রাতের শিফটে কাজের অদৃশ্য ক্ষতি থেকে মুক্তি মিলবে যে অভ্যাসে

তাইপের একটি পার্কের বেঞ্চে একজন ঘুমিয়ে আছেন এক ব্যক্তি। ছবি: রয়টার্স
রাতের শিফটে কাজ করা শুধু বদলে দেয় না ঘুমের সময়। এর প্রভাব পড়ে শরীর ও মস্তিষ্কের ওপরও। গবেষণা বলছে, দীর্ঘদিন রাত জেগে কাজ করলে বাড়তে পারে হৃদ্রোগ, ডিমেনশিয়া ও ক্যানসারের ঝুঁকি। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, ঘুমের ধরনে কিছু পরিবর্তন আনলে এই ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব।
রাত চারটা। হাসপাতালের ওয়ার্ড তখন প্রায় নিস্তব্ধ। টানা ৯ ঘণ্টা কাজের পর এক জুনিয়র চিকিৎসকের শরীর ক্লান্ত, পেশিতে ব্যথা ও জ্বলছে চোখ। সকাল ৬টায় শিফট শেষ করে বাড়ি ফিরলেও ঘুম আসে না তার। কারণ, শরীরের জৈবঘড়ি তখনো বলছে, এখন জেগে থাকার সময়।
শুধু এই চিকিৎসক নন, বিশ্বের লাখো রাতের শিফটকর্মীর প্রতিদিনের বাস্তবতা এটি। নার্স, প্যারামেডিক, প্রকৌশলী, ট্রাকচালক, কারখানার শ্রমিকসহ অসংখ্য মানুষ কাজ করেন রাত জেগে।
নতুন গবেষণা বলছে, এই জীবনযাত্রা শুধু ক্লান্তিই নয়, হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, ক্যানসার, মানসিক সমস্যা এমনকি বাড়াতে পারে স্মৃতিভ্রমের ঝুঁকিও। তবে বিজ্ঞানীরা এখন এমন কিছু ঘুমের পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করছেন, যা এসব ক্ষতি কিছুটা হলেও কমাতে সাহায্য করতে পারে।
ঘুম শুধু বিশ্রাম নয়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু শরীরকে বিশ্রাম দেয় না ঘুম। ঘুমের সময় মস্তিষ্ক দিনের স্মৃতি সংরক্ষণ করে, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে, জটিল সমস্যার সমাধান খুঁজে এবং শক্তিশালী করে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা। একই সঙ্গে মেরামত হয় ক্ষতিগ্রস্ত পেশিরও।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘুমবিজ্ঞানী অধ্যাপক রাসেল ফস্টারের ভাষায়, ‘খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামের মতো ঘুমও সুস্থ জীবনের একটি মৌলিক ভিত্তি।’
ঘুমের সময় নিজেকে পরিষ্কার করে মস্তিষ্ক
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের সময় সক্রিয় হয় মস্তিষ্কের ‘গ্লিম্ফ্যাটিক সিস্টেম’ নামের একটি বিশেষ ব্যবস্থা। এটি মস্তিষ্কে জমে থাকা বর্জ্য ও পরিষ্কার করে ক্ষতিকর প্রোটিন।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হিউ মার্কাস ও তার সহকর্মীরা বিশ্লেষণ করেন যুক্তরাজ্যের বায়োব্যাংকের ৪০ হাজারের বেশি সুস্থ মানুষের মস্তিষ্কের স্ক্যান। তাদের গবেষণায় দেখা যায়, যাদের এই পরিষ্কার করার ব্যবস্থা দুর্বল ছিল। পরবর্তী সময়ে তাদের ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি ছিল।
তবে মার্কাস সতর্ক করে বলেছেন, এটি এখনো একটি সম্ভাব্য সম্পর্ক মাত্র। ডিমেনশিয়ার পেছনে উচ্চ রক্তচাপ, ধূমপান ও ডায়াবেটিসের মতো আরও অনেক কারণ কাজ করে।
ঘুম কমলে বাড়ে নানা রোগের ঝুঁকি
