কৃত্রিম সূর্য কাটবে রাতের আঁধার

গরমের লোডশেডিং থেকে বৈশ্বিক রাজনৈতিক বিরোধ, যুদ্ধ, সংঘাত থামিয়ে দিতে পারে ফিউশন প্রযুক্তি। লিখেছেন সায়েম মাহমুদ সিয়াম
গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে যখন হঠাৎ উধাও হয়ে যায় বিদ্যুৎ, তখন রাজধানী ঢাকার বহুতল অট্টালিকা কিংবা দেশের প্রান্তিক গাঁয়ের কোনো বাড়ির দৃশ্যপট প্রায় একই। এলএনজি, জ্বালানি তেল ও কয়লার সংকটে লোডশেডিং এখন আমাদের বড় সমস্যা।
কিন্তু এ সংকট কি শুধু বাংলাদেশের? মোটেও না। এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতি থেকে শুরু করে ইউরোপ-আমেরিকার উন্নত দেশগুলোও আজ একই সংকটে। একদিকে বিশ্ব জুড়ে বিদ্যুতের চাহিদার অভূতপূর্ব বৃদ্ধি, অন্যদিকে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ থাবা। জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে কার্বন নিঃসরণের যে ক্ষতিকর প্রভাব পৃথিবী সইছে, তা মানবজাতির টিকে থাকার ওপরই বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। পৃথিবীর প্রতিটি দেশ তাই মরিয়া হয়ে খুঁজছে এমন এক শক্তির উৎস; যা হবে অসীম, সম্পূর্ণ পরিচ্ছন্ন, কার্বনমুক্ত এবং নিরবচ্ছিন্ন।
এমন পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের স্থায়ী সমাধান হিসেবে বিজ্ঞানবিশ্বকে এক বৈপ্লবিক স্বপ্নের কথা বলছে যার নাম ‘নিউক্লিয়ার ফিউশন এনার্জি’। সহজ কথায়, কৃত্রিম উপায়ে পৃথিবীর বুকে ছোট্ট এক টুকরো ‘সূর্য’ তৈরি করার প্রযুক্তি।
বিজ্ঞানকে মানুষের চোখে খুব জটিল বলে মনে হলেও ফিউশনের মূল নীতি অত্যন্ত প্রাকৃতিক। আকাশের যে সূর্য আমাদের প্রতিদিন আলো ও উত্তাপ দেয়, সেটির অভ্যন্তরে যে শক্তি তৈরি হয় ঠিক সেই একই কৌশলকে গবেষণাগারে রূপ দেওয়ার নামই ‘নিউক্লিয়ার ফিউশন’।
পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের মতো আমরা প্রচলিত যে, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে পরিচিত সেটি চলে ‘ফিশন’ পদ্ধতিতে। ফিশন প্রক্রিয়ায় ইউরেনিয়ামের মতো ভারী কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে ভেঙে দুটি হালকা পরমাণুতে পরিণত করা হয় এবং এতে প্রচুর শক্তি নির্গত হয়। কিন্তু ফিশনের বেশ কয়েকটি বড় বড় অসুবিধাও আছে। এর থেকে মারাত্মক ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয় বর্জ্য তৈরি হয়, যা হাজার হাজার বছর ধরে প্রকৃতির জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে থাকে। তা ছাড়া চেরনোবিল বা ফুকুশিমার মতো দুর্ঘটনাকবলিত ‘মেল্টডাউন’-এর মারাত্মক ঝুঁকি তো রয়েছেই।
‘ফিউশন’ ঠিক এর উল্টো কাজ করে। এখানে দুটি হালকা পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে চরম তাপ ও চাপে ‘একত্রিত বা জোড়া’ লাগিয়ে একটি অপেক্ষাকৃত ভারী নিউক্লিয়াস তৈরি করা হয়। ফিউশন বিক্রিয়ায় সাধারণত হাইড্রোজেনের দুটি আইসোটোপ ‘ডিউটেরিয়াম ও ট্রিটিয়াম’ ব্যবহার করা হয়। এ দুটি পরমাণু যখন পরস্পরের সঙ্গে অতি উচ্চগতিতে ধাক্কা খেয়ে ফিউজ বা একত্রিত হয়, তখন তৈরি হয় একটি হিলিয়াম পরমাণু, একটি মুক্ত নিউট্রন এবং এক অসীম শক্তি।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়, মাত্র ১ গ্রাম ফিউশন জ্বালানি থেকে যে শক্তি পাওয়া সম্ভব, তা প্রায় ৮ টন কয়লা বা ১১ হাজার লিটার তেল পোড়ানোর সমান। সবচেয়ে বড় কথা, এতে কোনো গ্রিনহাউজ গ্যাস বা কার্বন ডাইঅক্সাইড তৈরি হয় না এবং দীর্ঘমেয়াদি তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের কোনো অস্তিত্ব থাকে না।
যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ডশায়ারে অবস্থিত ‘জয়েন্ট ইউরোপিয়ান টোরাস’ রিঅ্যাক্টরে ১৯৯৭ সালে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফিউশন শক্তি উৎপন্ন করা সম্ভব হয়। ডিউটেরিয়াম-ট্রিটিয়াম জ্বালানি ব্যবহার করে গবেষণাগারে ১৬ দশমিক ১ মেগাওয়াট শক্তি তৈরি করে ইউরোপীয় বিজ্ঞানীরা। এ সাফল্যের মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছেন, ফিউশন শুধু মানুষের তৈরি কাগজে-কলমে কিংবা তত্ত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটিকে বাস্তবেও রূপ দেওয়া সম্ভব।
বিজ্ঞানীদের সামনে তখন নতুন এক প্রশ্ন ও বাধা এসে দাঁড়ায়। কীভাবে এমন এক প্রযুক্তিতে পৌঁছানো যাবে, যেখানে প্রক্রিয়াটি চালু রাখতে যে শক্তি দিতে হয়, উৎপন্ন শক্তির পরিমাণ তার চেয়েও অনেক অনেক বেশি হবে?
সেই অধরা স্বপ্নের উত্তর মেলার পথ তৈরি হতে শুরু করেছে একুশ শতকে এসে।
ফিউশন এনার্জি নিয়ে দশকের পর দশক গবেষণা করলেও বিজ্ঞানীরা একটি বড় ধাঁধায় আটকে ছিলেন অনেক দিন। ফিউশন ঘটাতে হাইড্রোজেন গ্যাসকে প্রায় ১৫ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করতে হয়, যা সূর্যের কেন্দ্রের চেয়েও প্রায় ১০ গুণ বেশি উত্তপ্ত। কিন্তু এই চরম উত্তপ্ত অবস্থা তৈরি ও ধরে রাখতে রিঅ্যাক্টরে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ শক্তি প্রদান করতে হতো, উৎপন্ন ফিউশন শক্তি ছিল তার চেয়ে কম। গবেষণা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় কিউ ফ্যাক্টর, তথা ইনপুট ও আউটপুটের অনুপাত।
ফিউশন গবেষণার মূল লক্ষ্যই ছিল ‘কিউ > ১’ অর্জন করা। অর্থাৎ যে শক্তি দেওয়া হবে, তার চেয়ে বেশি শক্তি বের করে আনা। যাকে বলা হয় ‘নেট এনার্জি গেইন’ বা ‘ইগনিশন’।
অবশেষে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির ন্যাশনাল ইগনিশন ফ্যাসিলিটির গবেষকরা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ‘নিট এনার্জি গেইন’ অর্জন করে ইতিহাস রচনা করেন। ১৯২টি অতি-শক্তিশালী লেজার রশ্মি দিয়ে মরিচের দানার আকারের একটি ক্ষুদ্র ডিউটেরিয়াম-ট্রিটিয়াম ক্যাপসুলে আঘাত করা হয়। এতে মাত্র কয়েক ন্যানোসেকেন্ডের জন্য তৈরি হয় চরম চাপ ও তাপমাত্রা। এ গবেষণায় ২ দশমিক ০৫ মেগাজুল শক্তি প্রয়োগ করে আউটপুট হিসেবে পাওয়া যায় ৩ দশমিক ১৫ মেগাজুল শক্তি। অর্থাৎ গবেষকদের ইনপুটের চেয়ে প্রায় ১৫৪ শতাংশ বেশি শক্তি তৈরি হয়।
প্রথম সাফল্য কি শুধুই কাকতালীয় ছিল? সেই সন্দেহ দূর করতে ২০২৩ সালের ৩০ জুলাই এনআইএফের গবেষকরা আবারও একই পরীক্ষার পুনরাবৃত্তি করেছেন। ২ দশমিক ০৫ মেগাজুল ইনপুট দিয়ে এবার আউটপুট হিসেবে পাওয়া যায় ৩ দশমিক ৮৮ মেগাজুল ফিউশন এনার্জি।
মাত্র ১ গ্রাম ফিউশন জ্বালানি থেকে যে শক্তি পাওয়া সম্ভব, তা প্রায় ৮ টন কয়লা বা ১১ হাজার লিটার তেল পোড়ানোর সমান
লেজার ফিউশন ছাড়া ম্যাগনেটিক কনফাইনমেন্ট বা টোকামাক রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তিতেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক রেকর্ড ভেঙেছে।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাজ্যের ‘জয়েন্ট ইউরোপিয়ান টোরাস’ তাদের প্রায় চার দশকের গবেষণায় এক ঐতিহাসিক রেকর্ড তৈরি করে। তাদের শেষ পরীক্ষায় মাত্র শূন্য দশমিক ২ গ্রাম ডিউটেরিয়াম ও ট্রিটিয়াম জ্বালানি ব্যবহার করে তারা ৫ সেকেন্ডে ৬৯ মেগাজুল শক্তি উৎপন্ন করে।
