মেঘের রাজ্যে বহুমাত্রিক

মেঘের রাজ্য সাজেকে বহুমাত্রিকের সদস্যরা
ব্যস্ত শহর ঢাকার কোলাহল পেছনে ফেলে ২৫ আগস্ট রাতে শুরু হয়েছিল আমাদের সাজেকযাত্রা। বহুমাত্রিক ফাউন্ডেশনের ছয় সদস্যের এই ছোট্ট ভ্রমণদলটির সঙ্গী হয়েছিল পাহাড়, মেঘ, বৃষ্টি, গান, হাসি আর অজস্র স্মৃতি। এই ভ্রমণের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল আমাদের সঙ্গী রশীদুল ভাইয়ের। পুরো সফরের আয়োজন থেকে শুরু করে নানা পরিকল্পনায় তার আন্তরিক প্রচেষ্টা আমাদের যাত্রাকে সহজ ও সুন্দর করে তুলেছিল।
শুরুটা অবশ্য খুব একটা সহজ ছিল না। শেষ মুহূর্তে টিকিট না পাওয়ায় ঢাকার আরামবাগ থেকে দুজন এবং কল্যাণপুর থেকে চারজনের দলকে বসতে হয়েছিল বাসের একদম শেষের দিকের আসনগুলোয়।
দীর্ঘ যাত্রার পর চান্দের গাড়িতে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে শুরু হয় আরেক অভিজ্ঞতা। আমাদের বন্ধু শামলী ভয়ে বারবার বলছিল, ‘আমাকে নামিয়ে দাও, আমি হেঁটে যাব!’ অন্যদিকে শুভর ঘোষণা, ‘আমি আর জীবনে আসব না!’ আর আমি ভয় না পেলেও রাস্তার গরম আর দীর্ঘ যাত্রায় তখন বেশ বিরক্ত।
সাজেকে পৌঁছে আমাদের ঠিকানা ছিল নতুন লুসাই কটেজ। মজার বিষয়, উদ্বোধনের দিনই আমরা ছিলাম তাদের প্রথম অতিথি। বিকেলে হেলিপ্যাড ঘুরে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে জমে ওঠে আড্ডা। বিশেষ করে বন্ধু নিবিড়ের গান ও কমেডি ছিল ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ। মনটানা রেস্টুরেন্টে রাতের খাবারের আগে তার গান শুনতে আশপাশের মানুষও খাওয়া থামিয়ে দিয়েছিলেন।
সেই রাতে বৃষ্টিভেজা আবহাওয়ায় মনটানার বাঁশের বিরিয়ানি যেন ভ্রমণের স্বাদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। তবে পুরো সফরের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত মুহূর্তটি ছিল পরদিন ভোরে। রাতের বৃষ্টির পর সূর্যোদয়ের সঙ্গে যখন চারপাশ মেঘের সাদা চাদরে ঢেকে গেল, তখন মনে হয়েছিল যে এই একটি দৃশ্যের জন্যই এত পথ পাড়ি দেওয়া। পাহাড়ের বুক জুড়ে ভেসে বেড়ানো মেঘের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, সব ক্লান্তি যেন মুহূর্তেই সার্থক। লুসাই কটেজের বারান্দা থেকে সকালের মেঘমাখা অপূর্ব দৃশ্য উপভোগ করে আমরা ছুটে গিয়েছিলাম কংলাক পাহাড়ে, প্রকৃতির আরও বিস্তৃত সৌন্দর্যকে কাছ থেকে দেখতে।
ফেরার পথে খাগড়াছড়ির আলুটিলা গুহা, ঝরনা ও ঝুলন্ত ব্রিজ ঘুরে দেখি। আমাদের আয়াজ ভাই তখন দলের কোলাহল থেকে একটু দূরে, নিজের মতো করে পাহাড়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে ব্যস্ত। হয়তো নীরবতার মাঝেই খুঁজছিলেন কিছু অপ্রকাশিত উত্তর। এরপর খাগড়াছড়ির বন্ধু মংয়ের পরামর্শে পিংক সল্ট রেস্টুরেন্টে পাহাড়ি নানা খাবারের স্বাদ নিই। সেখানে বিশেষভাবে ভালো লেগেছিল হাঁসের মাংস।
২৮ তারিখ সকালে ফিরেছি ঢাকায়। ফিরে এসেছি ঠিকই, কিন্তু সাজেকের সেই মেঘগুলো যেন এখনো মনের পাহাড়ে ভেসে বেড়ায়। কিছু ভ্রমণ শুধু জায়গা দেখা নয়, হয়ে ওঠে বন্ধুত্ব, হাসি আর স্মৃতির বহুমাত্রিক গল্প।









