১৯৪ বছরের কচ্ছপের জিনে লুকিয়ে দীর্ঘায়ুর রহস্য

সেশেলসের বিশালাকৃতির কচ্ছপ জোনাথন। ছবি: এএফপি
প্রায় দুই শতাব্দী ধরে বেঁচে আছে জোনাথন। বয়স এখন আনুমানিক ১৯৪ বছর। মানুষের কয়েক প্রজন্ম পেরিয়ে গেলেও দিব্যি টিকে আছে এই বিশালাকার কচ্ছপ। এবার তার শরীরের জিন বিশ্লেষণ করে দীর্ঘায়ুর রহস্যের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের আশা, জোনাথনের শরীরের এই জিনগত কৌশল একদিন মানুষের বার্ধক্য ধীর করা, এমনকি বয়সজনিত রোগের চিকিৎসায়ও নতুন পথ দেখাতে পারে।
জোনাথন আলডাবরা প্রজাতির বিশালাকার কচ্ছপ। ভারত মহাসাগরের সেশেলস দ্বীপপুঞ্জে এ প্রজাতির বাস। জীবনের বেশির ভাগ সময় সে কাটিয়েছে দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের প্রত্যন্ত দ্বীপ সেন্ট হেলেনায়। দ্বীপটি যুক্তরাজ্যের অধীন একটি ভূখণ্ড।
বিশালাকার কচ্ছপ পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘজীবী স্থলচর প্রাণীদের অন্যতম। এদের কেউ কেউ এক শতাব্দীরও বেশি সময় বেঁচে থাকে। তবে জোনাথন এদের মধ্যেও ব্যতিক্রম। প্রায় ২০০ বছর বয়সের কাছাকাছি পৌঁছেছে সে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, এসব কচ্ছপের দীর্ঘায়ুর একটি কারণ হতে পারে তাদের ধীর বিপাকক্রিয়া। গত বুধবার বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় এ বিষয়ে নতুন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের গবেষক ও গবেষণাটির সহলেখক জাস্টিন গারলাখ বলেন, ‘ধারণা করা হয়, আমাদের তুলনায় এদের বিপাকক্রিয়া অনেক ধীর। ফলে কোষের ভেতরে চলা প্রক্রিয়াগুলোও ধীরে ঘটে। রাসায়নিক বিক্রিয়া কম হয়। তাই কোষ ও ডিএনএর ক্ষতিও তুলনামূলক কম হতে পারে।’
এই ধারণা যাচাই করতে গবেষকেরা জোনাথনের সম্পূর্ণ জিনগত উপাদান বিশ্লেষণ করেন। পাশাপাশি তারা পরীক্ষা করেন তার এপিজিনোম, অর্থাৎ জিনের কার্যক্রম চালু বা বন্ধ রাখার নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। এতে এমন ২৮৭টি জিনগত রূপের সন্ধান পাওয়া গেছে, যেগুলো সময়ের সঙ্গে শরীরের কোষে তৈরি হওয়া ক্ষতি থেকে প্রাণীটিকে সুরক্ষা দিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
গারলাখ বলেন, ‘তার এমন কিছু জিন রয়েছে, যেগুলো ডিএনএ মেরামত করতে এবং প্রদাহ কমাতে বিশেষভাবে কার্যকর।’ বয়স বাড়ার প্রক্রিয়া ধীর করার ক্ষেত্রে এ দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান তিনি।
গবেষণায় আরও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, অতিবৃদ্ধ বয়সেও জোনাথনের শরীরে প্রয়োজনীয় জিনগুলো সঠিক মাত্রায় সক্রিয় থাকে। গারলাখের মতে, মানুষসহ অধিকাংশ প্রাণীর ক্ষেত্রে বয়স বাড়ার অনেক আগেই এই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা দুর্বল হতে শুরু করে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের কোষ ভুলভাবে কাজ করতে শুরু করে। এর ফলে ক্যানসারের মতো রোগ হতে পারে। কিন্তু জোনাথনের শরীরে এখনো অনেক কম বয়সী প্রাণীর মতো জিন নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রয়েছে। সে ব্যতিক্রমী বলেই এমন হয়েছে, নাকি বিশালাকার কচ্ছপের ক্ষেত্রে এটাই স্বাভাবিক, তা আমরা জানি না। তবে মানুষের সঙ্গে তুলনা করলে তার বয়স অনুযায়ী শরীর অনেক বেশি কর্মক্ষম রয়েছে।’
তবে শুধু জোনাথনের জিন বিশ্লেষণ করে তার দীর্ঘায়ুর সব কারণ নিশ্চিতভাবে জানা সম্ভব নয়। যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আণবিক বার্ধক্যবিষয়ক গবেষক জোয়াও পেদ্রো দে মাগালহায়েস বলেন, তিমি, হাঙর ও ঝিনুকের কয়েকটি প্রজাতিও দীর্ঘজীবী। কিন্তু কোনো প্রাণী কেন দীর্ঘদিন বাঁচে, আবার কোনো প্রাণীর আয়ু কেন কম হয়, তার পেছনে থাকা জিনগত ও আণবিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের জ্ঞান এখনো সীমিত।