কোরিয়ান সুপারকন্ডাক্টিং টোকামাক অ্যাডভান্সড রিসার্চকে কোরিয়ার ‘আর্টিফিশিয়াল সান’ বা কৃত্রিম সূর্য বলা হচ্ছে। ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে তারা ১০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াসের অতি উত্তপ্ত প্লাজমাকে টানা ৪৮ সেকেন্ড ধরে রাখার বিশ্বরেকর্ড করেন। এর আগে ২০১৮ সালে এটি তারা ধরে রাখতে পেরেছিলেন মাত্র ১.৫ সেকেন্ডের জন্য। ২০২৬ সালের মধ্যে এ সময়সীমাকে ৩০০ সেকেন্ডে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে তারা।
ফ্রান্সের ক্যাডারাচে অবস্থিত আন্তর্জাতিক থার্মোনিউক্লিয়ার এক্সপেরিমেন্টাল রিঅ্যাক্টর (আইটিইআর) হলো মানব ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল ও ব্যয়বহুল মেগা-প্রজেক্টগুলোর একটি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ভারত, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়াসহ ৩০টিরও বেশি দেশ যৌথভাবে রিঅ্যাক্টরটি নির্মাণ করার লক্ষ্যে নেমেছে। এ বিশাল আকারের ‘টোকামাক’ রিঅ্যাক্টরের ওজন প্রায় ২৩ হাজার টন। এর মূল লক্ষ্য ৫০ মেগাওয়াট ইনপুট দিয়ে ৫০০ মেগাওয়াট অর্থাৎ ১০ গুণ ফিউশন শক্তি উৎপন্ন করে এর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কার্যকারিতা বিশ্বকে দেখানো।
এ প্রকল্পের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো হুয়ানলিউ-৩ বা এইচএল-৩ নামক পারমাণবিক ফিউশন চুল্লি, যা সাধারণভাবে কৃত্রিম সূর্য নামে পরিচিত। এটি নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক ফিউশন ঘটানোর একটি বৃহৎ মাপের বৈজ্ঞানিক যন্ত্র। এইচএল-৩ এরই মধ্যে ১২০ মিলিয়ন ডিগ্রি আয়ন তাপমাত্রা এবং ১৬০ মিলিয়ন ডিগ্রি ইলেকট্রন তাপমাত্রা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
পৃথিবীর অধিকাংশ যুদ্ধ, অর্থনৈতিক টানাপড়েন ও ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াই আবর্তিত হয়েছে শক্তি বা জ্বালানিকে কেন্দ্র করে। বিংশ ও একাবিংশ শতাব্দীতে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ব রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হয়েছে খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদের ওপর ভিত্তি করে। রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হলে হিমশিম খায় ইউরোপ আর হরমুজ প্রণালি অচল হলে বিশ্ব জুড়ে লাফিয়ে বাড়ে তেলের দাম। কিন্তু নিউক্লিয়ার ফিউশন এনার্জির সূচনার সঙ্গে সঙ্গে এ বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য চিরতরে বদলে যাবে।
ফিউশন প্রযুক্তির প্রধান কাঁচামাল যেহেতু হাইড্রোজেন আইসোটোপ যা সমুদ্রের পানি থেকে অনায়াসে পাওয়া সম্ভব এবং লিথিয়াম, তাই শক্তির জন্য আর নির্দিষ্ট কোনো দেশ বা মধ্যপ্রাচ্যের তেল ক্ষেত্রের ওপর নির্ভর করে থাকতে হবে না। যে দেশের হাতে ফিউশন প্রযুক্তি ও রিঅ্যাক্টর পরিচালনা করার মতো সক্ষমতা থাকবে, সেই দেশই হবে শক্তির দিক থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাই ফিউশন এনার্জি হয়তো আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তেল-গ্যাস নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ি ও ভূরাজনৈতিক ব্ল্যাকমেইলের ইতি টানবে। উন্মোচিত হবে কার্বনমুক্ত এক নতুন সবুজ পৃথিবীর।






