হাতির শুঁড় নয়, রোবট

হাতির শুঁড়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এতে কোনো হাড় নেই। প্রয়োজন অনুযায়ী বাঁকতে পারে, মোচড় দিতে পারে। এই বৈশিষ্ট্যগুলোই আধুনিক রোবোটিকস গবেষকদের পথ দেখাচ্ছে। ১২ আগস্ট বিশ্ব হাতি দিবসে লিখেছেন স্বর্ণা রায়
সাধারণত শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত রোবোটিক বাহুগুলো নির্দিষ্ট কিছু অক্ষ ধরে বা যান্ত্রিক নিয়মে নড়াচড়া করে। কিন্তু হাতির শুঁড়ের ক্ষেত্রে তেমন কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। এটি যেকোনো কোণে নমনীয়ভাবে কাজ করতে পারে। এই নমনীয়তাকে কাজে লাগিয়ে গবেষকরা এখন ‘সফট রোবোটিকস’ নিয়ে কাজ করছেন। এখানে শক্ত ধাতব কাঠামোর জায়গায় নরম উপাদান, কৃত্রিম পেশি ও আধুনিক সেন্সর ব্যবহার করা হয়, যা রোবটকে যেকোনো বস্তুর আকার অনুযায়ী নিজেকে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে।
যেমন— এ পদ্ধতি অনুসরণ করে জার্মান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ফেস্টো তৈরি করেছে ‘বায়োনিক হ্যান্ডলিং অ্যাসিস্ট্যান্ট’। এটি হাতির শুঁড়ের নমনীয়তা ও নড়াচড়ার ক্ষমতা মাথায় রেখে তৈরি একটি রোবোটিক বাহু। একে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যেন মানুষের কাছাকাছি থেকে নিরাপদে কাজ করতে পারে। ভারী বা শক্ত ধাতব অংশ না থাকায় কারখানায় ভঙ্গুর জিনিসপত্র সরাতে বা সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশ সংযোজন করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
হাতির শুঁড়ের আরেকটি দারুণ ক্ষমতা হলো এর বহুমুখী গ্রিপিং বা কোনো কিছু ধরার ক্ষমতা। একটি হাতি তার শুঁড় দিয়ে যেমন আস্ত একটা গাছের ডাল উপড়ে ফেলতে পারে, ঠিক তেমনি অতি সাবধানে একটি ছোট্ট ফল বা পাতাও তুলে নিতে পারে, যাতে সেটির কোনো ক্ষতি না হয়। এই কৌশল অনুকরণ করে তৈরি করা হচ্ছে উন্নত প্রযুক্তির রোবোটিক গ্রিপার। এসব গ্রিপার বস্তুর ওজন ও আকৃতি বুঝে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ভবিষ্যতে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, প্যাকেজিং বা চিকিৎসাক্ষেত্রে এর ব্যবহার বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।
হাড়বিহীন এই অঙ্গটির শক্তির উৎস মূলত এর শক্তিশালী পেশিতন্তু। বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য হলো এই প্রাকৃতিক ব্যবস্থা অনুসরণ করে কৃত্রিম পেশি তৈরি করা, যার মাধ্যমে রোবটগুলোকে আরও হালকা, অথচ কর্মক্ষম করে তোলা সম্ভব হবে।
এর পাশাপাশি কাজ করছে ট্যাকটাইল বা স্পর্শ-সংবেদী সেন্সর প্রযুক্তি। হাতির শুঁড়ের স্পর্শ অনুভূতি অত্যন্ত প্রখর। রোবটের গ্রিপারে এ সেন্সর যুক্ত করা গেলে তারা কোনো বস্তু শক্ত নাকি নরম, মসৃণ নাকি খসখসে তা অনুভব করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। মানুষের সঙ্গে কাজ করা রোবটগুলোর ক্ষেত্রে এ প্রযুক্তি নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা দুটোই বাড়িয়ে দিতে পারে।
এ ছাড়া মানুষের চিকিৎসাসেবা ও কৃত্রিম অঙ্গ (প্রস্থেটিকস) তৈরির ক্ষেত্রেও হাতির শুঁড়ের নকশা বড় অনুপ্রেরণা হতে পারে। শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকা মানুষের জন্য এমন কৃত্রিম হাত বা পা তৈরি করা সম্ভব হতে পারে, যা মানুষের সাধারণ অঙ্গের মতোই সহজে ও নমনীয়ভাবে কাজ করতে পারবে।




