বর্ষার ঠিকানা সিলেট

রাতারগুল
বর্ষার আসল রূপ যদি দেখতে চান, তবে আপনার প্রথম পছন্দ হওয়া উচিত সিলেট। নদীর স্বচ্ছ পানি, বৃষ্টিভেজা অরণ্য, চা-বাগান আর পাহাড়-টিলা, ঝরনা— সব মিলিয়ে বর্ষার সিলেট সত্যি অতুলনীয়। বর্ষার সিলেট ভ্রমণে আপনাদের গাইড ইশতিয়াক হাসান
রাতারগুলের সত্যিকারের রূপ দেখা যায় বর্ষাতেই। এ বনের বেশিরভাগ অংশ এখন জলে ডুবা। নৌকা নিয়ে যখন আপনি বনের ভেতরে ঢুকবেন, চারপাশটা হুট করেই নিঝুম হয়ে যাবে। মাথার ওপর করচ ও হিজলগাছের সবুজ ছাউনি আর নিচে থইথই কালো জল। গাছের ডালপালা জলের ওপর ঝুঁকে আপনাকে স্বাগত জানাবে। জলের বনের রাজ্যে ছোট নৌকা দিয়ে চিকন জলপথ ধরে যাওয়ার সময় মাঝে মাঝে গাছের ডালপালা এসে লাগবে শরীরে। নৌকার পথ করে নিতে হবে এগুলোকে মাঝির বৈঠা দিয়ে সরিয়ে। সাবধান! গাছে হঠাৎ কোনো সাপকে ঝুলতে দেখে আবার আতঙ্কে হুড়োহুড়ি করে নৌকা ডুবাবেন না যেন। এক ডাল থেকে আরেক ডালে লাফিয়ে বেড়াতে দেখবেন বানরের দলকে, শুনবেন হরেক পাখির ডাক। ঝুম বৃষ্টি যখন এই বনের পাতার ওপর ঝরে পড়ে, সেই শব্দের যে কী মাদকতা, তা নিজের কানে না শুনলে বোঝা অসম্ভব। বনের ওয়াচ টাওয়ারে উঠে যখন চারদিকে তাকাবেন, মনে হবে আপনি কোনো রূপকথার জলমগ্ন অরণ্যে দাঁড়িয়ে আছেন।
সিলেটে আমার খুব প্রিয় জায়গা কানাইঘাটের লোভাছড়া। বর্ষায় সুরমা আর বরাক নদী পেরিয়ে যখন লোভাছড়া নদীতে আপনার নৌকা প্রবেশ করবে, আপনি স্তব্ধ হয়ে যাবেন। মেঘে ঢাকা খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়কে এতটাই কাছে মনে হবে, যেন ছুঁতে পারবেন। এখানকার নদীর জল কাচের মতো স্বচ্ছ, তলার পাথরগুলো স্পষ্ট গোনা যায়।
নৌকা থেকে নেমে যখন চা-বাগানের দিকে হাঁটবেন, চারপাশের ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ আপনাকে মাতাল করবে। চা-বাগানের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে ১৯২৫ সালে ব্রিটিশদের তৈরি শতবর্ষী এক ঝুলন্ত সেতু। লোহার এ পুরনো সেতুতে দাঁড়িয়ে যখন নিচে বয়ে যাওয়া পাহাড়ি ছড়া আর দূরে মেঘের আনাগোনা দেখবেন, মনে হবে সময় যেন থমকে গেছে। এখানকার আরেকটি বড় আকর্ষণ ছিল শণের ছাউনি দেওয়া বিশাল ব্রিটিশ বাংলো। বছর দুয়েক আগে এটি আগুনে পুড়ে গেছে। তবে জেনেছি, শিগগির আগের মতো করেই গড়ে তোলা হবে বাংলোটি। বছর কয়েক আগেও এই বাংলোর চৌহদ্দি থেকে কুকুর ধরে নিয়ে যেত চিতা বাঘ।
সিলেটের আরেক আকর্ষণীয় গন্তব্য লালাখাল। জৈন্তাপুরের এই নদীর পানির রঙ আপনাকে বিস্মিত করবেই। বর্ষায় এর জল কোথাও পান্না সবুজ, কোথাও আবার গাঢ় নীল। নৌকায় চড়ে যখন আপনি ওপরে মেঘাচ্ছন্ন আকাশ আর নিচে এই রঙিন জলের বুক চিরে এগিয়ে যাবেন, মনে হবে রঙিন ক্যানভাসের ভেতর দিয়ে চলছেন। নৌকায় চেপে জিরো পয়েন্টে গেলে আপনাকে স্বাগত জানাবে ভারতের উঁচু সব পাহাড়।
জল আর পাথরের আসল মিতালি দেখতে আপনাকে যেতে হবে কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর এলাকায়। ধলাই নদীর বুক জুড়ে ছড়িয়ে আছে অজস্র সাদা পাথর। মেঘালয়ের পাহাড় থেকে ধেয়ে আসা তীব্র পাহাড়ি ঢল এই পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে যায়। নদীর ঠান্ডা, কাচস্বচ্ছ পানিতে পা ডুবিয়ে বসলে নিমেষে সব ক্লান্তি ধুয়েমুছে যাবে। মেঘের দল তখন পাহাড়ের গা বেয়ে নিচে নেমে এসে ছুঁয়ে যাবে আপনাকে।