তিনি বলেন, ‘কিছু প্রজাতি অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি দিন বাঁচে কেন, তা বুঝতে পারলে বার্ধক্য ও দীর্ঘায়ু সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানে বড় অগ্রগতি হবে। এর সম্ভাব্য প্রয়োগ মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও থাকতে পারে।’
জোনাথনের সঠিক বয়স অবশ্য জানা নেই। ১৮৮২ সালে সেন্ট হেলেনায় তোলা একটি ছবিতে তাকে পূর্ণবয়স্ক অবস্থায় দেখা যায়। সেই ছবি থেকে বিজ্ঞানীরা তার বয়স আনুমানিক ১৯৪ বছর বলে হিসাব করেছেন। বিশালাকার কচ্ছপ সাধারণত প্রায় ৫০ বছর বয়সে পূর্ণ আকার পায়। সেই হিসাবে ১৪৪ বছর আগের ছবির সঙ্গে বর্তমান বয়স মিলিয়ে এ অনুমান করা হয়েছে।
এই হিসাবের ভিত্তিতে ২০২২ সালে সেন্ট হেলেনার গভর্নর জোনাথনের জন্মদিন হিসেবে ১৮৩২ সালের ৪ ডিসেম্বর নির্ধারণ করেন। ওই সময়ে আব্রাহাম লিংকন, চার্লস ডারউইন ও রানি ভিক্টোরিয়া জীবিত ছিলেন, যদিও তারা তখন বয়সে তরুণ।
তবে জোনাথনের বয়স ২০০ বছর বা তারও বেশি হতে পারে বলে মনে করেন গারলাখ। উনিশ শতকে বিশালাকার কচ্ছপকে বিরল ও কৌতূহলোদ্দীপক প্রাণী হিসেবে দেখা হতো। এ কারণেই তাকে সেন্ট হেলেনায় উপহার হিসেবে নিয়ে যাওয়া হয়ে থাকতে পারে। সে সময় কোনো ঔপনিবেশিক প্রশাসকের জন্য এমন প্রাণী উপহার দেওয়া অস্বাভাবিক ছিল না।
এভাবে দ্বীপে চলে আসায় জোনাথন হয়তো তার প্রজাতির অনেক কচ্ছপের মতো ভয়াবহ পরিণতি থেকে রক্ষা পেয়েছিল। সে সময় অনুসন্ধানী জাহাজের নাবিকেরা সেশেলস, গ্যালাপাগোস ও মরিশাস দ্বীপপুঞ্জ থেকে বিশালাকার কচ্ছপ ধরে জাহাজে তুলতেন। খাবার হিসেবে ব্যবহারের জন্য মাসের পর মাস সেগুলোকে জাহাজে রাখা হতো।
গারলাখ বলেন, ‘জাহাজের নাবিকেরা কচ্ছপ ধরে নিয়ে যেতেন। মাসের পর মাস খাবার বা পানি না দিয়েও সেগুলোকে জাহাজে রাখা যেত। তবু কচ্ছপগুলো বেঁচে থাকত এবং খাওয়ার উপযোগী থাকত। এই নিষ্ঠুর প্রথা মরিশাসের একটি কচ্ছপ প্রজাতির বিলুপ্তিতে ভূমিকা রেখেছিল।’
জোনাথনের ওজন প্রায় ১৮০ কেজি। চোখে ছানি পড়ায় দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে সে। তারপরও এখনো বেশ সক্রিয়। পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় এই কচ্ছপকে ঘিরে চলতি বছরের এপ্রিলের শুরুতে একটি মিথ্যা খবর ছড়িয়ে পড়ে। এপ্রিল ফুলের কৌতুক হিসেবে প্রচার করা ওই খবরে দাবি করা হয়েছিল, জোনাথন মারা গেছে। পরে সেন্ট হেলেনা সরকার জানায়, সে জীবিত ও সুস্থ রয়েছে।
জোনাথনের বয়স বিবেচনায় নিয়ে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে গবেষকেরা রক্ত সংগ্রহ না করে তার মুখের ভেতর থেকে নমুনা নেন। তবে লালার নমুনা ব্যবহারের কারণে আরও নির্ভুল কিছু জিনগত বিশ্লেষণপদ্ধতি প্রয়োগ করা সম্ভব হয়নি বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন।
এরপর জোনাথনের জিনগত উপাদান ও এপিজিনোমের সঙ্গে সেশেলসের আলডাবরা প্রবালপ্রাচীর এলাকায় বসবাসকারী একই প্রজাতির কম বয়সী কচ্ছপের নমুনা তুলনা করেন তারা। এতে উল্লেখযোগ্য মিল পাওয়া যায়। জোনাথনের কোষে শক্তি উৎপাদনকারী অঙ্গাণু মাইটোকন্ড্রিয়াও আশ্চর্যজনকভাবে ভালো অবস্থায় রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশভিলভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা ক্যালেল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও গবেষণাটির জ্যেষ্ঠ লেখক স্টিফেন ক্লার্ক বলেন, ‘এই বৈশিষ্ট্য তার প্রজাতির অন্য কচ্ছপদের মধ্যেও রয়েছে কি না, তা এখনো জানা যায়নি। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে আলডাবরা প্রজাতির অন্য কচ্ছপদেরও বিশ্লেষণ করার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের।’
