ফেজনগরে গলির গোলকধাঁধায়
- একসময় ঢাকাকে বলা হতো বায়ান্ন বাজার তেপ্পান্ন গলির শহর। তবে ফেজ শহরের একটা অংশেই আছে প্রায় সাড়ে নয় হাজার গলি। একেকটি গলি যেন রঙিন গল্পের মোড়কে জড়ানো। মরক্কোর ঐতিহে্য মোড়া এই নগর ঘুরে এসে লিখেছেন ফাতিমা জাহান

একে তো গোলকধাঁধার মতো সব গলি, তা আবার বাজার আর প্রাচীন স্থাপনায় ঠাসা। একবার কোনো গলিতে ঢুকে দ্বিতীয়, তৃতীয় দিয়ে বের হওয়ার পথ খুঁজে বের করা মুশকিল হয়ে যায় ।
এই শহরটির নাম ফেজ। অবশ্য মরক্কোর এ শহরের সব এলাকায় এমন গলি আর রমরমা বাজার নেই। আছে শুধু মেদিনা বা পুরনো মহল্লায়।
ফেজ শহরে আমি উঠেছি পুরনো একটা প্রাসাদের মতো বাড়িতে। স্থানীয় ভাষায় বলা হয় রিয়াদ। বাড়ি তো নয় যেন রূপকথার গল্পের পাতা থেকে উঠে আসা এক চলমান হকিকত। ভেতরের দেয়ালে প্রাসাদের মতোই রঙিন টাইলসে নকশা, ওপরের দেয়ালে পাথরে আর প্লাস্টারে খোদাই করা নকশা। সোফা, বিছানা, টেবিল— সবকিছু যেন প্রাসাদ থেকে তুলে আনা, খোদাই করা কাহিনি। পর্দা, টেবিল ক্লথ, বিছানার চাদরের সুঁই-সুতার নকশায় লেগে রয়েছে হাজার বছরের মরক্কোর ঐতিহ্য।
রিয়াদ থেকে বের হয়ে বাজারের দিকে হাঁটা দিলাম। ফেজনগরে আমি মূলত এসেছি পৃথিবীর সর্বপ্রথম বিশ্ববিদ্যালয় আল ক্কারাউইনের নাজাকত দেখতে। তাই গলির প্যাঁচঘোচ কাটিয়ে ছুটে চলেছি আল ক্কারাউইন মসজিদের দিকে।
অবশেষে যখন আল ক্বারাউইন মসজিদে পৌঁছালাম, তখন পিতলের বিশাল সদর দরজার এপাশ থেকে ট্যুরিস্টদের দেখতে দেওয়া হয়েছে মসজিদের আঙিনার সামান্য একটা অংশ। দরজার সামনে মসজিদের মূল প্রবেশপথের ওপরে বিশাল চাঁদোয়া হয়ে আছে গোলাকার সিলিং। সেখানে খোদাই করা নানা জাদুকরী নকশা।
মসজিদের ভেতরের খুবসুরত দেখার খায়েশ জাগে। মসজিদের দ্বাররক্ষী বলল, ‘নামাজের সময় নামাজ পড়তে এলে ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে। এমনিতে মুসলমান ছাড়া অন্য কারও প্রবেশ নিষেধ।’
জোহর নামাজের ঢের দেরি। তাই ঘুরে মসজিদের অন্য দরজার দিকে হাঁটা দিই।
৮৫৭ সালে ফাতিমা আল ফিহরি নামের একজন ধনাঢ্য নারী আল ক্বারাউইন মসজিদটি নির্মাণ করেন। ফাতিমা আল ফিহরি এবং তার পরিবার তিউনিসিয়ার ক্বারাউইন শহর থেকে মরক্কোর ফেজ শহরে বসবাস করতে এসেছিলেন। আল ক্বারাউইন মসজিদ নির্মাণের কয়েক বছর পরই পাশে একটি আধুনিক মাদ্রাসা বা বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করেন ফাতিমা। আজ আল ক্বারাউইন বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন, সচল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলতেই একজন আমাকে কয়েকটি রঙিন কাচের জিনিসপত্রের দোকান পার করিয়ে একটি দোকানে ঠেলে দিল। সে দোকানের ভেতরে দেখছি চোরা কুঠুরি আছে। ভেতরের সিঁড়ি দিয়ে আমায় নিয়ে এলো দোতলায় ইবনে সিনার গবেষণাগারের মতো একটি কক্ষে। সেখানে টেবিলের ওপর থরে থরে সাজানো নানা বয়াম বা জারে বিচিত্র রঙের সব গুঁড়া।