সিলেটে আমার খুব প্রিয় আরেকটি জায়গা পান্থুমাই। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এক রূপসী গ্রাম এটি। ভারতের বড়হিল ঝরনাটি এই গ্রামের সীমান্ত ঘেঁষে ধেয়ে নেমে আসে বাংলাদেশের বুকে। বর্ষায় এ ঝরনার যৌবন দেখার মতো। দূর থেকে ঝরনার পানির গর্জন আর ধোঁয়াটে জলকণা বাতাসে উড়ে এসে যখন আপনার গায়ে লাগবে, এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ অনুভব করবেন।
আরও যা দেখবেন
সিলেটে আসবেন অথচ চা-বাগানে ভিজবেন না, তা কী করে হয়! শহরের খুব কাছেই রয়েছে মালনীছড়া ও লাক্কাতুরা চা-বাগান। তবে বর্ষায় চা-বাগানের আসল রূপ দেখতে আপনাকে যেতে হবে খাদিমনগর চা-বাগানে। মাইলের পর মাইল সবুজ টিলা আর বৃষ্টির ছোঁয়ায় সেই সবুজ যেন আরও গাঢ়, আরও সতেজ হয়ে উঠেছে। খাদিমনগর ন্যাশনাল পার্কের জঙ্গলেও মুগ্ধ হবেন। সিলেটের বর্ষা এখানেই শেষ নয়। এ সময়ে আপনি ঘুরে আসতে পারেন বিছনাকান্দি, জাফলং কিংবা জৈয়িন্তা থেকেও।
চা-বাগানের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে ১৯২৫ সালে ব্রিটিশদের তৈরি শতবর্ষী এক ঝুলন্ত সেতু
কীভাবে যাবেন ও কোথায় থাকবেন
ঢাকা থেকে বাস, ট্রেন বা আকাশপথে সরাসরি সিলেট যাওয়া যায়। আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য উপবন বা পারাবত এক্সপ্রেস ট্রেনের স্নিগ্ধা/এসি বার্থ বেছে নিতে পারেন। সিলেট শহর থেকে বিছনাকান্দি, রাতারগুল বা সাদা পাথরের জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশা হতে পারে উপযোগী বাহন। রাতারগুল দেখে দিনে দিনে সাদা পাথর কিংবা বিছনাকান্দি-পান্থুমাই ঘুরে আসতে পারেন। লালাখালে যেতে চাইলে সারিঘাট হয়ে নৌকা নিতে হবে। কানাইঘাট থেকে নৌকা রিজার্ভ করে যাবেন লোভাছড়া।
থাকার জায়গা (রিসোর্ট ও হোটেল)
সিলেট শহর, লালাখাল, জাফলং এবং জৈয়িন্তা থাকার জন্য বেশ কিছু ভালো হোটেল-রিসোর্ট রয়েছে। তবে প্রকৃতির কাছাকাছি লাক্সারি অভিজ্ঞতা চাইলে বেছে নিতে পারেন— ১. নাজিমগড় রিসোর্ট (খাদিমনগর ও লালাখাল), ২. শুকতারা নেচার রিসোর্ট (খাদিমনগর), ৩. জৈয়িন্তা হিল রিসোর্ট (জৈয়ন্তীয়া-জাফলং) ৪. জাফলং গ্রিন রিসোর্ট (জাফলং)।
গাইডলাইন ও টিপস
জোঁক ও পোকামাকড়ে সাবধান: বর্ষায় রাতারগুল বা চা-বাগানে জোঁকের উপদ্রব খুব বাড়ে। তাই সঙ্গে সবসময় লবণ, সরিষার তেল বা ডেটল রাখুন। ফুলপ্যান্ট এবং স্নিকার্স বা বুট জুতো পরা সবচেয়ে নিরাপদ।
লাইফ জ্যাকেট বাধ্যতামূলক: বর্ষায় পাহাড়ি ঢলে নদীর স্রোত ও হাওরের ঢেউ খুব বিপজ্জনক রূপ নেয়। সাঁতার জানলেও নৌকাভ্রমণের সময় অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করবেন।
ডিজিটাল ডিভাইসের সুরক্ষা: বৃষ্টি যেকোনো সময় নামতে পারে। তাই ফোন, ক্যামেরা রাখার জন্য ভালোমানের ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগ বা জিপলক ব্যাগ সঙ্গে রাখুন।
রেইনকোট ও ছাতা: ভারী ছাতা বা রেইনকোট সঙ্গে রাখুন। পাহাড়ি এলাকায় ভ্রমণের সময় জুতা যেন ভালো গ্রিপযুক্ত হয়, সেদিকে খেয়াল রাখুন।






