ঝাঁপ দিয়ে পাখি শিকার করত চার ডানার ডাইনোসর

জিয়ান চ্যাংমেনসিসের শিকারের কল্পিত দৃশ্য। ছবি: লুইস লা রোসা
আজ থেকে ঠিক বারো কোটি বছর আগের এক কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল। ঘন বনের একটা উঁচু গাছের ডালে ওত পেতে বসে আছে এক অদ্ভুত প্রাণী। দেখতে অনেকটা সিনেমার ভেলোসিরাপ্টরের মতো রাগী, কিন্তু সারা শরীর তার চিল বা ঈগলের মতো ঘন পালকে ঢাকা। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, তার শুধু দুটো ডানাই নেই, পেছনের দুটি পায়েও রয়েছে ডানার মতো লম্বা পালক।
অর্থাৎ, সে চার ডানার এক প্রাগৈতিহাসিক ‘ড্রাগন’।
লক্ষ্মীপেঁচার সমান আকৃতির এই প্রাণীটি কোনো পাখি নয়, সে আসলে এক শিকারী ডাইনোসর, বিজ্ঞানিরা যার নাম রেখেছেন ‘জিয়ান চ্যাংমেনসিস’। সে পাতার আড়ালে চোখ জোড়া স্থির করে রাখত বনের অন্য প্রান্তে উড়তে থাকা আদিম পাখিদের দিকে। সুযোগ বুঝে ডানা ঝাপটে নয়, বরং আজকের উড়ন্ত কাঠবিড়ালির মতো চার ডানা মেলে সে বাতাস কেটে গ্লাইড করে ঝাঁপিয়ে পড়ত তার শিকারের ওপর।
এই রোমাঞ্চকর দৃশ্যটি কোনো সায়েন্স ফিকশন গল্পের অংশ নয়, বরং আমাদের পৃথিবীর বুকেই ঘটে যাওয়া কোটি বছর আগের বাস্তব ঘটনা। সম্প্রতি উত্তর-পশ্চিম চীনের গানসু প্রদেশের এক প্রাচীন হ্রদ এলাকা থেকে একদল আন্তর্জাতিক গবেষক এই নতুন প্রজাতির ডাইনোসরের ফসিল বা জীবাশ্ম আবিষ্কার করেছেন।
গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরেই ওই এলাকায় প্রাগৈতিহাসিক পাখিদের ভাঙা হাড়ের অদ্ভুত সব দলা খুঁজে পাচ্ছিলেন। পেঁচা বা শিকারী পাখিরা যেভাবে শিকার হজম করার পর অপাচ্য হাড় ও পালক মুখ দিয়ে দলা আকারে উগরে দেয়, চ্যাংমা বেসিনের এই হাড়গুলো ছিল ঠিক তেমনই।
বিজ্ঞানীদের মনে খটকা ছিল, কোটি কোটি বছর আগে পাখিদের আকাশে ওড়ার শুরুর দিনগুলোতে তাদের এভাবে শিকার করত কে? জিয়ান চ্যাংমেনসিসের এই ফসিলটি আবিষ্কারের পর সেই রহস্যের জট খুলে গেল।
এই আবিষ্কারটি জীববিজ্ঞানের ইতিহাসের এক দারুণ মোড়। আমরা জানি, ডাইনোসরদের একটা অংশ বিবর্তিত হয়ে আজকের পাখি হয়েছে। কিন্তু এই নতুন ডাইনোসরটি আমাদের জানাচ্ছে যে, পাখিরা যখন সবেমাত্র ডানা ঝাপটে আকাশে ওড়ার বিদ্যা রপ্ত করছিল, ঠিক তখনই প্রকৃতির নিয়মে তাদেরই এক কাজিন বা ডাইনোসর আত্মীয় বাতাসে ভেসে ভেসে তাদেরই শিকার করার নিখুঁত কৌশল তৈরি করে ফেলেছিল।
চার ডানার এই খুনে ডাইনোসরটি হয়তো আজকের পাখিদের মতো আকাশে ডানা ঝাপটে ডিগবাজি খেতে পারত না, কিন্তু গাছ থেকে গাছে নিঃশব্দে ভেসে যাওয়ার বিদ্যায় সে ছিল ওস্তাদ।
এ সংক্রান্ত গবেষণাপত্রটি অ্যানালাস অফ কার্নেগি মিউজিয়াম- জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।




