রবীন্দ্রনাথের শেষ দিনগুলো

ছবি: লেখকের সৌজন্যে
১৯৪১ সাল। জীবনের গোধূলিলগ্ন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিঃশব্দে চলছেন বিদায়ের পথ ধরে। সারা জীবন নিজের শরীরের ওপর অস্ত্রোপচারের ছায়া পড়তে দেননি। এবার যেন নিজেই বুঝতে পেরেছেন— আর হয়তো ফেরা হবে না।
তিনি তখন শান্তিনিকেতনে। শরীর ক্রমেই ভেঙে পড়ছে। হোমিওপ্যাথি, অ্যালোপ্যাথি— সবই চলছে, কিন্তু অসুখ কোনো কথা শুনছে না। অসুস্থতার মধ্যেই প্রিয় অবনীন্দ্রনাথের কিছু গল্প পড়ে কবির চোখে অশ্রু-হাসি একসঙ্গে দেখা দিল। রানী চন্দ— প্রিয়জন, সহচর, শিল্পী প্রথমবার দেখলেন কবির চোখে এমন নীরব অশ্রুবর্ষণ। তিনি যে কাঁদেন, এ কথা যেন বিশ্বাস করা দায়।
চিকিৎসকেরা বললেন, অস্ত্রোপচার করতে হবে। কবি বললেন, ‘মানুষকে তো মরতেই হবে... তবে এই দেহের শেষ এমনি করেই হোক না শেষ।’ কিন্তু যন্ত্রণার তীব্রতা তাকে বাধ্য করল শান্তিনিকেতন ছেড়ে জোড়াসাঁকোর সেই পুরোনো ঘরে ফিরে যেতে।
২৫ জুলাই বিকেলে স্ট্রেচারে করে তাকে নেওয়া হলো দোতলায়, তার ‘পাথরের ঘর’-এ। পরদিনই তিনি চেনা সেই প্রফুল্ল রবীন্দ্রনাথ- অতীতের কথা মনে করে প্রাণখুলে হাসলেন। ২৭ জুলাই সকালে তিনি মুখে মুখে বলে গেলেন এক কবিতা, ‘প্রথম দিনের সূর্য প্রশ্ন করেছিল সত্ত্বার নতুন আবির্ভাবে...’।
৩০ জুলাই অস্ত্রোপচার হলো। কবিকে কিছুই জানানো হয়নি। যখন জানলেন, বললেন, ‘তা ভালো। এরকম হঠাৎ হয়ে যাওয়াই ভালো।’ অস্ত্রোপচারের পর যন্ত্রণা সইলেও মুখে হাসি রেখেছিলেন, বলেছিলেন, ‘খুব মজা, না?’
এরপর দিনগুলো যেন বিষাদের ছায়ায় ঢাকা পড়ল। ৩১ জুলাই থেকে কবির শরীর খারাপ হতে থাকে। জল-ফলের রস ছাড়া কিছুই খেতে পারছেন না। ২ আগস্টে যখন বললেন, ‘আহ! আমাকে জ্বালাসনে তোরা’—সেই কথাটুকুতেই সকলে আনন্দে ভিজে গেল।
৬ আগস্ট রাত থেকে পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক হয়ে ওঠে। ৭ আগস্ট, বঙ্গাব্দ ২২ শ্রাবণ। সকাল ৯টায় অক্সিজেন দেওয়া হলো কবিকে। তার শ্বাস ধীরে ধীরে নিঃশেষ হতে থাকল... ঠিক দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে থেমে গেল সেই বিশ্বমানবের নিঃশ্বাস— যে শ্বাসে একদিন বাংলার হৃদয় বেঁধেছিলেন তিনি।
শেষ হলো এক অনন্য জীবনের মহাকাব্য!
বিশ্ব কবির প্রয়াণ দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধা!




