হায়দরাবাদের ‘মেষপালকের’ দুর্গে

গোলকোন্দা ফোর্ট
‘স্যার, ইয়া পর আইয়ে, মিডিলসে হো কার তুড়ি দিজিয়ে’— ট্যুরিস্ট গাইডের কথায় নির্ধারিত জায়গায় দাঁড়িয়ে হাততালি বাজাতেই অবাক হলাম। জোরে প্রতিধ্বনি উঠছে ছাদ থেকে। জায়গাটা ভারতের তেলেঙ্গানার হায়দরাবাদ শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত গোলকোন্দা ফোর্টের প্রবেশ দুয়ার। নাম ফতেহ দরওয়াজা।
স্থানীয় গাইডের তথ্যে জানা গেল, যদি কখনো নিরাপত্তাসংক্রান্ত সন্দেহজনক কিছু দ্বাররক্ষীদের নজরে আসত, তখনই তারা হাতে তালি বাজাত। আর সেই শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়ে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে পাহাড়ের ওপর অবস্থিত মূল প্রাসাদ থেকে শোনা যেত। মোবাইল, ওয়াকিটকির ডিজিটাল যুগ আসার বহুকাল আগে এমনটাই ছিল নিরাপত্তা সতর্কতা সংকেত।
এগারো শতকে কাকাতিয়া রাজবংশের হাত ধরে পাহাড়ের চূড়ায় মাটির দুর্গ হিসেবে জন্ম নেয় গোলকোন্দা ফোর্ট। লোকগাথা অনুযায়ী, এক মেষপালক পাহাড়ের ওপর পরিত্যক্ত এই দুর্গটি খুঁজে পেয়েছিল। তেলেগু ভাষায় ‘গোলকোন্দা’ শব্দের অর্থ— ‘মেষপালকের পাহাড়’।
চতুর্দশ শতকে কাকাতিয়াদের পতনের পর দুর্গটি বাহামনি সালতানাতের অধীনে আসে। মাটির দেয়াল বদলে তখন তৈরি হয় শক্তিশালী পাথুরে দেয়াল, এটি রূপ নেয় এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্রে। ১৫১৮ সালে সুলতান কুয়ালি-কুতুব-উল-মুলক গোলকোন্দা দখল করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং একে তার নবগঠিত রাজ্যের রাজধানী বানান। তখন পাহাড়ের চূড়ার এ সাধারণ দুর্গটি পরিণত হয় বিশাল এক সামরিক ও রাজকীয় কমপ্লেক্সে।
বিশ্ববিখ্যাত হীরা কোহিনুর, হোপ ডায়মন্ড, দরিয়া-ই-নুর এই গোলকোন্দার সঙ্গে সম্পৃক্ত। বহু ইউরোপিয়ান, আরব ও পার্সিয়ান বণিক এই গোলকোন্দায় হীরে-জহরতের কেনাবেচা করতে আসত। দুর্গের আশপাশে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৫৯১ সালে সুলতান মুহাম্মাদ কুয়ালি কুতুব শাহ দুর্গ থেকে অদূরবর্তী স্থানে হায়দরাবাদ শহরের পত্তন করেন।
সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে ১৬৮৭ সালে মুঘল সৈন্যদল গোলকোন্দা ফোর্ট আক্রমণ করে এর পতন ঘটায়।
গত মে মাসের প্রথম সপ্তাহে যখন এই দুর্গ দর্শনে বের হই তখন চোখে পড়ে, দ্বিপ্রহরের আগুনজ্বলা সূর্যের তাপে গলদঘর্ম দর্শনার্থীরা কোথাও বিশাল পাঁচিলের ছায়ায় একটু জিরিয়ে নিচ্ছে। কোথাওবা এক বা দুটি ঝাঁকড়া সবুজ খাটো বৃক্ষ ছায়া বিলাচ্ছে। ইন্ডিয়ান আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে ডিপার্টমেন্টের ব্যবস্থাপনায় সুপেয় জলের আধুনিক সরবরাহ চালু আছে স্থানে স্থানে। যেখান থেকে দর্শনার্থীরা নিজ নিজ পানির বোতল রিফিল করে নিচ্ছে। দরবার হলের পাশের চত্বরের কোল ঘেঁষে রয়েছে একটা মন্দির। যেখানে অনেকেই উপাসনা করছে। কোনো কোনো পরিত্যক্ত প্রাসাদ আজ বুনো কবুতরের ঘর-বসতি, যাদের বিষ্ঠার পুরু আস্তরণ জমে ঢেকে গেছে প্রাসাদের মেঝে। এসব ক্ষয়ে যাওয়া পাথুরে দেয়াল আর ভগ্ন প্রাসাদ আজও দাঁড়িয়ে থেকে প্রাচীন রাজকীয় সময়ের প্রতিনিধিত্ব করছে। বড় বড় পাথুরে সোপান পেরিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার কালে সময় যেন টাইম মেশিনে করে ফিরে যাচ্ছিল পাঁচশ বছর আগের সেসব দিনগুলোতে। যখন সিপাই-সান্ত্রি আর কোতোয়ালের হাঁকডাকে মুখরিত থাকত দুর্গের তোরণ আর গলিপথ। বলিউড ও দক্ষিণী অনেক সিনেমার শুটিং হয় এ দুর্গে।
যেভাবে যাবেন
হায়দরাবাদ শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে ১১ কিলোমিটার দূরে মেহেন্দিপাতনম এবং তোলিচৌকি এলাকার কাছাকাছি এই দুর্গের অবস্থান। মেট্রোরেল ব্যবহার করতে চাইলে জুবিলি হিলস চেকপোস্ট মেট্রো স্টেশনে নেমে ট্যাক্সি অথবা বাইক ভাড়া করে পৌঁছানো যায়। সপ্তাহের সাত দিনই সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে গোলকোন্দা ফোর্ট।