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, টানা কয়েক রাত মাত্র সাড়ে চার ঘণ্টা ঘুমালে শরীরে প্রদাহ বাড়ে, যা হৃদ্রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করতে পারে।
অপর্যাপ্ত ঘুমের কারণে বেড়ে যায় কর্টিসল নামে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রাও। এতে ইনসুলিন প্রতিরোধ তৈরি হয় এবং ঝুঁকি বাড়ে ডায়াবেটিসের। রাত জেগে কাজের সময় অতিরিক্ত মিষ্টিজাতীয় খাবার খাওয়ার প্রবণতাও আরও খারাপ করে পরিস্থিতিকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা (আইএআরসি) রাতের শিফটে কাজকে ‘সম্ভবত মানুষের জন্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে।
গবেষকদের ধারণা, শরীরের জৈবঘড়ি বিঘ্নিত হওয়ায় কমে যায় মেলাটোনিন হরমোনের উৎপাদন। এই হরমোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ক্যানসার প্রতিরোধে।
সমাধান হতে পারে দুই ধাপে ঘুম
বিজ্ঞানীরা এখন গবেষণা করছেন ‘বাইফেজিক স্লিপ’ বা দুই ধাপে ঘুমানোর পদ্ধতি নিয়ে।
নরওয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অকুপেশনাল হেলথের গবেষক ড. লাইন ভিক্টোরিয়া মোয়েন উত্তর নরওয়ের পর্যবেক্ষণ করেন রাতের শিফটকর্মীদের ঘুম। তিনি দেখেন, অনেকেই বাড়ি ফিরে একটানা ঘুমাতে পারেন না। তারা সকালে কয়েক ঘণ্টা ঘুমান, পরে বিকালে আবার কিছু সময় ঘুমিয়ে নেন।
মোয়েনের মতে, এটি শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। জৈবঘড়ি তাদের দীর্ঘ সময় দিনের বেলা ঘুমাতে দেয় না।
অতীতেও মানুষ দুই ধাপে ঘুমাত
ভার্জিনিয়া টেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ রজার একির্চ প্রায় ৪০ বছর ধরে প্রাক-শিল্প যুগের নথি বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, তখন মানুষ সাধারণত রাতের প্রথম ভাগে ঘুমাত, মাঝরাতে কিছু সময় জেগে থাকত, এরপর আবার দ্বিতীয় দফায় ঘুমিয়ে পড়ত।
অক্সফোর্ডের অধ্যাপক রাসেল ফস্টারও বলেছেন, ‘মানুষের স্বাভাবিক ঘুমের ধরন সম্ভবত একটানা দীর্ঘ ঘুম নয়।’
বিকালের ছোট্ট ঘুমও উপকারী হতে পারে
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, রাতের শিফটের সময় বা পরে ২০ থেকে ৫০ মিনিটের একটি ছোট্ট ঘুম ক্লান্তি কমায়, মনোযোগ বাড়ায় এবং বাড়ি ফেরার পথে তন্দ্রাজনিত দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
মোয়েন এখন বিশ্লেষণ করছেন ১১ হাজারের বেশি বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র। তার লক্ষ্য, রাতের শিফটকর্মীদের জন্য এমন বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা তৈরি করা, যাতে তারা নিজেদের শরীরের স্বাভাবিক ছন্দের সঙ্গে মিল রেখে গড়ে তুলতে পারেন ভালো ঘুমের অভ্যাস।
তার ভাষায়, ‘অনেক শিফটকর্মী রাতের কাজের পর দীর্ঘ সময় ঘুমাতে না পেরে দুশ্চিন্তায় ভোগেন। গবেষণা যদি দেখায় বিকালের একটি ভালো ঘুম তাদের উপকার করে, তাহলে সেটিই হবে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পরামর্শ।’
সূত্র: বিবিসি








