সত্যিই কি আগের চেয়ে বেশি উজ্জ্বল রাতের পৃথিবী?

সংগৃহীত ছবি
যত দিন যাচ্ছে- রাতের পৃথিবী তত আলোকিত হচ্ছে। সোমবার দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমনটাই বলা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার অর্থায়িত গবেষকরা যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কনেকটিকাটের (ইউকন) নেতৃত্বে ২০১৪ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রায় ১১ লাখেরও বেশি স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করেছেন।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এই নয় বছরে পৃথিবীর কৃত্রিম রাতের আলো মোটের ওপর ১৬ শতাংশ বেড়েছে। তবে পুরো ছবিটা কেবল ‘বৃদ্ধি’ নয়; কিছু অঞ্চল আবার উল্টোভাবে অন্ধকারও হয়েছে।
গবেষণা অনুযায়ী, বৈশ্বিক রাতের আলো বাড়লেও এই প্রবণতা সব জায়গায় সমান নয়। কোথাও আলো বেড়েছে দ্রুত, কোথাও আবার নেমে গেছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
ইউরোপে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে আলো কমার দিকে। শক্তি দক্ষতা বাড়ানোর নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণের কারণে মহাদেশটি উল্লেখযোগ্যভাবে ‘ডিম’ বা কম উজ্জ্বল হয়েছে। ভেনেজুয়েলায় অর্থনৈতিক সংকটের কারণে রাতের আলো কমেছে ২৬ শতাংশেরও বেশি।
অন্যদিকে, এশিয়া এই উজ্জ্বলতার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে। বিশেষ করে চীন ও উত্তর ভারতে নগরায়ন ও অবকাঠামোগত সম্প্রসারণের কারণে রাতের আলো উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
গবেষকরা বলছেন, কোভিড-১৯ মহামারি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধীরগতি এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ সবকিছুই এই আলোর মানচিত্রে ‘ফ্লিকারিং’ বা অনিয়মিত পরিবর্তন তৈরি করেছে। লকডাউন ও শিল্প কার্যক্রমের পতনের সময় অনেক জায়গায় রাতের আলো সাময়িকভাবে কমে যায়, আবার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তা ফিরে আসে বা বাড়ে।
গবেষণায় নাসার ভিজিবল ইনফ্রারেড ইমেজিং রেডিওমিটার স্যুট (ভিআইআইআরএস) স্যাটেলাইট ব্যবহার করে প্রতিদিন স্থানীয় সময় রাত ১টা ৩০ মিনিটে তোলা ছবিগুলো বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকরা প্রতিটি পিক্সেল আলাদা করে পর্যালোচনা করেন, যাতে মেঘ, চাঁদের আলো বা বায়ুমণ্ডলীয় প্রভাব বাদ দেওয়া যায়।
গবেষণার প্রধান বিজ্ঞানী ঝে ঝু এই বিশ্লেষণকে বর্ণনা করেছেন এমনভাবে- “এটা যেন পৃথিবীর হৃদস্পন্দন দেখার মতো।” তার মতে, রাতের আলো এখন আর শুধু অগ্রগতির প্রতীক নয়; এটি এক ধরনের ‘ডাইনামিক পোর্ট্রেট’, যেখানে একই সঙ্গে নির্মাণ, ধ্বংস, উন্নয়ন, সংকোচন সবকিছুই ঘটছে।
তিনি আরও বলেন, “আমরা যা দেখি তা কোনো সোজা সরল গল্প নয়। পৃথিবী শুধু উজ্জ্বল হচ্ছে না- এটা এক ধরনের ক্রমাগত দোলাচলে থাকা আলো।”
গবেষণায় আঞ্চলিক পার্থক্যও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূল শহর বৃদ্ধির কারণে উজ্জ্বল হয়েছে, আর পূর্ব উপকূল তুলনামূলকভাবে কম উজ্জ্বল হয়েছে। কারণ সেখানে শক্তি সাশ্রয়ী এলইডি ব্যবহারের প্রবণতা ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন বেড়েছে।
ইউরোপে প্যারিসসহ অনেক জায়গায় শক্তি সাশ্রয় নীতির কারণে রাতের আলো কমেছে। ফ্রান্সে এই কমার হার প্রায় ৩৩ শতাংশ। যুক্তরাজ্যে কমেছে ২২ শতাংশ ও নেদারল্যান্ডসে ২১ শতাংশ।
এছাড়া গবেষণায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে- শক্তি খাতে গ্যাস ফ্লেয়ারিং বা অতিরিক্ত গ্যাস পোড়ানোর দৃশ্য। যুক্তরাষ্ট্রের পারমিয়ান বেসিন (টেক্সাস) ও নর্থ ডাকোটার বাকেন অঞ্চলে তেল-গ্যাস উৎপাদনের সময় প্রচুর পরিমাণে গ্যাস পুড়িয়ে ফেলা হয়, যা স্যাটেলাইট ছবিতে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
রকি মাউন্টেন ইনস্টিটিউটের গবেষক ডেবোরা গর্ডন এই তথ্যকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করে বলেন, এই ধরনের ডেটা অপারেটর, বিনিয়োগকারী এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। এতে বোঝা যায় কোথায় শক্তির অপচয় হচ্ছে এবং পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক ক্ষতি কতটা বিস্তৃত।
সব মিলিয়ে এই গবেষণা পৃথিবীর রাতের একটি নতুন চিত্র তুলে ধরেছে- যেখানে আলো বাড়া বা কমা কোনো সরল রেখা নয়, বরং একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থার প্রতিফলন, যা অর্থনীতি, প্রযুক্তি, নীতি এবং সংকটের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

