পঞ্চ রোমাঞ্চ
- ভ্রমণ আর পর্বতারোহণে গিয়ে অনেক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাই হয়েছে তার। এর মধ্যে পাঁচটির গল্প বলেছেন হোমায়েদ ইসহাক মুন

লংগদু, রাঙামাটি, ২০০৬
লংগদুতে গ্রামের মানুষ দেখিয়ে দিল পাহাড়ের অন্য প্রান্ত থেকে হাতি আসে, আমরা সবাই চুপটি করে লুকিয়ে রইলাম পাহাড়ের আড়ালে।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে এক পাল হাতি পরিবার-পরিজন নিয়ে উপত্যকামতো এক জায়গায় জড়ো হলো। ঠিক হলো, হাতি সামনে পড়ে গেলে জিকজাক দৌড় দেব। হাতির পাল আমাদের দেখতে পেয়েছিল কি না, জানি না; তবে কাছে আসতেই আমাদের কলিজার পানি শুকিয়ে গিয়েছিল। তবে অঘটন ঘটেনি।
মান্দারবাড়িয়া, সুন্দরবন, ২০০৭
সুন্দরবনঘেঁষা কাশিমারী থেকে খোলপেটুয়া নদী পেরিয়ে বুড়িগোয়ালিনী; সেখান থেকে দক্ষিণ মান্দারবাড়িয়া খাল ধরে আমরা পৌঁছেছিলাম এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ মান্দারবাড়িয়া। আজ সেই দ্বীপ জলের তলায় হারিয়ে গেছে।
মানুষখেকো রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আড্ডাখানা হিসেবে কুখ্যাত ছিল জায়গাটি।
নৌকা থেকে নামতেই বালুতে চোখে পড়ল বাঘের টাটকা পায়ের ছাপ। কাছেই ছিল ছোট্ট এক মিঠাপানির জলাশয়। জানা গেল, এখানেই আসে মানুষখেকো বাঘেরা। খালের ভেতর হাঁটার সময় চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন কানে চাপ দিচ্ছিল।
বন্দুক হাতে ফরেস্ট গার্ডরাও এগোতে দ্বিধা করছিলেন। ওই ঝোপঝাড়ের আড়ালেই হয়তো কেউ তাকিয়ে আছে।
চোলাপাস, খুম্বু রিজিওন
নেপাল, ২০১৯
এভারেস্ট বেজ ক্যাম্প ট্র্যাক করার পর থ্রি পাস ট্র্যাকের মধ্যে কঠিনতম পাস হলো চোলা পাস। উচ্চতা প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মিটার। একাই ছিলাম পুরো ট্রেইলে। সঙ্গে গাইড-পোর্টার নেই। এভারেস্ট বেজ ক্যাম্প থেকে ধরেছি চোলা পাস পার হয়ে গোকিয়র পথে। ভেবেছিলাম পথে কাউকে না কাউকে পাব। এক ঘণ্টা যায়, দুই ঘণ্টা যায়, মানুষের চিহ্ন নেই।
একসময় আবিষ্কার করলাম পথ হারিয়েছি। চারপাশে শুধু সাদা শুভ্র বরফের পাহাড়, বাতাস শুষ্ক, প্রচণ্ড ঠান্ডা, উচ্চতায় মাথা ঝিমঝিম করে।
কয়েকবার জোরগলায় চিৎকার দিলাম, ‘অ্যানিবডি হেয়ার’। পাহাড়ে প্রতিধ্বনি হলো, কিন্তু বুঝতে পারলাম কেউ আমাকে শুনতে পাচ্ছে না। নিজেকে শান্ত করে পথ খুঁজতে একটু এদিক-সেদিক তাকালাম, দূরে ‘কেরেইন’ চোখে পড়ল। একটার পর একটা পাথর দিয়ে উঁচু চিহ্ন তৈরি করা, যাতে দূর থেকে পথ খুঁজে পায় পর্বতারোহীরা।
প্রথম যখন গভীর সমুদ্রে স্কুবার পোশাক আর সিলিন্ডার নিয়ে ঝাঁপ দিলাম, রোমাঞ্চে কাঁপছি
ভারত মহাসাগর, হিক্কাডুয়া
শ্রীলঙ্কা, ২০২৪
শ্রীলঙ্কার হিক্কাডুয়ায় ওপেন ওয়াটার স্কুবা ডাইভিংয়ের কোর্স করেছিলাম। প্রথম যখন গভীর সমুদ্রে স্কুবার পোশাক আর সিলিন্ডার নিয়ে ঝাঁপ দিলাম, রোমাঞ্চে কাঁপছি। শেষ দিনে ২০০ বছরের পুরনো একটা জাহাজের ধ্বংসাবশেষে নিয়ে গিয়েছিল আমাদের। টাইটানিক জাহাজ উদ্ধার করতে যেমন ডুবুরিরা ঘুরে বেড়িয়েছে, আমরাও তেমন করে জাহাজের ভাঙা অংশ দিয়ে প্রবেশ করে খুব সাবধানে আলো-আঁধারির মধ্যে অন্য প্রান্ত দিয়ে বের হয়েছি।
মেরা পিক, এভারেস্ট রিজিওন
নেপাল, ২০২৫
মেরা পিকের উচ্চতা ৬৪৭৬ মিটার। অনেক চড়াই-উতরাই পার করে আমরা পৌঁছে যাই খারে গ্রামে। তারপর সামিটের পথে হাঁটা শুরু করি। প্রচণ্ড ঠান্ডা, মাথাব্যথা, অরুচি আর কম ঘুম শরীরকে একদম বিধ্বস্ত করে দেয়। ছয় হাজার মিটারের কাছাকাছি এসে হাইক্যাম্পে আমাদের কিছু সময় বিশ্রামের জন্য তাঁবুতে থাকতে হয়। সেখানে ডিনারের পর আমার বমি হয়।
মধ্যরাতে সামিট পুশের জন্য রেডি হতে হতে অর্ধেক এনার্জি চলে গেল। কনকনে ঠান্ডা বাতাসে মনে হলো হাত-পা জমে যাচ্ছে।
রওনা দেওয়ার কিছুক্ষণ পরই মাথায় একটা চক্কর দেয় এবং আমি পড়ে যাই। শেরপা তাসিকে বললাম, তুমি অন্যদের নিয়ে সামিট করে এসো।





