এভারেস্ট দিবস
এভারেস্ট জয় করা বাংলাদেশিরা

ভোর ৫টা ২৪ মিনিট। ২৭ মে ২০২৬।
চারদিকে শুধু বরফ, বাতাস আর আকাশ। নিচে পৃথিবীর সব পর্বত, সব উপত্যকা, সব নদী। আর ওপরে আর কিছু নেই।
পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন বাংলাদেশের নুরুন্নাহার নিম্নি।
এক হাতে লাল-সবুজ পতাকা। অন্য হাতে বহু বছরের স্বপ্ন।
চট্টগ্রামের চন্দ্রনাথ পাহাড়ে যে মেয়েটি প্রথম পাহাড়ের প্রেমে পড়েছিলেন, সেই মেয়েই এখন পৃথিবীর ছাদে। ১৪ বছর পর আবার কোনো বাংলাদেশি নারী এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছালেন।
কিন্তু নিম্নির গল্পটি আসলে আরও বড় এক গল্পের অংশ। এটি এমন কিছু মানুষের গল্প, যারা হিমালয়ের ভয়ংকর বরফরাজ্যে গিয়ে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গের সঙ্গে লড়াই করেছেন। কেউ ফিরে এসেছেন বিজয়ী হয়ে, কেউ ইতিহাস গড়েছেন, কেউ আবার চূড়া স্পর্শ করেও আর ঘরে ফিরতে পারেননি।
অপেক্ষার অবসান
নুরুন্নাহার নিম্নির এভারেস্ট অভিযান একবারে সফল হয়নি।
১৭ মে তিনি প্রথম চূড়ান্ত আক্রমণ শুরু করেছিলেন। ক্যাম্প-৪ পর্যন্ত পৌঁছেও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ফিরে আসতে বাধ্য হন। এভারেস্টে এই সিদ্ধান্তই অনেক সময় জীবন বাঁচায়। কারণ পাহাড়ে জেদ দেখানোর মূল্য প্রায়ই মৃত্যু।
তারপর কয়েক দিন অপেক্ষা। আবহাওয়ার উন্নতির অপেক্ষা।
তারপর আবার যাত্রা।ক্যাম্প-২, ক্যাম্প-৩, ক্যাম্প-৪।
এরপর শুরু সেই ভয়ংকর রাত। মাথায় হেডল্যাম্প, পিঠে অক্সিজেন সিলিন্ডার, সামনে বরফের দেয়াল। চারপাশে এমন অন্ধকার, যেন পৃথিবীর সব আলো নিভে গেছে।
সারারাত মৃত্যুর অঞ্চলের মধ্য দিয়ে এগিয়ে গিয়ে অবশেষে শিখরে পৌঁছান নিম্নি।
বাংলাদেশের পর্বতারোহণ ইতিহাসে তাঁর নাম এখন স্থায়ীভাবে লেখা হয়ে গেছে।
সমুদ্র থেকে আকাশের কিনারায়
নিম্নির আগে সবচেয়ে আলোচিত বাংলাদেশি অভিযানগুলোর একটি সম্পন্ন করেন ইকরামুল হাসান শাকিল।
২০২৫ সালে তিনি কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত থেকে যাত্রা শুরু করেন।
বাংলাদেশের সর্বনিম্ন উচ্চতার অঞ্চল থেকে পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিন্দু পর্যন্ত পৌঁছানোর সেই দীর্ঘ অভিযাত্রা ছিল অসাধারণ এক সহনশীলতার পরীক্ষা।
হাজার কিলোমিটারের পথ, একাধিক দেশ, দীর্ঘ পদযাত্রা এবং শেষ পর্যন্ত এভারেস্ট।
চূড়ায় পৌঁছে তিনি শুধু একটি শৃঙ্গ জয় করেননি, বরং দেখিয়েছেন যে অভিযাত্রার সৌন্দর্য কখনো কখনো গন্তব্যের চেয়েও বড় হতে পারে।
নতুন প্রজন্মের পথপ্রদর্শক
২০২৪ সালের ১৯ মে।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর আবার এভারেস্টের চূড়ায় উড়ল বাংলাদেশের পতাকা।
সেদিন শিখরে পৌঁছান চট্টগ্রামের পর্বতারোহী বাবর আলী।
তবে এভারেস্ট তাঁর শেষ লক্ষ্য ছিল না।
চূড়া থেকে নেমে এসে তিনি বিশ্বের অন্যান্য আট-হাজারি পর্বতের দিকে মনোযোগ দেন। একের পর এক কঠিন পর্বত জয় করে বাংলাদেশের উচ্চপর্বতারোহণে নতুন যুগের সূচনা করেন।
বিশেষ করে মাকালুর মতো ভয়ংকর কঠিন শৃঙ্গ জয় করে তিনি আন্তর্জাতিক পর্বতারোহণ অঙ্গনেও আলোচনায় আসেন।
বাংলাদেশি পর্বতারোহীদের সক্ষমতা নিয়ে যেসব প্রশ্ন একসময় ছিল, বাবর আলীর সাফল্য সেগুলোর অনেকগুলোরই জবাব দিয়েছে। এখন পর্যন্ত পাঁচটি ৮ হাজার মিটারি পর্বত জয় করেছেন তিনি।
বিজয়ের সঙ্গে যখন জড়িয়ে আছে বেদনা
বাংলাদেশের এভারেস্ট ইতিহাসের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক নাম সজল খালেদ।
