পনেরো মিনিটে সরে যায় পুরো জাপান, এও সম্ভব!

জাপানে ২০১১ সালে ভূমিকম্পের পরে হওয়া সুনামি। ছবি: সংগৃহীত
২০১১ সালের ১১ মার্চ। জাপানের স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ৪৬ মিনিট। আচমকাই দেশটির উত্তর-পূর্ব উপকূলের কাছে আঘাত হানে ৯ মাত্রার এক শক্তিশালী ভূমিকম্প।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই তৈরি হয় বিশাল সুনামি। শুরু হয় ফুকুশিমা পারমাণবিক বিপর্যয়। প্রায় ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু ও নিখোঁজ হওয়ার সেই ঘটনা আজও জাপানের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগগুলোর একটি হিসেবে স্মরণ করা হয়।
কিন্তু সেই ভূমিকম্পের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল আরেকটি রহস্য, যা বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছেন ১৫ বছর পর।
ভূমিকম্প শুরু হওয়ার প্রায় ১৫ মিনিট পরে জাপানের প্রায় পুরো ভূখণ্ড একসঙ্গে সামান্য পূর্বদিকে সরে গিয়েছিল। পরিমাণটা ছিল খুবই ছোট- মাত্র ৫ থেকে ৬ মিলিমিটার। এতটাই সামান্য যে তখন অনেকেই এটিকে জিপিএস যন্ত্রের ত্রুটি বা তথ্যগত ভুল বলে মনে করেছিলেন।
তবে শিকাগো ইউনিভার্সিটির ভূ-পদার্থবিজ্ঞানী সানইয়ং পার্ক বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন। তার মনে হয়েছিল, এই সংকেতের পেছনে নিশ্চয়ই কোনো বাস্তব কারণ রয়েছে। এরপর তিনি ও তার সহকর্মীরা বছরের পর বছর ধরে জিপিএস এবং ভূকম্পীয় তথ্য বিশ্লেষণ করেন। শেষ পর্যন্ত তারা এমন একটি ঘটনার সন্ধান পান, যা আগে কখনও দেখা যায়নি।
গবেষকদের ভাষায়, সবচেয়ে অবাক করার বিষয় ছিল, জাপানের বিশাল একটি এলাকা একই সময়ে প্রায় একইভাবে নড়ে উঠেছিল। উত্তরের হোক্কাইডো থেকে দক্ষিণের কিউশু পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার এলাকায় এই পরিবর্তন দেখা যায়। অথচ এটি মূল ভূমিকম্পের সময় ঘটেনি, আবার কোনো বড় আফটারশকের সঙ্গেও এর সম্পর্ক ছিল না।
তাহলে কী ঘটেছিল?
গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ভূমিকম্পের সময় তৈরি হওয়া কিছু শক্তিশালী ভূকম্পীয় তরঙ্গ পৃথিবীর গভীরে ছুটে গিয়েছিল। সেগুলো পৃথিবীর কেন্দ্রের বাইরের অংশে পৌঁছে আবার ফিরে আসে। পৃথিবীর গভীরে এই যাতায়াত শেষ করে যখন তরঙ্গগুলো ভূত্বকে ফিরে আঘাত করে, তখন জাপানের বিভিন্ন টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে একযোগে নড়াচড়া শুরু হয়।
বিজ্ঞানীরা আগে থেকেই জানতেন যে বড় ভূমিকম্পের তরঙ্গ পৃথিবীর গভীরে যেতে পারে এবং কেন্দ্রের বাইরের স্তর থেকে প্রতিফলিত হতে পারে। কিন্তু এতদিন ধারণা ছিল, ফিরে আসার আগেই সেই শক্তি অনেকটাই হারিয়ে যায়। ফলে ভূ-পৃষ্ঠে তার তেমন কোনো প্রভাব পড়ে না। নতুন গবেষণা বলছে, অন্তত ২০১১ সালের জাপানের ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে তা ঘটেনি।
সানইয়ং পার্কের মতে, পৃথিবীর গভীর থেকে ফিরে আসা কোনো ভূকম্পীয় তরঙ্গ এত বড় এলাকাজুড়ে একসঙ্গে নড়াচড়া ঘটাতে পারে—এমন প্রমাণ এই প্রথম পাওয়া গেল।
সাধারণত বড় ভূমিকম্পে মাটি ফেটে যায়, জমি সরে যায় বা নির্দিষ্ট এলাকার ভূত্বকে পরিবর্তন দেখা যায়। ২০১১ সালের সেই ভূমিকম্পেও জাপানের নিচে থাকা দুটি টেকটোনিক প্লেট প্রায় ১০ মিটার সরে গিয়েছিল। এর ফলে জাপানের প্রধান দ্বীপ হোনশুও প্রায় ২০ সেন্টিমিটার পূর্বদিকে সরে যায়।
