নয়ের দশকের মোহনা, আমাদের কবিপথ ও সুনীল

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
আমলকী গাছে ঠেস দিয়ে আছে শীত
উড়ে গেল তিনটে প্রজাপতি
একটি কিশোরী তার করমচা রঙের হাত মেলে দিল
বিকেলের দিকে
সূর্য খুশি হয়ে উঠলেন,
তার যুবা হতে সাধ হল।
(নিসর্গ/ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)
সেই নয়ের দশকে আমরা যখন 'বড়' হচ্ছিলাম, সুনীল তখন বাংলা সাহিত্যের জীবন্ত দেবদূত! দশহাতে লিখছেন, ভাবছেন ও ভাবাচ্ছেন। দেশ-কাল-সমাজ-সভ্যতা-জন্ম-মৃত্যু-প্রেম-যৌনতা নিয়ে মতামত দিচ্ছেন নিজের মতো করে। শিক্ষিত সাধারণ বাঙালির অধিকাংশ তাঁর ভাবনায় ভাবিতও হচ্ছে। সবটা যে মেনে নিতে পারছে তা না, কারণ ভিতু মধ্যবিত্তের অতটাও কলজের জোর নেই। 'সরল সত্য' উপন্যাসে সুনীলের কলম যখন বলে---"মেয়েরা এখনও অসভ্য বর্বর পুরুষদেরই পছন্দ করে। কোনও ছেলের এক্সসারসাইজ করা মাসল ফোলানো চেহারা দেখলেই মেয়েরা বলে, কী সুন্দর চেহারা!" এমন অকপট সত্যি হজম করা ছাপোষা কেরানির সাধ্য না। তবে কিনা হালকা চালের সত্যির পাশাপাশি 'প্রথম আলো'র সেই ভারী বিস্ফোরক উক্তি--- "মানুষই মানুষকে বাঁচায়, মানুষই মানুষকে মারে। মানুষই হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে, আবার মানুষই এই বিভেদের রেখা মুছে ফেলতেও পারে।"
উপমহাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় সাহিত্যিক যখন বলেন---"প্রেমিকরা কখনও অভিজ্ঞ হয় না। অভিজ্ঞ লোকেরা প্রেমিক হতে পারে না।" তাও কি ষোলোয়ানা হজম করতে পারে এ গ্রহের সামাজিক জীব? তবে কিনা স্বভাবে হোক বা ভাগ্যদোষে বউ-বাচ্চার মায়া জড়ানো দশটা-পাঁচটার জীবন থেকে মুক্তি নেই বেচারাদের! হয়তো অবচেতনে তাঁরাও অনুভব করেন--- জীবনকে 'নীললোহিত' যতটা ছুঁতে পারল, আমরা তা পারলাম না! মধ্যবিত্তের এই না পারার বেদনাই হয়তো সুনীল-সাহিত্যের বিপুল জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ। কতকটা একই কারণে বাংলাদেশ জয় করেন কিংবদন্তি সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ।
শুধু সুনীল আর হুমায়ূনের কথাই বা বলছি কেন, পৃথিবীর ইতিহাসের সমস্ত শ্রেষ্ঠ শিল্পীই তো গোপন স্বপ্নের ফেরিওলা। সারাদিন 'চাকরের' জীবন কাটিয়ে দিনান্তে গান শুনতে শুনতে, সিনেমা দেখতে দেখতে কিংবা কবিতা পড়তে পড়তে নিজেকে কল্পিত রাজা অনুভব করাই তো পাঠকসত্ত্বা। এমনতর বাঙালিকেই কি খানিক খোঁচা দিয়েছিলেন সুনীল---"কোনও একটা বিষয় সম্পর্কে খুব কম জেনেও বাঙালি অনেকক্ষণ আলোচনা চালিয়ে যেতে পারে। এটা বাঙালি চরিত্রের একটা বিশেষত্ব।"
