জহির রায়হান
নিখোঁজ নক্ষত্রের আলো

১৯৬৫ সালে পাকিস্তান ফিল্ম ফেস্টিভালে জহির রায়হান। ছবি: সংগৃহীত
১৯৭২ সালের ২৮ জানুয়ারি, শীতের কুয়াশায় ঢাকা মিরপুর। সারাদেশ স্বাধীন হয়ে গেলেও মিরপুর তখনো রহস্যময় পরাধীন অঞ্চল, বিহারী-অধ্যুষিত। একটি ফোনকল। অজানা কণ্ঠ জানিয়ে দিল— আপনার ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে মিরপুর ১২ নম্বরে আটকে রাখা হয়েছে। জহির রায়হান থামলেন না, দেরি করলেন না। ছুটলেন সেই কুয়াশার দিকে। তারপর? তারপর আর কিছু নেই। শুধু কুয়াশা, শুধু নীরবতা, শুধু এক অমীমাংসিত রহস্যের অতল। বাংলা সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র এভাবেই হারিয়ে গেলেন, মাত্র ৩৭ বছর বয়সে। লাশ এখনো পাওয়া যায়নি, তাই তার মৃত্যুদিন নেই, আছে গুমদিন। আর আছে জন্মদিন— ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট বাংলার মাটিতে জন্মেছিলেন তিনি।
জন্মেছিলেন ফেনীর মাজুপুর গ্রামে। পিতা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ, মাতা সৈয়দা
সুফিয়া খাতুন। আট ভাইবোনের সংসারে তৃতীয় সন্তান। নাম রাখা হয়েছিল আবু আবদাল মোহাম্মদ
জহিরুল্লাহ, ডাকনাম জাফর। পিতার চাকরির সুবাদে শৈশব কেটেছে কলকাতায়, কলকাতা মডেল স্কুলে
হাতেখড়ি, তারপর মিত্র ইনস্টিটিউট। ১৯৪৭-এ দেশভাগের পর সেই কিশোর ফিরে এলো ঢাকায়,
সঙ্গে বয়ে আনলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অমূল্য শিক্ষা। আমিরাবাদ স্কুল থেকে
প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক, এরপর ঢাকা কলেজ, তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অর্থনীতির ক্লাসে
বসে মন পড়ে থাকত গল্প-উপন্যাসের পাতায় আর দুনিয়াতেই নতুন নেশা তখনো, সেলুলয়েডের
সিনেমা। সেই টানেই লেখাপড়া ছেড়ে পুরোপুরি সাহিত্য আর চলচ্চিত্রের আরাধনায় মগ্ন হলেন।
কিন্তু কেবল কলম নয়, রাজপথও তাকে ডেকেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন ছাত্র সংসদের
নেতা ছিলেন তিনি। ১৯৫০ সালে ‘যুগের আলো’ পত্রিকায় যোগ দিয়ে সাংবাদিকতা শুরু করেন,
পরে ১৯৫৬ সালে ‘প্রবাহ’ পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন।
১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন ছিল তার জীবনের প্রথম ঝড়। ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় ১৪৪ ধারা জারি হয়েছিল, উদ্দেশ্য একুশে ফেব্রুয়ারির হরতাল পণ্ড করা। ছাত্ররা সেদিন রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার ষড়যন্ত্র ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিল। ফজলুল হক হল, ঢাকা হল ও সলিমুল্লাহ হলের ছাত্ররা মিটিং করে জানিয়ে দেয়, সরকার রক্তচক্ষু দেখিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে চাইলে তারা একতিলও ছাড় দিতে রাজি নয়। রাজনৈতিক নেতাদের নির্দেশ অমান্য করে ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভেঙে রাস্তায় মিছিল বের করার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথম যে দশ জন ছাত্র মিছিল বের করেছিল, তাদের একজনের নাম জহির রায়হান। ঐতিহাসিক ২১শে ফেব্রুয়ারির আমতলা সভায়ও উপস্থিত ছিলেন, পুলিশের হাতে গ্রেফতার হলেন। জেলের অন্ধকারে বসে লিখলেন ‘আরেক ফাল্গুন’—বায়ান্নর রক্তস্নাত ভাষা-আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত এক অমর কথামালা। এই উপন্যাসের সেই অসামান্য অংশটি বাংলাদেশের প্রতিটি গণআন্দোলনে নতুন করে ভাইরাল হয়: ‘নাম ডেকে ডেকে তখন/ একজন করে ছেলেমেয়েদের/ ঢোকানো হচ্ছিলো জেলখানার ভেতরে।... আসছে ফাল্গুনে আমরা আবার দ্বিগুণ হবো।’
