চল্লিশের আগেই আর্থিক নিরাপত্তা, জেনে নিন পাঁচ জরুরি পরামর্শ

সংগৃহীত ছবি
আমাদের সমাজে ৪০ বছর বয়সকে জীবনের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে ধরা হয়। একটা সময় ছিল যখন ধারণা করা হতো, ৪০ বছর বয়সের মধ্যেই একজন মানুষের নিজস্ব একটা ঘর বা বাড়ি থাকবে। ব্যাংকে জমানো টাকা থাকবে এবং ক্যারিয়ারে তিনি একদম গুছিয়ে বসবেন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই ধারণায় এসেছে বড় পরিবর্তন!
বর্তমান যুগে ক্রমাগত জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি, ঘন ঘন চাকরি বদল, ফ্ল্যাট বা বাড়ির চড়া দাম এবং অনিশ্চিত চাকরির বাজারের কারণে ঐতিহ্যগত সেই হিসাব-নিকাশ আর খাটছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন আসল আর্থিক সাফল্য মানে কেবল একটি ব্যাংক ব্যালেন্সের অঙ্ক নয়, বরং যেকোনো বিপদে টিকে থাকার মতো একটি শক্ত ‘আর্থিক ভিত’ তৈরি করা।
বিশেষ করে ৪০-এর কোঠায় পৌঁছানোর আগের সময়টাই হলো দীর্ঘমেয়াদী সম্পদ গড়ে তোলার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। ফাইন্যান্সিয়াল বিশেষজ্ঞদের মতে, ৪০ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই প্রতিটি পেশাজীবীর অন্তত ৫টি আর্থিক লক্ষ্য অর্জন করা অত্যন্ত জরুরি।
১. ৬ থেকে ১২ মাসের ‘জরুরি তহবিল’ নিশ্চিত করুন
জীবনে কখন কী বিপদ আসবে—কেউ বলতে পারে না! হঠাৎ চাকরি চলে যাওয়া, শারীরিক অসুস্থতা বা ব্যবসায় মন্দা দেখা দিলে যেন অন্তত জীবনযাত্রার মান নেমে না যায়, সেজন্য অন্তত ৬ থেকে ১২ মাসের খরচের টাকা আলাদা জমা রাখা উচিত। ধরুন, আপনার পরিবারে প্রতি মাসে যদি ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়, তবে আপনার জরুরি তহবিলে অন্তত ৩ থেকে ৬ লাখ টাকা থাকা উচিত। এই টাকা এমন কোনো জায়গায় রাখতে হবে যাতে বিপদের দিনে সাথে সাথে ব্যবহার করা যায়। এক্ষেত্রে সহজে তোলা যায় এমন ডিপিএস বা লিকুইড ফান্ড হতে পারে ভালো বিকল্প।
২. সঠিক সময়ের অপেক্ষা না করে আজই বিনিয়োগ শুরু করুন
শেয়ারবাজার বা ফান্ডে বিনিয়োগ করার জন্য অনেকেই সঠিক সময় বা উপযুক্ত সুযোগের অপেক্ষা করেন, যা অত্যন্ত ভুল একটি ধারণা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক সময়ের অপেক্ষায় বসে না থেকে এখনই নিয়মিত ছোট ছোট অ
৩. বীমা বা ইন্স্যুরেন্সকে ‘অহেতুক খরচ’ ভাববেন না
আমরা অনেকেই দামী মোবাইল বা গাড়ির ইন্স্যুরেন্স করি, কিন্তু নিজের জীবনের বা স্বাস্থ্যের কোনো বীমা করি না! ৪০ বছরের আগে নিজের ও পরিবারের জন্য একটি উপযুক্ত হেলথ ইন্স্যুরেন্স এবং টার্ম লাইফ ইন্স্যুরেন্স নিশ্চিত করা জরুরি। হুট করে বড় কোনো রোগ বা হাসপাতালের বিল যেন আপনার জীবনের সারা জীবনের কষ্টার্জিত সঞ্চয়কে শূন্য না করে ফেলে, তার জন্য বীমা একটি বর্ম হিসেবে কাজ করে। এছাড়া বর্তমান বাজারে চাকরি হারানোর ঝুঁকি সামলাতে ‘ইনকাম প্রটেকশন’ ইন্স্যুরেন্সও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
৪. উচ্চ সুদের ঋণ বা ক্রেডিট কার্ডের দেনা দ্রুত পরিশোধ করুন
উচ্চ বেতনের সাথে সাথে মানুষ প্রায়ই বিলাসবহুল জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, যা থেকে জন্ম নেয় ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া বা পার্সোনাল লোন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত সুদের ঋণগুলো হলো আপনার আর্থিক উন্নতির মূল শত্রু। কোনো বড় ধরনের বিনিয়োগ বা বিলাসিতায় অর্থ খরচের আগে ক্রেডিট কার্ড বা পার্সোনাল লোনের মতো চড়া সুদের দেনা শূন্যে নামিয়ে আনুন।
৫. শুধু বেতনের ওপর নির্ভর না করে আয়ের একাধিক পথ তৈরি করুন
শুধু মাস শেষে একফালি বেতনের ওপর ভরসা করে বসে থাকা এখন আর বুদ্ধিমত্তার পরিচয় নয়। স্থায়ী সম্পদ তৈরি করতে হলে চাকরির পাশাপাশি অন্যান্য উৎস তৈরি করতে হবে, যেমন শেয়ারবাজার থেকে লভ্যাংশ, মিউচুয়াল ফান্ড, ফিক্সড ডিপোজিট বা কোনো সম্পত্তি থেকে আসা বাড়তি ভাড়া।
তবে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হলো, নিজের দক্ষতার ওপর বিনিয়োগ করা। বর্তমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স ও নতুন নতুন প্রযুক্তির এই যুগে নিজেকে আপডেট রাখা অত্যন্ত জরুরি। নতুন দক্ষতা শিখলে তা আপনার কাজের যোগ্যতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে, যা দিনশেষে আপনার আয় বাড়াতে সরাসরি ভূমিকা রাখবে।
৪০ বছর বয়সে পৌঁছানোর পর আপনি কত টাকা বেতন পাচ্ছেন, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনার আর্থিক প্রস্তুতি কতটা মজবুত। একটি সুশৃঙ্খল বিনিয়োগ পোর্টফোলিও, পর্যাপ্ত ইন্স্যুরেন্স, ঋণমুক্ত জীবন এবং সঠিক পরিকল্পনা আপনাকে দিতে পারে দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক স্বাধীনতা ও আত্মবিশ্বাস।