এইসব কারসাজির মধ্যে অবশ্য আমার মতো 'এলিয়েন' পাবলিককে পাবেন না। কারণ ব্যক্তিগতভাবে আমি লোকটা ঘোষিত অশিক্ষিত, তদুপরি অবাধ্য। পরিবার-পাড়া-রাজ্য-দেশ-কাল-সমাজ-সভ্যতার কথা এক কান দিয়ে ঢুকিয়েছি এবং অন্য কান দিয়ে...। তার উপর ঘোর সন্দেহ বাতিক। যেমন, সেবার বাড়িতে ঘটা করে সরস্বতী পুজো, আর খামোকা ঘ্যানঘ্যান তুললাম--- ঠাকুর মশাই যে মন্ত্র আওড়াচ্ছেন তার অর্থ কী? পুরোহিত কি সংস্কৃত জানেন? জানলে বলুন। না জানলে তিনি কোন অধিকারে পুজো করেন? এদিকে স্কুলের পরীক্ষায় লবডঙ্কা ছাত্র। অতএব, আমার কথা শুনেই রে-রে করে উঠত বাড়ির বড়রা। এ কী অলুক্ষুণে কথা! মুখ চেপে ধরত সবাই। এবং আমিও একটু একটু করে বুঝতে শিখলাম, এই গ্রহের যে আবহে বেঁচেবর্তে আছে মানুষ, সেখানে সত্যি বলার নিয়ম নেই। বরং রুটিন মিথ্যে বলাই বুদ্ধিমানের কাজ।
যেমন ধরুন, রাস্তাঘাটে আত্মীয় পরিচিতদের দেখা মাত্র এআই রোবোট কায়দায় বলতে হবে--- 'ভালো আছেন?', 'কেমন আছেন?' এভাবে বলতাম না বলে বাড়িতে তুমুল বকা খেতাম। এছাড়াও সঙ্কীর্ণ মানসিকতার 'বড়'কে প্রণাম করিনি বলে জোর অশান্তি। আসলে প্রশ্ন তুলেছিলাম, যাঁকে প্রণাম করব তিনি আদৌ প্রণম্য তো?
এসেছি নয়ের দশকের মোহনায়, তাদের সামনে যেন দেবমূর্তি ছিলেন সুনীল। সেই বিগ্রহ--- হাতকাটা শার্ট, মাস্তানের মতো বুকের বোতাম খোলা, দরাজ হাসি, হাতে জ্বলন্ত সিগারেট
সব মিলিয়ে আমার মতো পাবলিকের বড় হওয়া আসলে এক অবাধ্যতার বড় হওয়া। এমন অবাধ্যতার, পক্ষন্তরে পদে পদে যুক্তিযুক্ত প্রশ্ন তোলার প্রেরণা কি কাঠবেকার, ভালোবাসার রাজা সেই নীললোহিত? ওই অল্প বয়সেই কিন্তু একটা বিষয় স্পষ্ট হচ্ছিল---একদিকে জং-ধরা সমাজের মগজধোলাই, অন্যদিকে উদার বিশ্বপ্রকৃতি, এই দুইয়ের মাঝে নিজের জীবনটাকে খুঁজে পেতে হবে। এখন মনে হয়, ওমন বেয়াড়া দূরবীনের খোঁজেই পাঁচ দশকের বাউন্ডুলে কবিদের কলকাতার রাত শাসন? যে দলে ছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় এবং সুনীল গঙ্গেো। তার মানে "রাত বারোটার পর কলকাতা শাসন করে চারজন যুবক"--- শরৎকুমারের এই পংক্তি কেবল কথার কথা না! ছিল অতি দরকারি কাজ। আদতে চাঁদের মতো কোনও দূরবিনের খোঁজে একঝাঁক তরুণ কবিকে জীবনই ঠেলে দিয়ে দিয়েছিল মধ্যরাতের অন্ধকারে।
সোজা কাজ না, বরং এলডোরাডো সন্ধানের মতোই বেজায় কঠিন এ জীবন। আমিও বুঝলাম, তার মানে একটা ম্যাপ লাগবে, যেহেতু এক অপার্থিব গুপ্তধনের খোঁজে মেতে উঠেছি। এও জানি, যে গোটা মানচিত্র মিলবে না। টুকরোটাকরা ছড়িয়ে থাকবে পথে-ঘাট-উঠোনে। দমকা হাওয়ায় উড়ে যাওয়ার আগেই কুড়িয়ে নিতে হবে সেসব। সেই মতো লুকিয়ে লুকিয়ে সুনীল পড়তে শুরু করেছিলাম।
