অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের মুক্তা

দুব্রোভনিক
ক্রোয়েশিয়ার রাজধানী জাগরেব থেকে সরাসরি ট্রেন নেই। তাই ট্রেনে চেপে পাঁচ ঘণ্টার যাত্রায় প্রথমে পৌঁছালাম স্প্লিট শহরে, তারপর বাস ধরে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য ‘পার্ল অব অ্যাড্রিয়াটিক’ বা অ্যাড্রিয়াটিকের মুক্তা নামে খ্যাত প্রাচীন শহর দুব্রোভনিক।
পথে চোখে পড়ল বিখ্যাত কারাকাও জাতীয় উদ্যান থেকে নেমে আসা অদ্ভুত সবুজ জলের এক নদী, যা সোজা গিয়ে মিশেছে অ্যাড্রিয়াটিক সাগরে। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা ও সাগরের তীর ঘেঁষে যাওয়া পথ ধরে এগোতে লাগলাম। দুপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য রূপ বদলাচ্ছে। লম্বা পাইন বন পেরিয়ে একসময় ফুটে উঠল বুনো অলিবের ঝোপঝাড়।
স্প্লিট পৌঁছানোর পর সেখান থেকে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার মোস্তার শহরে এক দিন কাটিয়ে সাগরের নীল জলরাশি আর পাহাড়ের রূপ দেখতে দেখতে অবশেষে পরদিন বিকালে পৌঁছালাম দুব্রোভনিক।
হোটেলটি ছিল ঐতিহাসিক ওল্ড টাউনে। ট্যাক্সিচালক এক বসনিয়ান নারী আমাকে পুরনো শহরের গেটে নামিয়ে দিয়ে রহস্যময় হেসে বললেন, ‘গাড়িতে যাওয়া মানা, হেঁটে যেতে হবে। তবে তার আগে ক্যাবল কারে উঠে অ্যাড্রিয়াটিকের বুকে সূর্যাস্ত দেখতে ভুলবেন না কিন্তু!’
ট্যাক্সি থেকে নেমে পাথরের সরু গলি ধরে হাঁটতে লাগলাম। চারদিকে প্রাচীন পাথরের দুর্গ আর উঁচু প্রাচীর, তার মাঝে সারি সারি তিনতলা ভবন। এই গলিগুলোর দুপাশে ক্যাফে ও রেস্তোরাঁ। স্থানীয় এক সার্ভিসম্যানের সাহায্যে বহু সিঁড়ি পেরিয়ে খুঁজে পেলাম আমার হোটেল।
সূর্য ডোবার ঠিক মুহূর্তে ছুটে গেলাম কাছেই ক্যাবল কার স্টেশনে। ৩০ ইউরোতে টিকিট কেটে পৌঁছে গেলাম প্রায় আড়াই হাজার ফুট ওপরের পর্বতচূড়ায়। সেখান থেকে পুরো ওল্ড টাউন আর রক্তিম গোধূলিতে অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের রূপ দেখে মন শিহরিত হলো। পাখির চোখে নিচে তাকাতেই চোখে পড়ল দুব্রোভনিকের বিখ্যাত পোড়ামাটির লাল ছাদ। পর্বতচূড়ায় পরিচয় হলো ইতালীয় এক তরুণীর সঙ্গে; সাগরের বুকে এক মায়াবী সন্ধ্যার স্মৃতির সাক্ষী হয়ে দুজনে নেমে এলাম নিচে।
বার্নার্ড শ থেকে আগাথা ক্রিস্টির মতো বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিকরা বারবার এই রূপকথা সমতুল্য শহরের প্রেমে পড়েছেন
রাতে পুরনো শহরের এক রেস্তোরাঁয় চলল অ্যাড্রিয়াটিকের ঐতিহ্যবাহী ব্লুফিন টুনা মাছের সুস্বাদু ভোজন। রাত ১১টা পর্যন্ত প্রাচীন প্রাচীরে ঘেরা আলোকিত রাস্তায় শত শত পর্যটকের কোলাহলে হারিয়ে গেলাম।
পরদিন সকালে সোনালি রোদ ফুটতেই বেরিয়ে পড়লাম এগারো থেকে তেরো শতকের মধ্যে নির্মিত ১৮ ফুট চওড়া ও প্রায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা প্রাচীর বরাবর হাঁটতে। শহরের এই শক্ত দেয়াল শত শত বছর ধরে শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করেছে। দেয়ালের ওপর দাঁড়িয়ে যতদূর চোখ যায়, একদিকে চোখধাঁধানো পান্না-সবুজ অ্যাড্রিয়াটিকের উছলে পড়া ঢেউ; অন্যদিকে ঐতিহাসিক পোড়ামাটির লাল ছাদের বিস্তার। বিশ্ব জুড়ে আলোকচিত্রীদের জন্য এটি এক স্বর্গরাজ্য। দেয়ালের ওপরের ছোট রেস্তোরাঁয় বসে সামুদ্রিক হাওয়া গায়ে মেখে যে প্রশান্তি মেলে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
ইতিহাস আর স্থাপত্যের মেলবন্ধন দেখা যায় ওল্ড টাউনের আনাচে-কানাচে। তেরো শতকের ‘ডোমিনিকান মনাস্ট্রি’, পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকের বিখ্যাত চিত্রকর্ম দিয়ে সাজানো জাদুঘর আর পাথর-খিলানযুক্ত ‘স্পঞ্জা প্রাসাদ’ দর্শনার্থীদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। লুজা স্কয়ারে সেন্ট ব্লেইজের চার্চ, সেন্ট জনস ফোর্সে অবস্থিত ‘মেরিটাইম মিউজিয়াম’ এবং ১৫৯০ সালে তৈরি শস্যের গুদামে রক্ষিত ‘নৃতাত্ত্বিক জাদুঘর’ শহরটির সমৃদ্ধ নৌ ইতিহাস ও সংস্কৃতির নীরব সাক্ষী।
দুব্রোভনিকের ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধ। কবি লর্ড বায়রন একে ‘অ্যাড্রিয়াটিকের মুক্তা’ নামে অভিহিত করেছিলেন আর বার্নার্ড শ থেকে আগাথা ক্রিস্টির মতো বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিকরা বারবার এই রূপকথা সমতুল্য শহরের প্রেমে পড়েছেন। ১৯৭৯ সালে ইউনেসকো এটিকে ‘বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
ভ্রমণ টিপস
দুব্রোভনিকে সরাসরি বিমানে আসা যায়। শহরের কাছেই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রয়েছে। ক্রোয়েশিয়ার রাজধানী জাগরেব থেকে বিমান ও বাস সার্ভিস চালু রয়েছে। দূরবর্তী দেশ থেকে আসার ক্ষেত্রে ইউরোপের যেকোনো বড় শহর (যেমন— ফ্রাঙ্কফুর্ট, ভিয়েনা বা ইস্তাম্বুল) হয়ে ট্রানজিট ফ্লাইট নেওয়া সুবিধাজনক।




