গরমে বালিয়াটি জমিদারবাড়িতে
- মানিকগঞ্জের বালিয়াটি জমিদারবাড়ি ঘুরে এসে যাওয়ার পথ বাতলেছেন আবু তাহের

মধ্যাহ্নে যেন গরম নিঃশ্বাস ছাড়ছে আকাশ থেকে। এক বোতল পানি আর খোসা ছড়ানো শসা হাতে নিয়ে আসন দখল করলাম মানিকগঞ্জের সাটুরিয়াগামী লোকাল মিনিবাসে। গন্তব্য বালিয়াটি জমিদারবাড়ি। ঢাকা-আরিচা হাইওয়ে ধরে দুপাশের ক্লান্তিকর ইট-পাথরের জঞ্জাল দেখতে দেখতেই চলছিলাম জানালার পাশে বসে।
সাভারের কালামপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে বাস ডানে বাঁক নেওয়ার একটু পরই বদলে গেল দৃশ্যপট। চোখের সামনে হুট করেই হাজির হলো চিরায়ত সবুজ বাংলা। যেখানে ধানক্ষেতের সবুজের সঙ্গে বাতাস খেলা করে। একটু আগেই চোখ লেগে আসা ক্লান্তিটা যেন উবে গেল নিমিষেই। সাটুরিয়া পৌঁছানোর ঠিক আগের বাসস্টপের নামে চোখ গেল আটকে, ‘কাওয়ালি পাড়া’। কী দারুণ একটা নাম!
সাটুরিয়া বাসস্ট্যান্ডে নেমে একটা তিন চাকার প্যাডেল ভ্যানে চড়ে পৌঁছলাম বালিয়াটি প্রাসাদে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ৩০ টাকার টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকতেই ইতিহাসের পথ বেয়ে চলে গেলাম প্রায় ২০০ বছর আগের জমিদারির অন্দরমহলে। আটটি সুবিশাল ভবন রয়েছে এই প্রাঙ্গণে। কোনোটি সাদা কোনোটি বা পলেস্তারা খসে যাওয়া গেরুয়া রঙের। এসব সুরকির গাঁথুনি আর কড়িকাঠের ছাদের নিচেই একসময় ছিল জীবনের নিত্যস্পন্দন।
ছিল কোতোয়ালের হাঁকডাক, ছিল সন্ধ্যা আরতির উলুধ্বনি; হয়তোবা বিষণ্ন বিকালে রাজকুমারীর শয়নকক্ষ থেকে ভেসে আসত পিয়ানোর বিষণ্ন সুর। রাতের রংমহল থেকে শোনা যেত ঘুঙুরের ঝুমঝুম।
অন্দরমহলের বিশাল পুকুরের সোপান বাঁধানো পাঁচটি ঘাট বেয়ে নাইতে নামত অন্তঃপুরের নারীরা। আজ সেসব শুধুই মিহি ধুলার মতো সময়ের আস্তরণের আড়ালে বিস্মৃত ইতিহাস।
স্থানীয় মানুষের কাছে শোনা যায়, নাটোরের দিঘাপতিয়া রাজবাড়ির দেওয়ান দয়ারাম রায়ের এক উত্তরসূরি গোবিন্দ রায় বাড়ি থেকে রাগ করে পালিয়ে নদীপথে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় এসে বাস করতে শুরু করেন।
বালিয়াটি জমিদারবাড়ির কাজ শুরু হয় গোবিন্দ রায়ের হাতেই। কিন্তু তিনি এর কাজ সম্পূর্ণ শেষ করে যেতে পারেননি। আর বর্তমানে যে ভবনগুলো রয়েছে, এগুলোও বিভিন্ন সময়ে তৈরি। বর্তমানে প্রাসাদের ভেতরেই একটি দ্বিতল ভবনকে জাদুঘরে রূপ দেওয়া হয়েছে। এখানে জমিদারদের ব্যবহৃত নিদর্শন দর্শনার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে। এসব দেখতে দেখতে অনেকটা সময় কেটে গেল। এবার ফেরার পালা।
ইতিহাসের এই অনন্য স্থাপনা দেখতে চাইলে ঢাকার গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে সাটুরিয়াগামী বাসে উঠে পড়ুন। সময় লাগবে ঘণ্টাদুয়েক, ভাড়া জনপ্রতি ১০০ টাকা।
মনে রাখবেন, এই জমিদারবাড়ি রবিবার সারা দিন ও সোমবার দিনের প্রথমার্ধ দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ থাকে।




