চীনের মহাকাশ স্টেশনে সবচেয়ে কম তাপমাত্রার রেকর্ড

বিজ্ঞানের জগতে তৈরি হলো নতুন এক রেকর্ড। এবার পরমাণুকে এমন এক তাপমাত্রায় ঠান্ডা করেছেন বিজ্ঞানীরা, যা পরম শূন্য তাপমাত্রার প্রায় কাছাকাছি। তাপমাত্রাটি মাত্র ১০ পিকোকেলভিন (১০ ট্রিলিয়ন ভাগের এক ভাগ কেলভিন)। এত কম তাপমাত্রায় আগে কখনো কোনো পরমাণুর দলকে ঠান্ডা করা সম্ভব হয়নি।
সায়েন্স নিউজের প্রতিবেদন বলছে, এই অর্জনের পেছনে রয়েছে মহাকাশে পরিচালিত একটি বিশেষ পরীক্ষা। চীনের তিয়াংগং মহাকাশ স্টেশনে ভেসে বেড়ানো প্রায় ২০ হাজার রুবিডিয়াম পরমাণুকে বিশেষ লেজার প্রযুক্তির সাহায্যে আটকে রেখে ধীরে ধীরে ঠান্ডা করা হয়।
গবেষণার ফলাফল ৫ নভেম্বর বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী সায়েন্স-এ প্রকাশিত হয়েছে।
পরম শূন্য তাপমাত্রা কত?
তাপমাত্রার সর্বনিম্ন তাত্ত্বিক সীমাকে বলা হয় পরম শূন্য। কেলভিন স্কেলে এর মান শূন্য কেলভিন, আর সেলসিয়াস স্কেলে মাইনাস ২৭৩ দশমিক ১৫ ডিগ্রি। এই তাপমাত্রার যত কাছাকাছি যাওয়া যায়, পদার্থের পরমাণু ও অণুর গতিশীলতা তত কমে আসে।
বিজ্ঞানীরা পরমাণুর এই গতি কমিয়ে খুব নিম্ন তাপমাত্রা তৈরি করেন। তবে অতি শীতল পরমাণুর ক্ষেত্রে তাপমাত্রা নির্ধারণের একটি বিশেষ পদ্ধতি রয়েছে। পরমাণুগুলোকে ছড়িয়ে পড়তে দিলে তারা কত ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করে তাদের কার্যকর তাপমাত্রা নির্ণয় করা যায়।
কেন মহাকাশে এই পরীক্ষা?
পৃথিবীতে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে পরমাণুর মেঘ নিচের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এতে পরমাণুগুলোকে আটকে রাখা এবং আরও ঠান্ডা করার প্রক্রিয়া কঠিন হয়ে যায়।
কিন্তু মহাকাশে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করার সময় তিয়াংগং মহাকাশ স্টেশনে থাকা পরমাণুগুলো মাইক্রোগ্র্যাভিটি বা প্রায় ওজনহীন পরিবেশে থাকে। ফলে সেখানে পরমাণুগুলোকে দীর্ঘ সময় ধরে নিয়ন্ত্রণ ও শীতল করার সুযোগ পাওয়া যায়।
এই সুবিধা কাজে লাগিয়েই বিজ্ঞানীরা প্রায় ২০ হাজার রুবিডিয়াম পরমাণুকে লেজারভিত্তিক বিশেষ ফাঁদে আটকে তাদের গতি কমিয়ে রেকর্ড পরিমাণ ঠান্ডা করতে সক্ষম হন।
তৈরি করা হয়েছে বিশেষ কোয়ান্টাম অবস্থা
এত কম তাপমাত্রায় পরমাণুগুলো শুধু ঠান্ডাই হয় না, বরং তাদের মধ্যে তৈরি হতে পারে পদার্থের এক বিশেষ কোয়ান্টাম অবস্থা, যার নাম বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট (বিইসি)।
সাধারণ অবস্থায় পরমাণুগুলো আলাদাভাবে ও বিশৃঙ্খলভাবে চলাচল করে। কিন্তু অত্যন্ত কম তাপমাত্রায় পৌঁছালে অনেক পরমাণু একই কোয়ান্টাম অবস্থায় চলে আসে। তখন তারা সম্মিলিতভাবে একটি একক সত্তার মতো আচরণ করে। এটিই বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট।
এই বিশেষ অবস্থা নিয়ে গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা পদার্থের অজানা বৈশিষ্ট্য, জটিল কোয়ান্টাম ঘটনা এবং মৌলিক পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন রহস্য সম্পর্কে জানতে পারেন।
এ ছাড়া, এই ধরনের পরীক্ষা দিয়ে পদার্থবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারণা—সমতুল্যতা নীতি—পরীক্ষা করার সুযোগ তৈরি হয়। এই নীতি অনুযায়ী, শূন্যস্থানে ভিন্ন ভরের বস্তু একই হারে নিচে পড়ে।
আগের রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেল নতুন অর্জন
মহাকাশে অতি শীতল পরমাণু নিয়ে এর আগেও পরীক্ষা চালানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) বিজ্ঞানীরা বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট তৈরি করে তাপমাত্রা ৫২ পিকোকেলভিন পর্যন্ত নামাতে সক্ষম হয়েছিলেন।
অন্যদিকে, পৃথিবীতে একটি বিশেষ ড্রপ টাওয়ারে পরমাণুকে নিচে ফেলে মুক্তপতনের মাধ্যমে ওজনহীন পরিবেশ তৈরি করে ৩৮ পিকোকেলভিন তাপমাত্রায় পৌঁছানো সম্ভব হয়েছিল।
তবে ড্রপ টাওয়ারে মুক্তপতনের সময় খুবই সীমিত। ফলে সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে পরীক্ষা চালানো কঠিন। কিন্তু পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা মহাকাশ স্টেশনে এ ধরনের পরীক্ষার জন্য তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি সময় পাওয়া যায়।
নতুন এই গবেষণা তাই শুধু তাপমাত্রার রেকর্ড গড়ার ঘটনা নয়; বরং মহাকাশে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণার নতুন সম্ভাবনাও তৈরি করেছে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে মহাকাশে আরও দীর্ঘ সময় ধরে অতি শীতল পরমাণু নিয়ে পরীক্ষা চালিয়ে পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে।