বুকের ভেতরে একটা খাচকাটা তাক, সেখানে জড়ো হতে শুরু করল ফুটবল-ঘাস-নীরা-ঘুড়ি-নীললোহিত-নক্ষত্র-পূর্বপশ্চিম-ভালোবাসা নাও হারিয়ে যেও না-বিকেলের সাইকেল-অরণ্যের দিনরাত্রি-কাঠালতলার আড্ডা-ছবির দেশে, কবিতার দেশে-ক্যারাম-প্রথম আলো-পিকনিক-শ্রেষ্ঠ কবিতা....। এভাবে বলতে থাকলে দিন কাবার হয়ে যাবে মাইরি।
আসল কথা হল, এসবই মহা মহা শূন্য জোড়া দিতে দিতে একটা মহাকাশ স্টেশন গড়ার ষড়যন্ত্র! যে কাজ আমাকে সেই গুপ্তধনে পৌঁছে দিতেও পারে, যার সন্ধান পেয়েছিলেন 'স্মৃতীর শহর'-এর কবি। আদৌ কি তাকে ছুঁতে পারার ক্ষমতা আছে আমার! তবু, এই না পারাটুকুও যে এক ধরনের পারা তা কে শেখাল? এই জীবন দর্শনের মধ্যে যে সাহস, তা কে যোগাল? কবিতা নিয়ে, কবিকে নিয়ে সামাজিক তুচ্ছতাচ্ছিল্য টের পেতে শুরু করা আমি অপমান উপেক্ষা করতে শিখলাম কীভাবে?
শিখলাম কারণ ততদিনে আমার মতো উন্মাদের পাঠক্রম হয়ে উঠেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। বৃষ্টির মতো তাঁকে পড়তে শুরু করেছি, রোদ্দুরের মতো, মধ্যরাতের নরম ভালোবাসার মতো করে...! আমরা, যারা কবিতা লিখতে এসেছি নয়ের দশকের মোহনায়, তাদের সামনে যেন দেবমূর্তি ছিলেন সুনীল। সেই বিগ্রহ--- হাতকাটা শার্ট, মাস্তানের মতো বুকের বোতাম খোলা, দরাজ হাসি, হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। আর লেখার টেবিল। মাথা-নীচু নিরলস অধ্যাবসয়। সেই মানুষটাই আবার বেরিয়ে পড়ে মধ্যরাতের কলকাতা, অলিগলির বিষাদকে চমকে দিতে! কিংবা চাইবাসা কী উত্তরবঙ্গের জঙ্গলের মাথায় ওঠা চাঁদ খুঁজতে ছুট ছুট...।
আসলে প্রেমিক, বিরাট প্রেমিক না হলে এমন কাজ অসম্ভব। নীরা নীরা নীরা... চিৎকার জুড়ে কাঁপিয়ে দেন ত্রিভূবন! এবং সদর্পে বলতে পারেন, 'কবিতা সবার জন্য না'। এই বক্তব্যের মধ্যে যেমন ছিল চূড়ান্ত সত্যি, তেমনি ছিল কবিতার প্রতি গভীরতম সম্ভ্রম। যা শোনার পর তরুণ কবি হিসেবে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠাই স্বাভাবিক নয় কি!
অতএব, বুঝে উঠছিলাম---ঠিক পথেই এগোচ্ছি। সমাজ শাসাবে, সভ্যতা মারবে, তবু থামলে চলবে না। সুনীল পড়তে পড়তে... জীবন যে সমুদ্র, তার যে সীমা পরিসীমা হয় না, তা টের পাচ্ছিলাম চুপি চুপি। আর এক বিস্তারের আনন্দে মেতে উঠছিল আয়ু। সেই বিস্তারও আসলে এক সত্যি। সুনীলের মতোই বড় ও মহাজীবনের উৎসবের সত্যি। যাতে চাঁদের কলঙ্কও রয়েছে। তবে কিনা অহংকারী কলঙ্ক সে! অন্ধকারকে শাসন করা এক দেবদূতের জোছনাযাপনের পাপ।
কবি ও সাংবাদিক