একপাশে হাতে ব্যবহৃত ছোট মেশিনে একটি মেয়ে কিছু তৈরিতে ব্যস্ত। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই তোমরা কি আমাকে জাদুটোনা করে ভেড়া বানিয়ে রাখবে?’ ওরা হেসে ফেলল। আমার সঙ্গে দোতলা বেয়ে আসা ছেলেটি বলল, ‘না না। এটা একটা হারবাল প্রসাধনীর দোকান। এখানে তেল, সুগন্ধি, চা পাতা ইত্যাদি পাওয়া যায়। তুমি আল ক্বারাউইন বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে চেয়েছ। তোমাকে ছাদে নিয়ে যাচ্ছি।’
একটু আগেই যে মসজিদের একাংশ দেখে এসেছি, এখন এই উঁচু জায়গা থেকে তার আঙিনার বড় অংশ চোখে পড়ছে। আন্দালুসিয়ান স্থাপত্যে গড়া চৌকোণ সাদা মিনারটি আকাশ ছুঁতে চায়। আয়তাকার আঙিনাকে ঘিরে মূল মসজিদ ভবন, আর তার সবুজ ট্যালি-ঢাকা ছাদ দোচালা ঘরের মতো বিস্তৃত।
গলিতে নামতেই রঙের বিস্ফোরণ। প্রথম গলিতে সারি সারি ল্যাম্প। কোথাও রুপালি ছোঁয়া, ছোট থেকে বিশাল— সবই ঝলমল করছে। পরের গলিতে সিরামিক। প্লেট, বাটি, ফুলদানি—প্রতিটিতে সূক্ষ্ম তুলি আঁকা নকশা, যেন শিল্পকর্ম। চোখ ধাঁধিয়ে যায়।
এত সৌন্দর্যের মধ্যেও থামলাম না। আমার গন্তব্য মারিস্তান। ১২৮৬ সালে মারিনিদ সুলতান আবু ইউসুফ নির্মিত সেই হাসপাতাল, যেখানে শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের কথাও ভাবা হয়েছিল। পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত চিকিৎসা চলার পর এটি বন্ধ হয়ে যায়। জিজ্ঞেস করতে করতে পৌঁছালাম হেনা গলিতে। একপাশে মেহেদির দোকান, অন্যপাশে সিরামিক। এখানেই ছিল হাসপাতাল। কিন্তু কোনো চিহ্ন নেই।
জোহর নামাজের আগে আল ক্বারাউইনে পৌঁছাতে হবে। তাড়াহুড়ো করে পথ জিজ্ঞেস করতে করতে অবশেষে পৌঁছে গেলাম। অন্য দরজা দিয়ে ঢুকে পড়লাম নারীদের নামাজের স্থানে। লাল নকশা করা কার্পেটের ওপর সবাই নামাজে দাঁড়িয়ে। নামাজ শেষে মন দিলাম চারপাশে।
নারীদের বারান্দার কাঠের খাঁজকাটা রেলিংয়ের ফাঁক দিয়ে আঙিনার একাংশ দেখা যায়। ডানপাশে ওজুর জন্য আলাদা বারান্দা— মাঝখানে শ্বেতপাথরের ফোয়ারা, নিচে জেলিশ টাইলসের নকশা। আটটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়ানো ছাউনির দেয়ালে সাদা প্লাস্টারের খোদাই। তার ওপর কাঠের কারুকাজ,‘জুউক’।
আঙিনার অন্যপাশে একই রকম আরেকটি ছাউনি। সবকিছুর ওপর ছায়া দিয়ে আছে সবুজ ট্যালির ছাদ। আর মাঝখানের মেঝেতে সাদা, নীল, সবুজ জেলিশ টাইলস ঝকঝক করছে—পরের ওয়াক্তের অপেক্ষায়।
নারীরা সবাই চলে গেছে। মসজিদের পাহারাদার আমায় দেখে বিনীত স্বরে চলে যেতে বলল। মসজিদের চৌহদ্দি তখনো পেরোইনি, সামনে একটি ছেলেকে মসজিদ থেকে বের হতে দেখি। এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কি আল ক্বারাউইনের ছাত্র?’ সে হ্যাঁ বলতেই প্রশ্ন করলাম, ‘আমাকে কি তোমার বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে দেখাবে?’ জানলাম, ছেলেটির নাম ইয়াসিন। বলল, ‘এই মসজিদ প্রাঙ্গণে আগে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল, এখন স্থান সংকুলান করতে না পেরে দেড় কিলোমিটার দূরে অন্য একটি ভবনে স্থানান্তরিত করেছে।’
আমি বললাম, ‘তাহলে এখানকার মাদ্রাসাটিই দেখাও।’
ইয়াসিন আমাকে নিয়ে গেল মসজিদের পাশের দরজার দ্বাররক্ষীর কাছে। এবার আর আটকালেন না। বেশ কিছুটা সময় নিয়ে দেখা শেষ করে আমি আবার বেরিয়ে পড়ি ফেজ শহরের হাজার হাজার অলিগলির রহস্য ভেদ করতে।