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘজীবী প্রাণীদের ক্ষেত্রে মাইটোকন্ড্রিয়ার সুস্থতা গুরুত্বপূর্ণ বলে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে। ১১০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের মাইটোকন্ড্রিয়াও তুলনামূলক কার্যকর হতে পারে। জোনাথনের ক্ষেত্রে পাওয়া ফলাফলও এসব পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মিলে যায়।
ক্লার্কের মতে, জোনাথনের জিনগত বৈশিষ্ট্য কোষকে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখার একটি সম্ভাব্য পথ দেখাতে পারে। মাইটোকন্ড্রিয়ার কার্যকারিতা বাড়াতে পারে, এমন ওষুধ খুঁজে বের করার বিষয়ে তারা আগ্রহী। আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে এসব ওষুধ নিয়ে মানুষের ওপর চিকিৎসা পরীক্ষা শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে তাদের।
তবে শুধু একটি প্রাণীর নমুনা থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জোনাথনের দীর্ঘায়ুর কারণ নিশ্চিত করা যায় না। তুরস্কের মধ্যপ্রাচ্য কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়ের জিনগত গবেষক হানদান মেলিকে দোনেরতাশ বলেন, দীর্ঘজীবী আরও কচ্ছপ ও অন্যান্য প্রাণীর ওপর গবেষণা চালাতে হবে। তবেই দীর্ঘায়ুর পেছনে থাকা জিনগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
তিনি বলেন, ‘মানুষের শতবর্ষী ব্যক্তিদের পাশাপাশি অন্যান্য প্রজাতির ব্যতিক্রমী দীর্ঘজীবী প্রাণীদের সঙ্গে তুলনা করলে তাদের বিশেষত্ব সম্পর্কে জানা সম্ভব। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এসব জ্ঞান প্রয়োগের পথও তৈরি হতে পারে।’
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ইউনিভার্সিটি অ্যাট বাফেলোর জীববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ভিনসেন্ট জে. লিঞ্চের মতে, দীর্ঘায়ুর সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত পরিবর্তন অনুসন্ধানের জন্য জোনাথন একটি আদর্শ গবেষণার বিষয়। তবে গবেষণাটির কিছু পদ্ধতিতে ভুলভাবে ইতিবাচক বা নেতিবাচক ফল পাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
লিঞ্চ বলেন, ‘কোনো জিনগত পরিবর্তন উপকারী, ক্ষতিকর নাকি অভিযোজনের ফল, তা বোঝার জন্য আমরা গণনাভিত্তিক পদ্ধতি তৈরি করেছি। কিন্তু জিন কীভাবে বিবর্তিত হয়, সে সম্পর্কে আমাদের ধারণার ওপর এসব পদ্ধতির ফল অনেকটাই নির্ভর করে। গবেষণায় ব্যবহৃত মডেলটি প্রচলিত হলেও এতে কিছু অবাস্তব অনুমান রয়েছে। ফলে উপকারী পরিবর্তনকে ক্ষতিকর এবং ক্ষতিকর পরিবর্তনকে উপকারী বলে ভুল শনাক্ত করা হতে পারে।’
যুক্তরাজ্যের নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞান অনুষদের সহযোগী অধ্যাপক ইলেনিয়া কিয়ারিও গবেষণাটিকে দীর্ঘায়ু নিয়ে চলমান গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন বলে মনে করেন। গ্যালাপাগোসের বিশালাকার কচ্ছপের দীর্ঘায়ু নিয়েও গবেষণা করেছেন তিনি।
কিয়ারি বলেন, ‘এই ফলাফলগুলো দেখাচ্ছে, কিছু প্রাণী কীভাবে ব্যতিক্রমী দীর্ঘায়ু অর্জন করে, তার পেছনের জটিল প্রক্রিয়াগুলো ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে। দীর্ঘজীবী এসব প্রাণী নিয়ে গবেষণার অন্যতম লক্ষ্য হলো, মানুষের বার্ধক্য ও ক্যানসার নিয়ে গবেষণায় কাজে লাগতে পারে, এমন তথ্য খুঁজে বের করা।’






