মুসলিম জোটের প্রস্তাব ইরানের
- স্বাগত জানাল পাকিস্তান

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ইসলামি বিশ্বের ঐক্য ও সংহতি জোরদারের লক্ষ্যে শক্তিশালী মুসলিম দেশগুলো নিয়ে একটি নিরাপত্তা জোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। গত মঙ্গলবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দেশটির সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিনি এ আহ্বান জানান। এর আগে সোমবার ইরানের তত্ত্বাবধায়ক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মজিদ ইবনুররেজা এক টেলিফোন আলাপে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফকে একই প্রস্তাব দেন। আসিফ এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাসনিম নিউজ, পার্স টুডে, ডন, সিএনএন।
এক দিনের সফরে মঙ্গলবার সকালের দিকে রাওয়ালপিন্ডির নূর খান বিমানবন্দরে পৌঁছালে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানকে স্বাগত জানান পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি, প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি, পিপিপি চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি, ইসলামাবাদে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোগাদ্দামসহ অন্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। এ ছাড়া ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও ওমান থেকে এসে নিজেদের প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানান।
আসিম মুনিরের সঙ্গে বৈঠকে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা ও সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন ইরানের প্রেসিডেন্ট। তিনি বললেন, অভিন্ন স্বার্থ রক্ষা এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় মুসলিম দেশগুলোর একযোগে কার্যকর ভূমিকা রাখা উচিত। একই সঙ্গে আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং বিভিন্ন সংকট নিরসনে পাকিস্তান সরকার, দেশটির জনগণ ও সামরিক নেতৃত্বের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি।
ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে মাসুদ পেজেশকিয়ান আরও জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসনের মুখে ইরানের সরকার, জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনী ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলে প্রতিপক্ষের লক্ষ্য ব্যর্থ করে দিয়েছে। তিনি তেহরান ও ইসলামাবাদের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও বিস্তৃতির আশা প্রকাশ করেন। মুসলিম বিশ্বের বিপুল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানবসম্পদকে কাজে লাগিয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
ইরানের প্রেসিডেন্টের এই প্রস্তাব ও সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাবের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন আসিম মুনির। ইসলামি বিশ্বের শান্তি, সহযোগিতা ও ঐক্য বজায় রাখাকে সময়ের দাবি উল্লেখ করে তিনি বললেন, কোনো মুসলিম দেশকে সংকটের মুখে বা দুর্ভোগে ফেলে রাখা উচিত নয়। পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই ইসলামি বিশ্বের বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা সম্ভব।
ইরান ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর আলোচনা: সোমবার খাজা অাসিফকে প্রধান কয়েকটি মুসলিম দেশকে নিয়ে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো তৈরির প্রস্তাব দেন জেনারেল মজিদ। তার যুক্তি, ইসরায়েলি আগ্রাসন মোকাবিলা ও অঞ্চল জুড়ে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা অপরিহার্য।
ইবনুররেজা আঞ্চলিক ঘটনাবলিতে পাকিস্তানের অবস্থানের প্রশংসা করেছেন। বিশেষ করে ইরানের ওপর হামলার নিন্দা এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার বৈঠকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে তেহরানের প্রতি সমর্থনের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বললেন, কঠিন সময়ে মিত্র দেশগুলোর দেখানো সমর্থন ইরান সরকার ও জনগণ কখনো ভুলবে না।
আঞ্চলিক উত্তেজনা হ্রাসের লক্ষ্যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও সাম্প্রতিক বোঝাপড়া সহজতর করার ক্ষেত্রে ভূমিকার জন্য ইরানি মন্ত্রী পাকিস্তান সরকার ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রশংসাও করেছেন। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়া সত্ত্বেও তেহরান সতর্ক রয়েছে। এই চুক্তির কোনো ধরনের লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী।
গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করে ইবনুররেজা যুক্তি দেন, এই অঞ্চলে চলমান অস্থিতিশীলতা ইসরায়েলি স্বার্থ রক্ষা করছে। তিনি ‘ইসরায়েলি আগ্রাসন ও সম্প্রসারণবাদী নীতির’ মোকাবিলায় মুসলিম দেশগুলোকে একটি ঐক্যবদ্ধ পন্থা অবলম্বনের আহ্বান জানান। সেই কৌশলের অংশ হিসেবে তিনি ইরান, পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক, মিসর এবং অন্য মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে একটি ‘ইসলামি বিশ্বের আঞ্চলিক নিরাপত্তা বলয়’ প্রতিষ্ঠার তেহরানের প্রস্তাব পুনর্ব্যক্ত করেন।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ‘সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মুখে ইরানি জাতির প্রতিরোধ ও দৃঢ়তার’ প্রশংসা করেছেন। তার ভাষ্য, দেশটির প্রতিক্রিয়া সংকল্প ও জাতীয় ঐক্য তুলে ধরেছে। তিনি আরও বলেছেন, ইরানি জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর দেখানো এই প্রতিরোধ আঞ্চলিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য তেহরানের প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছেন পাকিস্তানি মন্ত্রী। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেছেন, আঞ্চলিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষরে প্রস্তুত ইরান: অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলসহ সব মুসলিম প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত ইরান। গতকাল বুধবার আজারবাইজানের বাকুতে অনুষ্ঠিত অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি) সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সংসদীয় ইউনিয়নের সম্মেলনে এই বার্তা দেন ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ।




