ভর্তি থেকে বসবাস—বিদেশে উচ্চশিক্ষার আগে সতর্কতা

সংগৃহীত ছবি
বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন এখন অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর কাছে ভবিষ্যৎ গড়ার অন্যতম পথ। উন্নত শিক্ষা, গবেষণার সুযোগ, আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ এবং স্থায়ীভাবে ক্যারিয়ার গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষায় প্রতিবছর হাজারো শিক্ষার্থী যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, জাপানসহ বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমান। তবে এই যাত্রা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নতুন দেশে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থীকে একসঙ্গে সামলাতে হয় আবাসন, অর্থসংকট, ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা, মানসিক চাপ এবং ভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থার মতো নানা বাস্তব চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব সংকট সম্পর্কে আগে থেকেই ধারণা থাকলে এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিলে অনেক সমস্যাই এড়ানো সম্ভব।
ভিসা পেলেই শেষ নয়
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত হওয়ার পরও অনিশ্চয়তা শেষ হয় না। অনেক সময় ভিসা প্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়া, অতিরিক্ত কাগজপত্রের চাহিদা কিংবা নীতিগত পরিবর্তনের কারণে শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত সময়ে ক্লাসে যোগ দিতে পারেন না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসা নীতিতে পরিবর্তন আসায় এ ধরনের অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। শিক্ষা–বিষয়ক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশে পড়তে যাওয়ার পরিকল্পনায় বিকল্প পরিকল্পনা (প্ল্যান-বি) রাখাও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা আবাসন
বিদেশে গিয়ে প্রথম যে সমস্যার মুখোমুখি হন অধিকাংশ শিক্ষার্থী, সেটি হলো থাকার জায়গা। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের আসন সীমিত থাকায় অনেককে বেসরকারি বাসা বা শেয়ার করা অ্যাপার্টমেন্টে থাকতে হয়। ফলে বাড়তি ভাড়া, অগ্রিম জামানত এবং প্রতারণার ঝুঁকিও তৈরি হয়।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) সম্প্রতি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ওপর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, অধিকাংশ দেশেই আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা বাসা খুঁজতে গিয়ে আবাসন সংকট, অতিরিক্ত ব্যয় এবং অনলাইন প্রতারণার ঝুঁকিতে থাকেন।
পড়াশোনার পাশাপাশি বাড়তি আর্থিক চাপ
শুধু টিউশন ফি নয়, বিদেশে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। বাসাভাড়া, স্বাস্থ্যবিমা, পরিবহন, খাবার, বই এবং অন্যান্য দৈনন্দিন খরচ মিলিয়ে মাসিক ব্যয় দ্রুত বেড়ে যায়। ফলে অনেক শিক্ষার্থী পার্ট-টাইম কাজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
তবে অধিকাংশ দেশেই শিক্ষার্থী ভিসায় কাজের সময়সীমা নির্ধারিত থাকে। ফলে প্রয়োজনীয় আয় করা সব সময় সম্ভব হয় না। ওইসিডি–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে আর্থিক চাপে থাকেন এবং অনেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করতে বাধ্য হন।
নতুন শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো
বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার চেয়ে গবেষণা, বিশ্লেষণ, দলগত কাজ, উপস্থাপনা এবং সমালোচনামূলক চিন্তার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে নতুন শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিতে অনেক শিক্ষার্থীর সময় লাগে।
একই সঙ্গে ইংরেজি বা অন্য ভাষায় প্রতিদিন যোগাযোগ, ক্লাসে অংশগ্রহণ এবং একাডেমিক লেখালেখিও নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে। বিদেশে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন বিশ্লেষণেও এই বিষয়গুলোকে অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
একাকিত্ব ও মানসিক চাপ
পরিবার-পরিজন থেকে দূরে থাকা, নতুন সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, বন্ধুবান্ধবের অভাব এবং পড়াশোনার চাপ—সব মিলিয়ে অনেক শিক্ষার্থী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। বিশেষ করে প্রথম কয়েক মাসে ‘হোমসিকনেস’ বা ঘরছাড়া অনুভূতি অনেকের জন্য বড় সমস্যা হয়ে ওঠে।
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতায় ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, আর্থিক চাপ, আবাসন সমস্যা, ভিসা–সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা এবং সাংস্কৃতিক অভিযোজন বড় প্রভাব ফেলে।
প্রতারণার ঝুঁকিও কম নয়
বিদেশে যাওয়ার আগে কিংবা সেখানে পৌঁছানোর পর অনেক শিক্ষার্থী ভুয়া বাসাভাড়া, জাল চাকরির বিজ্ঞাপন, ভুয়া ব্যাংক বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ে প্রতারণার শিকার হন। অপরিচিত পরিবেশ ও স্থানীয় নিয়মকানুন সম্পর্কে অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে প্রতারক চক্র শিক্ষার্থীদের লক্ষ্যবস্তু বানায়।
ওইসিডি–এর প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আবাসন–সংক্রান্ত প্রতারণা এবং অনলাইন জালিয়াতির ঝুঁকির বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রস্তুতিই হতে পারে সবচেয়ে বড় সমাধান
শিক্ষাবিদদের মতে, বিদেশে যাওয়ার আগে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়। গন্তব্য দেশের জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যবিমা, শিক্ষার্থী ভিসার নিয়ম, পার্ট-টাইম কাজের সুযোগ, স্থানীয় আইন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তা সেবাগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানা জরুরি।
এ ছাড়া পর্যাপ্ত আর্থিক পরিকল্পনা, প্রয়োজনীয় সঞ্চয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সেবা (ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট সাপোর্ট), কাউন্সেলিং সুবিধা এবং বাংলাদেশি শিক্ষার্থী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ নতুন পরিবেশে দ্রুত মানিয়ে নিতে সহায়তা করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিঃসন্দেহে বড় সুযোগের দ্বার খুলে দেয়। তবে সেই সুযোগকে সফল করতে হলে স্বপ্নের পাশাপাশি বাস্তবতার জন্যও সমানভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে।