কিন্তু নতুন গবেষণায় যে স্থানচ্যুতির কথা উঠে এসেছে, তা ছিল ভিন্ন ধরনের। এটি মাত্র কয়েক মিলিমিটারের হলেও এর বিস্তৃতি ছিল বিশাল। গবেষকদের মতে, এত বড় এলাকাজুড়ে একযোগে ঘটে যাওয়া এমন ঘটনা আগে কখনও রেকর্ড করা হয়নি। এমনকি এতে যে শক্তি মুক্তি পেয়েছিল, তা আনুমানিক ৭ দশমিক ৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্পের সমান।
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই আবিষ্কার ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ আফটারশকের মতো নয়, পৃথিবীর কেন্দ্র পর্যন্ত গিয়ে ফিরে আসা এই তরঙ্গের যাত্রাপথ কিছুটা হলেও হিসাব করা সম্ভব। পৃথিবীর গভীরে গিয়ে আবার ফিরে আসতে এসব তরঙ্গের প্রায় ১৫ মিনিট সময় লাগে। ফলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার ঝুঁকি সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তবে গবেষকরা বলছেন, এই ঘটনাকে সাধারণ ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্পের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা ঠিক হবে না। কারণ এর শক্তি বিশাল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ফলে এটি একই মাত্রার সাধারণ ভূমিকম্পের মতো তীব্র ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করেনি।
গবেষণায় দেখা গেছে, ওই সময় প্রশান্ত মহাসাগরীয়, ওখোৎস্ক, ফিলিপাইন সাগর ও ইউরেশীয় প্লেটের বিভিন্ন সংযোগস্থল এই নড়াচড়ার প্রভাব অনুভব করেছিল। বিজ্ঞানীদের ধারণা, মূল ভূমিকম্পের প্রবল কম্পন এসব ফল্টকে আগে থেকেই অস্থিতিশীল করে তুলেছিল। পরে পৃথিবীর গভীর থেকে ফিরে আসা তরঙ্গ সেই ফল্টগুলোকে আবার সক্রিয় করে।
মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটির ভূবিজ্ঞানী ভেদরান লেকিচ মনে করেন, জাপানের অত্যাধুনিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার কারণেই এই ঘটনা ধরা পড়েছে। পৃথিবীর অন্য কোথাও হয়তো এমন ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি না থাকায় তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
গবেষকরা আরও কয়েকটি সম্ভাবনা খতিয়ে দেখেছিলেন। যেমন সমুদ্রের নিচে ভূমিধস। কিন্তু এমন ঘটনার প্রভাব সাধারণত নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে। তাই তা জাপানজুড়ে একই ধরনের স্থানচ্যুতির ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।
ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির ভূ-পদার্থবিজ্ঞানী আমান্ডা থমাসের মতে, এই গবেষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। বড় ভূমিকম্পের প্রভাব মূল কম্পন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হয়ে যায় না। বরং পৃথিবীর গভীর থেকে ফিরে আসা তরঙ্গও অনেক পরে এসে নতুন নড়াচড়া সৃষ্টি করতে পারে।
তার কথায়, পৃথিবীর ফল্ট বা ভাঙনরেখাগুলো ঠিক কীভাবে কাজ করে, সে সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা এখনো সবকিছু জানেন না। তবে এই নতুন আবিষ্কার সেই জটিল রহস্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র এনে দিল।




