সন্ধ্যামণি গাছ

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
আজ ৭ সেপ্টেম্বর। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্মদিন। বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণযুগের শেষ পর্যায়ের লেখক ছিলেন সুনীলদা। সুনীলদার জন্মদিন মানে আগে কোনোদিন ৬ থেকে কিংবা কোনোবার ৭ তারিখ থেকে আমাদের খুব আনন্দ হতো। সত্যিকথা বলতে আমি শান্তিপুরের নোয়াখালী পাড়ার যে পরিবেশ থেকে সুনীলদার ম্যান্ডেভিল গার্ডেন্সের অভিজাত ফ্ল্যাটে গিয়েছিলাম তা আমার কাছে স্বপ্নের মতো। আমাদের পাড়া ঘরে তখন ছোটদেরই ঠিকমতো জন্মদিন পালন হতো না তো বড়োদের! আমার বাবা কিংবা মায়ের কিংবা আমার পরিচিত কোনো বড়োদের তখনো অব্দি জন্মদিন পালন হতে দেখিনি। প্রথম দেখা সুনীলদার জন্মদিন। আর তখন তো মোবাইল-ফেসবুক ছিল না ফলে জন্মদিন-বিবাহবার্ষিকী নিয়ে এতো উন্মাদনাও ছিল না। সুনীলদার ফ্ল্যাটে গিয়ে তো চোখ ছানাবড়া। বাংলার সব প্রথম সারির লেখক-কবি তো বটেই এমনকি টিভিতে-সিনেমাতে যাদের দেখা যতো তারও আসতেন। তক্ষণ কলেজ শেষ করে সবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। প্রচুর লেখা পড়ি কিন্তু সামনে থেকে শঙ্খ ঘোষ উৎপলকুমার বসু দিব্যেন্দু পালিত শরৎ-বিজয়া মুখোপাধ্যায় নবনীতা দেবসেন এমনকি মৃণাল সেনকে দেখা সেই প্রথম-প্রথম শুরু। পার্ট ওয়ান দিতে না দিতে বাবা চলে গেলেন, ফলে মায়ের পেনশন আর টিউশনের টাকায় বেশ কষ্ট হতো চলতে। সুনীলদার বাড়ি ঢোকার মুখে যেখানে সবাই জুতো খুলে রাখতেন আমার বেশ লজ্জা লাগতো ওখানে জুতো রাখতে। কতরকম সব দামি-দামি জুতো। আমার সবথেকে ভাল-বহু পালিশে ক্ষয়ে যাওয়া জুতোটা কোনোক্রমে লুকিয়ে রাখতাম। নিজেও সেরকম লুকিয়ে-গুটিয়ে থাকতাম। কিন্তু সুনীলদা ও স্বাতীদি হলেন মহামানব। ওর আপন করে নিয়েছিলেন। কত-কতদিন যে দুপুরে ও রাতে ওদের বাড়িতে খেয়েছি তা গুণে বলতে পারবো না। জীবনে প্রথম শান্তিনিকেতন গিয়েছি সুনীলদার হোন্ডাসিটি গাড়িতে। সংস্কৃতির অভিজাত মহলে তখন দেখতাম কেউ-কেউ আমাকে দেখে বিরক্ত হতেন। বেশ কয়েকবার গিয়েছি। কিন্তু একদিনের কথা এখনো মনে আছে মাননীয় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সঙ্গে দেখা করার জন্য গেছেন সুনীলদা, সঙ্গে আমি আছি তো এরকম একজন বলে উঠলেন- সুদীপ এখানে? সুনীলদা বললেন- আমার সঙ্গে এসেছি। ও থাকবে। আজ এই পুণ্যদিনে সুনীলদা ও স্বাতীদিকে আভূমি প্রণাম জানাই। সুনীলদা চলে যাওয়ার পর আমাদের 'কৃত্তিবাস' পত্রিকা থেকে একটি সংখ্যা হয়েছিল। সেখানে এই কবিতাটি লিখেছিলাম-
সন্ধ্যামণি গাছ
(যদিও সুনীলদা আত্মায় বিশ্বাস করতেন না)
এত দেরি করলে সুনীল! আমি সতেরো বছর বসে আছি। তারাপদ, শ্যামল, সন্দীপন, মতি, মোহিত, শিবশম্ভু সবাই মিলে খাচ্ছি। দারুণ ব্র্যান্ডি ভাই, একটু চেখে দেখবে নাকি স্বর্গের সুরা? কীসব ব্লু লেভেল খাচ্ছিলে? আর কাদের সঙ্গে? জানো সেদিন উর্বশীর নাচ দেখে ফিরছিলেন রবীন্দ্রনাথ, আমার সঙ্গে দেখা হতেই মুচকে হাসি, বুড়ো বড্ড লাজুক। বলো এবার ওদিকের কথা বলো, কেমন হল শেষ সংখ্যা কৃত্তিবাস? শক্তির কথা শুনে সুনীল ম্লান হাসল। সত্যিই তো, পিস হাভেন থেকে বার হবার সময়ও বুকেই ছিল কৃত্তিবাস। কিন্তু ভিড়-ভাট্টা, হট্টগোলো কোথায় যে গেল, আপশোশই হল সুনীলের, শেষ সংখ্যাটা বন্ধুকে দেখাতে পারলে ভাল হত। কিন্তু সব তালগোল পাকিয়ে গেল।
আমরা এখানে মাথা খুঁড়ে মরছি। পাতাল কালীর চাঁদা আদয় করছি লরি থামিয়ে। কোনও মদে নেশা নেই চাঁদু ডাক্তারের কাছে লাগিয়ে আনছি ড্রাকুলার দাঁত। কবজি কেটে লাগালাম নেকড়ের থাবা অন্যদল শিকারি। অন্ধকারের উৎস হতে শুধু অন্ধকারের ফোয়ারা। সন্ধ্যামণি গাছে দারুণ দেখতে লাগছে হিংসার ফুল। যে করে হোক একদিন আপনাদের কাছে চলে যাব, নতুন কবিতা জমা দেব আপনাদের পত্রিকায়।






