দুপুরের খাবারের পর অফিসে ঝিমুনি কাটানোর ৭ উপায়

খাওয়ার পর ঘুম ঘুম ভাব তৈরি হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। ছবি: এআই
বাঙ্গালির ভাতঘুম বিশ্ববিখ্যাত। আর এই ভাতঘুম যদি হয় অফিসে দুপুরের খাবার শেষ করে, তাহলে তো মুশকিল! তখন কম্পিউটারের পর্দায় চোখ থাকলেও মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। এদিকে জরুরি কাজের চাপ থাকলেও শরীর যেন একটু বিশ্রাম চাইছে। অফিসে কর্মব্যস্ত দিনের এমন অভিজ্ঞতার সঙ্গে আমরা অনেকেরই পরিচিত। তবে কিছু অভ্যাসে পরিবর্তন এনে দুপুরের এই ঝিমুনি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
কেন দুপুরে খাবার খাওয়ার পর ঘুম পায়?
ঝিমুনি কাটানোর আগে জানা দরকার এই ঘুম ঘুম ভাব তৈরি হওয়ার পেছনে কারণটা কী? মানুষের শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ছন্দ অনুযায়ী দুপুরের দিকে সতর্কতা ও কর্মক্ষমতা কিছুটা কমে আসতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় রাতের অপর্যাপ্ত ঘুম, ভারী খাবার খাওয়া কিংবা দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে কাজ করার মতো বিষয়। অনেকেই আবার মনে করেন, ভাত খেলেই ঘুম পায়। তবে বিষয়টি পুরোপুরি সঠিক নয়। রাতের ঘুম ঠিক না হলে দুপুরের স্বাভাবিক ক্লান্তিও বেশি তীব্র মনে হতে পারে। তবে ভাতে থাকা শর্করা শরীরের শক্তির অন্যতম উৎস। কিন্তু অতিরিক্ত পরিমাণে খাবার খাওয়া, খাবারে শর্করার আধিক্য এবং প্রোটিন ও আঁশের ভারসাম্য না থাকার না কারণেও খাওয়ার পর ঝিমুনি অনুভূত হতে পারে।
পরিমিত ভাত খান, খাবারে রাখুন ভারসাম্য
দুপুরে ভাত খাওয়ার অভ্যাস পরিবর্তন করতেই হবে, এমন নয়। বরং খাবারের পরিমাণ ও উপাদানের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। একবারে অনেকটা ভাত খেলে পেট ভার হয়ে যেতে পারে এবং কাজে ফেরার পর অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। তাই নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিমিত ভাত খাওয়ার চেষ্টা করা উচিত। খাবারের পাতে ভাতের পাশাপাশি মাছ, মুরগি, ডাল, শাকসবজি কিংবা উপযুক্ত অন্য কোনো প্রোটিনের উৎস রাখা যেতে পারে। শাকসবজিতে থাকা আঁশ এবং প্রোটিন পেট ভরা রাখতে সহায়তা করে। সুষম খাবার খেলে রক্তে শর্করার ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে রাখতেও সুবিধা হতে পারে। মিষ্টি পানীয় ও অতিরিক্ত মিষ্টিজাতীয় খাবার নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস এড়িয়ে চলা ভালো।
খাওয়ার পর কিছুক্ষণ হাঁটুন
দুপুরের খাবার খেয়েই দীর্ঘ সময় চেয়ারে বসে থাকলে শরীর আরও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়তে পারে। তাই খাবারের পর ১০ থেকে ১৫ মিনিট হালকা হাঁটাহাঁটি করা যেতে পারে। অফিসের করিডর, সিঁড়ির কাছের জায়গা কিংবা ভবনের আশপাশে স্বাভাবিক গতিতে হাঁটলেও উপকার পাওয়া সম্ভব। হালকা হাঁটাচলা শরীরকে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে। খাবারের পর কিছুটা হাঁটা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক হতে পারে। তবে খাওয়ার পরপরই ভারী ব্যায়াম করার প্রয়োজন নেই। স্বাভাবিক গতিতে হাঁটলেই যথেষ্ট।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন
শরীরে পানির ঘাটতি হলে ক্লান্তি, মাথা ভার লাগা কিংবা মনোযোগের সমস্যা দেখা দিতে পারে। অফিসে ব্যস্ততার কারণে অনেকে দীর্ঘ সময় পানি পান করার কথা ভুলে যান। ফলে দুপুরের দিকে ক্লান্তি আরও বাড়তে পারে।কাজের টেবিলে পানির বোতল রাখা যেতে পারে। তৃষ্ণা অনুভব করলে পানি পান করার পাশাপাশি সারা দিন নিয়মিত পানি খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার। তবে অতিরিক্ত পানি পান করলেই যে ঘুম চলে যাবে, এমন নয়। শরীরের পানির চাহিদা পূরণ করাই মূল লক্ষ্য।
