পরমাণুর কেন্দ্রে ‘বোলিং পিন’!

আমরা যাকে সুষম গোলক ভেবে এসেছি, সেই নিউক্লিয়াসের গঠন এবার নিয়ন গ্যাসের পরমাণুর ভেতরে দেখা গেল বোলিং পিনের মতো। দীর্ঘদিনের ধারণা বদলে দিতে পারে এ নতুন আবিষ্কার। বিস্তারিত লিখেছেন আখলাকুজ্জামান অনিক
আমাদের চারপাশের দৃশ্যমান সব বস্তু তৈরি হয়েছে অতিক্ষুদ্র পরমাণু দিয়ে। আর প্রতিটি পরমাণুর একেবারে কেন্দ্রে থাকে তার নিউক্লিয়াস। এই নিউক্লিয়াস গঠিত হয় প্রোটন ও নিউট্রন নামে দুটি অতি সূক্ষ্ম কণা দিয়ে, যেখানে পরমাণুর প্রায় সব ওজন বা ভর জমা থাকে। যুগ যুগ ধরে বিজ্ঞানীরা পরমাণুর পরিচয় দিতে গিয়ে নিউক্লিয়াসকে একটি নিরেট গোল মার্বেল বা গোলকের মতো কল্পনা করে এসেছেন।
কিন্তু সার্নের লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা পরমাণুর নিউক্লিয়াস সম্পর্কে আমাদের ধারণায় এক বড় পরিবর্তন এনেছেন। সায়েন্স অ্যালার্টের প্রতিবেদন বলছে, এতদিন বিজ্ঞানীরা পরমাণুর কেন্দ্র বা নিউক্লিয়াসকে নিখুঁত গোলক মনে করতেন। কিন্তু সাম্প্রতিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, কিছু পরমাণুর নিউক্লিয়াস আদতে গোলাকার নয়; বরং খেলাধুলায় ব্যবহৃত বোলিং পিনের মতো লম্বাটে ও অসম। ইউরোপিয়ান অর্গানাইজেশন ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ বা সার্নের বিজ্ঞানীরা নিষ্ক্রিয় গ্যাস নিয়নের নিউক্লিয়াসের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে এই তথ্য প্রকাশ করেছেন।
দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা পরমাণুর কেন্দ্রকে মার্বেলের মতো গোলক বলে ভেবে এসেছেন। এতদিন এর আসল আকৃতি ধরা না পড়ার কারণ হলো নিউক্লিয়াসের অতিদ্রুত গতিশীল স্বভাব। নিউক্লিয়াস কোনো স্থির বস্তু নয়, এটি অত্যন্ত তীব্র গতিতে সব দিকে কাঁপতে থাকে। ঠিক যেমন খুব দ্রুত ঘুমানো সিলিং ফ্যানের আলাদা পাখা দেখা যায় না, শুধু একটি গোল চাকতি মনে হয়, তেমনি বাইরে থেকে নিউক্লিয়াসকেও গোল মনে হতো।
এই রহস্য ভেদ করতে বিজ্ঞানীরা দুটি পরমাণুকে আলোর কাছাকাছি গতিতে ছুড়ে দিয়ে মুখোমুখি প্রচণ্ড সংঘর্ষ ঘটান। পরীক্ষার জন্য তারা অক্সিজেন ও নিয়নের মতো দুটি গ্যাসীয় মৌল বেছে নেন। সংঘর্ষের সময়টি ছিল এক সেকেন্ডের কোটি ভাগের এক ভাগের চেয়েও কম। এত অল্প সময়ে সংঘর্ষ ঘটায় পরমাণুর ভেতরের কণাগুলো অবস্থান বদলানোর সুযোগ পায়নি। ফলে ঠিক ভাঙার আগের মুহূর্তে নিউক্লিয়াসের আসল রূপ বিজ্ঞানীদের যন্ত্রে ধরা পড়ে।
নিয়নের নিউক্লিয়াস যে বোলিং পিনের মতো, তা নিশ্চিত করতে বিজ্ঞানীরা কণার ছড়িয়ে পড়ার নকশা বিশ্লেষণ করেন। ঘোলা পানির নিচে ঢাকা পাথরে স্রোত লাগলে যেমন ঢেউ দেখে পাথরের আকৃতি বোঝা যায়, তেমনি সংঘর্ষের পর ছড়িয়ে পড়া কণার গতিপথ দেখে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, নিয়নের নিউক্লিয়াসটি লম্বাটে ছিল। যদিও তাত্ত্বিক হিসাবের সঙ্গে সামান্য কিছু অমিল পাওয়া গেছে, তবু এই পরীক্ষা প্রমাণ করেছে যে কণার জ্যামিতিক নকশাও বিস্ফোরণের পর নিজের ছাপ রেখে যায়।
পরমাণুর ভেতরের এই অদ্ভুত আকৃতি আবিষ্কারের ফলে বিজ্ঞানজগৎ অনেক উপকৃত হবে। এর মাধ্যমে মহাবিশ্ব সৃষ্টির শুরুর মুহূর্তের পরিবেশ এবং প্রোটন ও নিউট্রনকে বেঁধে রাখা সবল নিউক্লীয় বল সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। তা ছাড়া এটি প্রমাণ করেছে যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কণা সংঘর্ষক যন্ত্র কেবল পরমাণু ভাঙতেই নয়, অতিক্ষুদ্র কণার নিখুঁত আকার মাপতেও সক্ষম। প্রকৃতির ভেতরের এই লুকানো রূপ আমাদের দেখায় যে আমাদের মহাবিশ্ব কতটা বৈচিত্র্যময়।