সাহিত্যে তার যাত্রা শুরু প্রথম উপন্যাস ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’ (১৯৬০) দিয়ে, এক রোমান্টিক প্রেমের আখ্যান। কিন্তু তার পরেই ‘হাজার বছর ধরে’ (১৯৬৪)—আবহমান বাংলার গ্রামীণ জীবনের পটে আঁকা এক মহাকাব্যিক ছবি। এই উপন্যাসেই তিনি যেন ধরে ফেলেছিলেন বাংলার মাটির গন্ধ, নদীর স্রোত, মানুষের হাহাকার। ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলার কৃষকদের শোষণ ও নির্যাতনের এক বেদনাদায়ক চিত্র এই উপন্যাসে উঠে এসেছে। ‘বরফ গলা নদী’তে শহরের নিম্নমধ্যবিত্তের অসহায়ত্ব, ‘আর কত দিন’-এ পদদলিত মানবাত্মার সংগ্রাম, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ ও ‘আরেক ফাল্গুন’-এ ভাষা আন্দোলনের জ্বালা ও জয়গান— প্রতিটি রচনায় তিনি তুলে ধরেছেন সমাজের বাস্তব চিত্র, শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, আর মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। ‘আর কত দিন’ উপন্যাসের সেই বিখ্যাত অংশটির কথা মনে পড়ে: ‘ওরা আমার ছেলেটাকে মেরে ফেলেছে হিরোশিমায়। আমার মাকে খুন করেছে জেরুজালেমের রাস্তায়।... আমার ভাই, তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মেরেছে ওরা। কারণ সে মানুষকে ভীষণ ভালোবাসতো।’ ‘বরফ গলা নদী’-তেও তিনি লিখেছেন: ‘ছুরি দিয়ে কেটে কেটে জীবনটাকে বিশ্লেষণ করার মতো প্রবৃত্তি না হলেও জীবনের ক্ষণস্থায়ী মুহূর্তগুলো, টুকরো টুকরো ঘটনাগুলো স্মৃতি হয়ে দেখা দেয় মনে। সেখানে আনন্দ আছে, বিষাদ আছে। ব্যর্থতা আছে, সফলতা আছে। হাসি আছে, অশ্রুও আছে।’ গল্পগ্রন্থ ‘সূর্যগ্রহণ’ থেকে ‘একুশের গল্প’ পর্যন্ত তার কলম পাশাপাশি হাঁটিয়েছে প্রতিবাদ ও প্রেমকে।
চলচ্চিত্রের প্রতি ছোটবেলা থেকেই তার বিশেষ আকর্ষণ ছিল। ১৯৫৭ সালে ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের চিত্রনাট্যে পরিচালক আখতার জং কারদার এর ‘জাগো হুয়া সাবেরা’ চলচ্চিত্রে সহকারী পরিচালক হিসেবে চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ। ‘এ দেশ তোমার আমার’ চলচ্চিত্রে কাজের সময় পরিচয় চিত্রনায়িকা সুমিতা দেবীর সঙ্গে। ১৯৬১ সালে ‘কখনো আসেনি’ দিয়ে পরিচালনায় অভিষেক। এরপর ‘সোনার কাজল’ (১৯৬২), ‘কাঁচের দেয়াল’ (১৯৬৩)— যার জন্য ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান সরকারের নিগার পুরস্কার পান। ১৯৬৪ সালে নির্মাণ করলেন ‘সংগম’— পাকিস্তানে প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র। ১৯৬৫ সালে ‘বাহানা’— প্রথম সিনেমাস্কোপ ছবি। তারপর ‘বেহুলা’ (১৯৬৬), ‘আনোয়ারা’ (১৯৬৭) এবং ১৯৭০ সালে ‘জীবন থেকে নেয়া’— ভাষা আন্দোলনের চেতনায় ভাস্বর এক অমর সৃষ্টি। মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা, সংগ্রাম ও জয়গানকে এত মর্মস্পর্শী, এত গভীরভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য ‘জীবন থেকে নেয়া’ এক অনন্য উদাহরণ। সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেনের মতো দিকপালেরাও মুগ্ধ হয়েছিলেন। এই চলচ্চিত্রে স্বৈরাচারী স্ত্রী ও নির্যাতিত স্বামী-গৃহের মাঝ দিয়ে প্রতীকীভাবে রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিজমকে তুলে ধরেছিলেন। এর সংলাপগুলো আজও বুক কাঁপায়: ‘আমার সোনার দেশের, সোনার মাটিকে কলঙ্কিত হতে দিতে চাই না বলেই তো দেশ দেশ করি, মাটির কথা বলি।’ এবং ‘কী দিয়েছি আর কী পেয়েছি তার হিসাব করতে গেলে তো আর দেশকে ভালোবাসা যাবে না। দেশকে ভালোবাসতে হয় নিঃস্বার্থভাবে।’ বাংলাদেশের প্রথম ইংরেজি ভাষার চলচ্চিত্র ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ প্রযোজনাও তারই কৃতিত্ব; ‘আর কত দিন’ উপন্যাসের ইংরেজি ভাষান্তরিত এই ছবিটি সমাপ্ত হওয়ার আগেই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে কলকাতায় গিয়ে বিশ্বজনমত গঠনে আত্মনিয়োগ করলেন জহির রায়হান। নির্মাণ করলেন ‘স্টপ জেনোসাইড’— যে ডকুমেন্টারি পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার চিত্র বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিল। এছাড়াও নির্মাণ করেন ‘আ স্টেট ইজ বর্ন’ প্রামাণ্যচিত্র। তার তত্ত্বাবধানে বাবুল চৌধুরীর ‘ইনোসেন্ট মিলিয়ন’ এবং আলমগীর কবীরের ‘লিবারেশন ফাইটারস’ প্রামাণ্যচিত্র দুটি নির্মিত হয়। নিজের আয়ের টাকা দিলেন মুক্তিযুদ্ধের তহবিলে।