একটানা বসে কাজ করবেন না
কম্পিউটারের সামনে দীর্ঘ সময় বসে কাজ করলে শরীরের সক্রিয়তা কমে যায়। দুপুরের খাবারের পর এই নিষ্ক্রিয়তা ঝিমুনি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই কাজের ফাঁকে সুযোগ বুঝে উঠে দাঁড়ানো, অল্প হাঁটাহাঁটি করা কিংবা শরীর প্রসারিত করার অভ্যাস করা যেতে পারে। প্রতি ৩০ থেকে ৬০ মিনিট পরপর অল্প সময়ের জন্য বিরতি নেওয়া সহায়ক হতে পারে। ফোনে কথা বলার সময় দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা সহকর্মীর সঙ্গে সামনাসামনি কথা বলতে তাঁর ডেস্ক পর্যন্ত হেঁটে যাওয়ার মতো ছোট অভ্যাসও কাজে লাগতে পারে। এতে শরীর কিছুটা সক্রিয় থাকে এবং একটানা বসে থাকার ক্লান্তি কমে।
চা-কফি পান করুন বুঝেশুনে
দুপুরে ঘুম ঘুম ভাব কাটাতে অনেকেই চা কিংবা কফির ওপর নির্ভর করেন। এতে থাকা ক্যাফেইন সাময়িকভাবে সতর্কতা ও মনোযোগ বাড়াতে পারে। তবে অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ করলে অস্থিরতা, বুক ধড়ফড় কিংবা রাতে ঘুমের সমস্যা হতে পারে। এর প্রভাব পরদিনের ক্লান্তিও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই প্রয়োজন হলে দুপুরের দিকে পরিমিত চা বা কফি পান করা যেতে পারে। তবে বিকেলের শেষ ভাগ কিংবা সন্ধ্যার পর ক্যাফেইন গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা ভালো, বিশেষ করে যাঁদের ঘুমের সমস্যা রয়েছে। চা-কফিকে রাতের পর্যাপ্ত ঘুমের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
রাতে পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন
দুপুরের ঝিমুনির অন্যতম সাধারণ কারণ হলো রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া। দেরিতে ঘুমাতে যাওয়া, অনিয়মিত ঘুমের সময়, ঘুমানোর আগে দীর্ঘক্ষণ মুঠোফোন ব্যবহার কিংবা বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়ার কারণে দিনের বেলায় ক্লান্তি তৈরি হতে পারে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সাধারণত প্রতি রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। তাই প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার। ঘুমানোর আগে আলো কমানো, শান্ত পরিবেশ তৈরি করা এবং মুঠোফোনের ব্যবহার সীমিত রাখাও সহায়ক হতে পারে।
কাজের ধরনে আনুন সামান্য পরিবর্তন
দুপুরের খাবারের পরপরই খুব বেশি মনোযোগ প্রয়োজন এমন কাজ করতে গিয়ে সমস্যা হলে কাজের ধরন কিছুটা সাজিয়ে নেওয়া যেতে পারে। সম্ভব হলে গুরুত্বপূর্ণ কাজের একটি অংশ সকালে শেষ করে রাখা যায়। দুপুরের পর প্রথমে তুলনামূলক সহজ কাজ দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে বেশি মনোযোগের কাজ হাতে নেওয়া যেতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে দুপুরের পর গুরুত্বপূর্ণ কাজ এড়িয়ে চলতে হবে। বরং ছোট বিরতি, কাজের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর কাজ পরিবর্তনের মাধ্যমে মনোযোগ ধরে রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে।
কখন সতর্ক হওয়া প্রয়োজন
দুপুরে খাবারের পর সামান্য ঝিমুনি স্বাভাবিক হতে পারে। তবে পর্যাপ্ত ঘুমের পরও যদি নিয়মিত অতিরিক্ত ঘুম পায়, কাজের সময় চোখ খোলা রাখা কঠিন হয়ে পড়ে কিংবা দিনের বেলায় অস্বাভাবিক ক্লান্তি অনুভূত হয়, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। ঘুমের সমস্যা, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিংবা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার কারণে এমন হতে পারে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।



