মাননায় সম্মানিত হচ্ছেন, আপনার বোঝাপড়া কী ছিল?
মহাশ্বেতা দেবী: তিনি খুব ভালো ছিলেন, সত্যিই ভালো ছিলেন, কঠিন সময়ে। তার আমলে অনেক ভালো কাজ হয়েছে, যেমন নিবন্ধিত শ্রমিক প্রথা বিলোপ আইন। আর তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে ছিলেন। তাই লোকে যদি কাউকে শুধু ইতিবাচক অর্জন দিয়ে বিচার করে, তাহলে কতজনই বা টিকে থাকতে পারে!
রাজীব মেহরাত্রা: অন্যরা কীভাবে আপনাকে দেখবে বলে আপনি মনে করেন?
মহাশ্বেতা দেবী: আমি চাই মানুষ আমার বই পড়ুক, এটুকুই। তারপর আমাকে ভুলে যাক। তারা নিজেদের গল্প লিখুক, তাদের যা কিছু আছে তাই। জীবনটা খুব পুরস্কারে ভরা এক অভিজ্ঞতা— এতদিন বেঁচে থাকা, এত মানুষের সঙ্গে থাকা। আর এটা দারুণ ব্যাপার, যতটা পেরেছি ভারতে ঘুরেছি, অনেক জায়গা ঘুরতে হয়েছে আর সেসবের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়েছে।
রাজীব মেহরাত্রা: এটা আগ্রহোদ্দীপক যে আপনি বলছেন, মানুষ যেন আপনার বই পড়ে, আর নিশ্চয়ই আপনাকে একজন লেখক হিসেবে বেশি স্মরণ ও স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আপনার ব্যক্তিত্ব, আবেগ, যত্ন, মমতা— বইগুলোর বাইরে আপনার হাতেকলমে কাজের মধ্যে দিয়ে, আপনার ধারণার চেয়েও বেশি ফুটে ওঠে।
মহাশ্বেতা দেবী: সেটাও আছে, রাজীব। আমি চাই আপনি বোঝেন এবং মানুষকে বলুন, আমাকে খুব প্রকট করে দেখা হয়, এই যে বলি আমি এটা করেছি, ওটা করেছি— আমি একা নই। যদি আমার সঙ্গে এত মানুষের সমর্থন না থাকত, আর যাদের জন্য আমি লড়ছি, যেমন সেই আদিবাসীরা, যদি তারা নিজেরা এগিয়ে না আসতেন, যদি তারা না করতেন এবং এখনো না করে চলতেন, তাহলে আমি কে? আমি কোনো প্রভাব তৈরি করতে পারতাম না। দেখুন, আমরা একজনকে আলাদা করে নিই এবং আকাশে তুলে প্রশংসা করি। কিন্তু আসলে সব সময়ই সব মানুষ একসঙ্গে কাজটি করে।
রাজীব মেহরাত্রা: আপনি যখন বলছিলেন আপনার বয়স হচ্ছে, ধীর হয়ে আসছেন— কোন বিষয়গুলো এখন অগ্রাধিকার পাচ্ছে?
মহাশ্বেতা দেবী: স্বাভাবিকভাবেই লেখা। লেখা আমার হৃদয়ে সবার আগে আসে। সবসময় লেখার কথাই ভাবি, এমনকি যখন কেউ জানেও না। যদি কিছু মনে দাগ কাটে, কোনো জিনিস, কারো নাম, কিছু লক্ষ করলেই আমি সেটা রেখে দিই, কিছু না কিছু, কারণ ওখান থেকেই কিছু বেরিয়ে আসে। কোথাও আছে, আমি জানি না ‘আজির’ গল্পটা যেমন অনুবাদ হচ্ছে।
রাজীব মেহরাত্রা: ‘আজির’ শব্দটার অর্থ কী?