২০১৩ সালের ২০ মে তিনি পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গের চূড়ায় পৌঁছান।
স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল।
বাংলাদেশের পতাকা উড়েছিল পৃথিবীর ছাদে।
কিন্তু এভারেস্টের গল্প অনেক সময় চূড়ায় গিয়ে শেষ হয় না।
বরং শুরু হয় ফেরার পথ থেকে। চূড়া থেকে নামার সময় অসুস্থ হয়ে পড়েন সজল খালেদ। প্রায় ২৮ হাজার ফুট উচ্চতায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
এভারেস্ট তাঁর কাছে বিজয়ও ছিল, আবার শেষ যাত্রাও।
আজও বাংলাদেশের পর্বতারোহণ ইতিহাসের সবচেয়ে আবেগময় অধ্যায়গুলোর একটি তার নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
এক সপ্তাহে দুই ইতিহাস
২০১২ সালের মে মাস বাংলাদেশের পর্বতারোহণ ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
১৯ মে এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছান নিশাত মজুমদার। তিনি বাংলাদেশের নারী পর্বতারোহণে এক নতুন দিগন্ত খুলে দেন।
যে স্বপ্ন অনেকের কাছে অসম্ভব মনে হতো, সেটিকে বাস্তবে রূপ দেন তিনি।
কিন্তু বিস্ময় তখনও শেষ হয়নি।
মাত্র সাত দিন পর, ২৬ মে, একই শিখরে পৌঁছান ওয়াসফিয়া নাজরীন।
এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুই বাংলাদেশি নারী পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয় করেন।
এটি শুধু একটি ক্রীড়া অর্জন ছিল না, বরং সমাজে নারীর সক্ষমতা সম্পর্কে প্রচলিত বহু ধারণারও জোরালো উত্তর ছিল।
দুইবার পৃথিবীর ছাদে
বাংলাদেশের এভারেস্ট ইতিহাসে এম এ মুহিতের নাম আলাদাভাবে উচ্চারিত হয়।
২০১১ সালে প্রথমবার শিখরে ওঠেন তিনি।
তারপর আবার ২০১২ সালে ফিরে যান।
আবারও পৌঁছে যান পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিন্দুতে।
একবার নয়, দুবার।
শুধু তাই নয়, এভারেস্টের দক্ষিণ ও উত্তর—দুই ভিন্ন দিক দিয়েই তিনি শিখরে পৌঁছানোর বিরল কৃতিত্ব অর্জন করেন।
পর্বতারোহীদের কাছে এটি অসাধারণ এক অর্জন।
কারণ দুই দিকের পথ, ঝুঁকি এবং চ্যালেঞ্জ একেবারেই আলাদা।
শুরু হয়েছিল যেভাবে
২০১০ সালের ২৩ মে।সেদিন পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গে পৌঁছে বাংলাদেশের পতাকা তুলে ধরেন মুসা ইব্রাহিম।
সেই অভিযানের পর থেকেই বাংলাদেশের পর্বতারোহণ নতুন গতি পেতে শুরু করে।
এভারেস্ট আর কেবল দূরের কোনো স্বপ্ন হয়ে থাকেনি।
দেশের তরুণ অভিযাত্রীরা বিশ্বাস করতে শুরু করেন, বাংলাদেশ থেকেও পৃথিবীর ছাদে পৌঁছানো সম্ভব।
পাহাড় এখনো ডাকছে
এভারেস্টের উচ্চতা ৮ হাজার ৮৪৯ মিটারের একটু বেশি।
সংখ্যাটি শুনতে সহজ।
কিন্তু সেই উচ্চতায় পৌঁছানোর পথ সহজ নয়।
সেখানে আছে হিমবাহের গোলকধাঁধা, তুষারধস, ঝড়, অক্সিজেনের ভয়াবহ ঘাটতি এবং মৃত্যুর অবিরাম উপস্থিতি।
তবু মানুষ যায়।
বারবার যায়।
কারণ কিছু স্বপ্ন আছে, যেগুলো যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
বাংলাদেশের পর্বতারোহীরাও সেই স্বপ্নের পেছনে ছুটেছেন।
মুসা ইব্রাহিম, এম এ মুহিত, নিশাত মজুমদার, ওয়াসফিয়া নাজরীন, সজল খালেদ, বাবর আলী, ইকরামুল হাসান শাকিল এবং সর্বশেষ নুরুন্নাহার নিম্নি—প্রত্যেকে যোগ করেছেন একটি করে অধ্যায়।
তাঁদের কেউ বরফের রাজ্যে নিজের সীমা ভেঙেছেন। কেউ ইতিহাস লিখেছেন।কেউ জীবন দিয়ে গেছেন।
কিন্তু সবাই মিলে প্রমাণ করেছেন একটি কথা, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে উঁচু কোনো পর্বত না থাকলেও স্বপ্ন পৌঁছে যেতে পারে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শিখরেও।