যুদ্ধ শেষে ফিরে এলেন স্বাধীন বাংলাদেশে। কিন্তু ফেরা হলো না তার বড় ভাই, কথাসাহিত্যিক শহীদুল্লাহ কায়সারের। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে রাজাকার-আলবদর বাহিনী তাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। ভাইকে খুঁজতে খুঁজতে ১৯৭২ সালের ২৮ জানুয়ারি একটি ফোনকল পেলেন। মিরপুর ১২ নম্বরে গেলেন, আর ফিরলেন না। মৃতদেহ কখনো পাওয়া যায়নি, কোনো তদন্ত হয়নি। ৩০ জানুয়ারিকে ধরে নেয়া হলো তার নিখোঁজ হওয়ার দিন।
ব্যক্তিজীবনে দুইবার বিয়ে করেছিলেন তিনি। ১৯৬১ সালে চিত্রনায়িকা সুমিতা দেবীকে, তাদের দুই পুত্র অনল রায়হান ও বিপুল রায়হান। ১৯৬৮ সালে বিবাহবিচ্ছেদের পর জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা সুচন্দাকে বিয়ে করেন, তাদের দুই পুত্র অপু রায়হান ও তপু রায়হান। বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সার, যার কন্যা জনপ্রিয় অভিনেত্রী শমী কায়সার। পারিবারিক বিচ্ছেদ ও দূরত্বের বেদনা সত্ত্বেও স্ত্রী-সন্তানের প্রতি তার মমতা ও দায়িত্ববোধ তার লেখা ও চলচ্চিত্রে বারবার ফুটে উঠেছে।
পুরস্কার এসেছে অনেক: ‘হাজার বছর ধরে’র জন্য আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৪), ‘কাঁচের দেয়াল’-এর জন্য নিগার পুরস্কার (১৯৬৫), বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭২, মরণোত্তর), ১৯৭৫ সালে প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আয়োজনে মরণোত্তর বিশেষ সম্মান, একুশে পদক (১৯৭৭, মরণোত্তর), স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (১৯৯২, মরণোত্তর), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (২০০৫, মরণোত্তর)। মরণোত্তর সম্মানগুলো যেন তার অকাল প্রয়াণের ক্ষতকে আরও গভীর করে। রচনাবলিতে রয়েছে উপন্যাস, গল্পগ্রন্থ, প্রবন্ধ— যেমন ‘পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ’, ‘অক্টোবর বিপ্লব ও সোভিয়েত চলচ্চিত্র’; পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন ‘এক্সপ্রেস’ (ইংরেজি সাপ্তাহিক) ও ‘প্রবাহ’ (বাংলা মাসিক)। মাত্র ৩৭ বছরের জীবনে জহির রায়হান যা দিয়ে গেছেন, তা নিয়ে যেকোনো জাতিই তার জন্য গর্ব করতে পারতো! তিনি ছিলেন একাধারে ঔপন্যাসিক, সাংবাদিক, চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার। বাংলা সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তার নাম অম্লান।
কিন্তু তার নিখোঁজ হওয়ার রহস্য অমীমাংসিত ছিল বহুদিন। ১৯৯৯ সালে দৈনিক ভোরের কাগজ পত্রিকায় জহির রায়হানকে মিরপুরের ১২ নম্বর সেকশনের এই স্থানে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছেন, এমন একজন প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দি দিয়ে সাংবাদিক জুলফিকার আলী মানিকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। যে কুয়াশায় তিনি হারিয়ে গেলেন, সেই কুয়াশা আজও কাটেনি। এই তীব্র মানবতাবাদী, অন্যায়-অনাচারের বিরুদ্ধে শিল্পকে হাতিয়ার করে তোলা জহির রায়হানের উত্তরসূরি কি হতে পারল এই বাংলাদেশের শিল্প সাহিত্যিক নির্মাতারা? কে দেবে উত্তর? হাজার বছর ধরে’র প্রতিটি চরিত্রে, ‘জীবন থেকে নেয়া’র প্রতিটি ফ্রেমে, বায়ান্নর ফেব্রুয়ারির প্রতিটি শব্দে, জহির রায়হান চিরন্তন।