মহাশ্বেতা দেবী: আজির মানে হলো সেই ব্যক্তি, যে নিজেকে কারো কাছে বিক্রি করে দাস হিসেবে, অনেকটা ঋণের বন্ধনের মতো, খুব সামান্য কিছুর বিনিময়ে। ‘আজিরি’— কেউ নিজেকে খাটায়, বলল, ‘তোমার বাড়িতে কাজ করব, তোমার ক্ষেতে, দুধের গোয়ালে, যেকোনো জায়গায়, খুব সামান্য অর্থে, হয়তো একমুঠো চালের বিনিময়ে।’ সেই বলল, ‘আজির মানে সে, যে নিজেকে বা নিজের পরিবারকে অতি সামান্যে বিক্রি করে।’ কথাটা আমাকে খুব আঘাত করেছিল। তারপর আমি ভাবছিলাম, পুরনো বাঙালি পরিবারগুলোতে একটা দারুণ প্রথা ছিল— কোনো পুরনো পরিবার, ধরুন আমি আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি না, দেখলাম আপনার পরিবার অমুক গ্রাম থেকে এসেছে, সেই পরিবারের ইতিহাস কাউকে দিয়ে লিখিয়ে ছাপাত। এগুলো খুব মূল্যবান সামাজিক দলিল। আমি একবার সেরকম এক ছাপানো পারিবারিক ইতিহাসে দেখতে পেলাম কিছু ‘আজিরি পাট্টা’।
আট কলামের ষোলকলা
২৮ জুলাই ২০২৬
রাজীব মেহরাত্রা: তাহলে এই লেখার প্রক্রিয়া কতখানি আবিষ্কারের? আমি এটাকে আবিষ্কার বলছি, কারণ আপনি এই ‘আজির’-এর উদাহরণ দিলেন, কীভাবে সেটা আপনাকে একটা ছোট যাত্রায় নিয়ে গেল। কিন্তু আপনি যা নিয়ে লেখেন, তার পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, তা বাস্তবতার এত গভীরে প্রোথিত যে পাঠকের মনে ছাপ ফেলে, এটা আসলে সেই বাস্তবতার, সেই বিপর্যয়ের, সেই যন্ত্রণার প্রতি আপনার প্রতিক্রিয়া।
মহাশ্বেতা দেবী: একটা শব্দ, ওই রকমই হতে হবে। কারণ একজন মানুষ নিজেকে এত কমে বেচতে যাবে না, যদি না সেখানে ভয়াবহ কিছু থাকে। হয়তো দুর্ভিক্ষ বা কিছু একটা, না হলে লোকটা চরম সংকটে থাকে না। কী তার সেই সংকটের কারণ? নিশ্চয়ই শোষণ আছে, দারিদ্র্য আছে। বর্ণ-ব্যবস্থা থাকতেও পারে। তখনকার দিনে কত কিছু ঘটত। তাই যে গবেষণাই করি না কেন, শেষমেশ কোথাও না কোথাও গিয়ে ঠেকি মানুষের দীর্ঘস্থায়ী অনাহারের ভেতর। হয় দুর্ভিক্ষ, নয় বিতাড়ন, নয় শোষণ। কিছু কিছু শব্দ আমাকে টেনে নিয়ে যায়। কী আর করব!
রাজীব মেহরাত্রা: আপনি কষ্টের কথা এত বলেছেন, আপনি কি কষ্টকে ভয় পান? বুদ্ধ তো বলেছিলেন, দুঃখ অবশ্যম্ভাবী। আপনি কি ভয় পান? ভয় অনুভব করেন? মৃত্যুর?
মহাশ্বেতা দেবী: মৃত্যুর? না, না, মৃত্যু তো ঘটছেই। আসলে আমি মরতে চাই না, আমি অন্তত আরও কুড়ি বছর বাঁচতে চাই, আর সক্রিয়ভাবে।
রাজীব মেহরাত্রা: ওই কুড়ি বছরের কর্মসূচি কী?
মহাশ্বেতা দেবী: ঠিক সেই মানুষটিই থাকা, যা আমি; আর কাজ চলতেই থাকবে। দেখুন, এটা খুব আনন্দদায়ক, এই বেঁচে থাকা। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ জানাই, আপনার সঙ্গে আলাপ বড় সম্মানের।
রাজীব মেহরাত্রা: ধন্যবাদ, ধন্যবাদ।










