বাঘের গল্প

অলঙ্করণ করেছেন রজত
এখন যারা ঢাকা শহরে থাকো, এখানেও কিন্তু একসময় ছিল বাঘের আস্তানা। সত্যি বলছি! ২৯ জুলাই বাঘ দিবস সামনে রেখে বাঘমামাকে নিয়ে নানা গল্প শোনাচ্ছেন ইশতিয়াক হাসান
হালকা বাতাসে কুপির আলোটা কাঁপছে। সেই মিটমিটে আলোয় নানির মুখের অল্প অংশটুকুই দেখা যাচ্ছে। পুরনো দিনের গল্প বলছেন তিনি। যখন নানি ছিলেন কিশোরী। এখন তো বুড়ো হয়ে গেছেন। আমরা কয়জন মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছি। আমাদের বয়স সাত থেকে তেরোর মধ্যে। নানি বলে চলেছেন, ‘রাতে হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল। শুনলাম, গোয়ালঘরে কীসের যেন হুটোপুটি! তারপর ভেসে এলো এক গম্ভীর ঘরঘর আওয়াজ। এক মিনিট পর ভারী কিছু একটা ছ্যাঁচড়াতে ছ্যাঁচড়াতে টেনে নিয়ে যাওয়ার শব্দ। শরীর একদম হিম হয়ে গেল। আবারও একটা গরুকে বাঘে ধরেছে!’
ছোটবেলায় হবিগঞ্জের মাধবপুরে নানাবাড়িতে গেলেই আমরা নানিকে চেপে ধরতাম পুরনো দিনের গল্প শোনার জন্য। আমার আগ্রহ ছিল শুধুই বাঘের গল্পে! একটা সময় বাঘ আমাদের এই বাংলাদেশের ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিলেট, পার্বত্য চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ— কোথায় ছিল না? এখন বাঘের কথা বললেই নাম চলে আসে সুন্দরবনের। অন্য জায়গার বাঘ কোথায় গেল? সে গল্পের আগে বরং বাঘ সম্পর্কে কিছু মজার তথ্য দিয়ে রাখি।
একটা পুরুষ বাঘের ওজন ৩০০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে! আর নাক থেকে লেজের ডগা পর্যন্ত এরা লম্বায় ১০ ফুট পার হয়ে যায়। এই বিশাল চেহারার বাঘমামার গায়ে যে ডোরাকাটা দাগগুলো থাকে, তা নিয়ে আছে দারুণ এক রহস্য। মানুষের আঙুলের ছাপ যেমন একজনের সঙ্গে অন্যজনের মেলে না, দুটি বাঘের গায়ের ডোরাকাটা দাগও কখনো একরকম হয় না!
বাঘ সাঁতার কাটতে খুব ভালোবাসে। গরমের দিনে নদীতে নেমে গা জুড়ানো কিংবা শিকারের পিছু নিয়ে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়া তাদের স্বভাব। শুধু সাঁতার নয়; নতুন শিকারের খোঁজে বা নতুন থাকার জায়গা খুঁজতে একেকটি বাঘ বন-জঙ্গল পেরিয়ে শত শত কিলোমিটার দূরে পথ পাড়ি দিতে পারে। আর যখন বনের রাজা মুখ খুলে হুঙ্কার ছাড়ে, সেই গম্ভীর রাজকীয় গর্জন পুরো তিন কিলোমিটার দূর থেকেও স্পষ্ট শোনা যায়! জঙ্গলে বাঘের ডাক শুনে মানুষ অজ্ঞান হয়ে গেছে, এমন ঘটনাও আছে। গাছে ধারালো নখ দিয়ে আঁচড় কেটে এবং গন্ধ ছড়িয়ে বাঘেরা নিজেদের সীমানা মেপে রাখে। যদি অন্য বাঘ ঢুকে পড়ে, তখন বেধে যায় হুলুস্থুল মারামারি।
বর্তমানে টিকে থাকা বাঘের ছয়টি উপপ্রজাতি হলো আমাদের বেঙ্গল টাইগার, সাইবেরীয় বাঘ, সুমাত্রার বাঘ, ইন্দোচায়নিজ বাঘ, মালয় বাঘ এবং দক্ষিণ চীনা বাঘ।। তবে বহুকাল আগে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াত এক ভয়ংকর ও অদ্ভুত প্রাণী, যাকে আমরা ‘স্যাবর-টুথড টাইগার’ বা দাঁতাল বাঘ বলি। বাঘের দূরসম্পর্কের এই আত্মীয়ের ওপরের চোয়ালে দুটো বিশালাকার ধারালো দাঁত ছিল, যা প্রায় আট ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হতো!
সাধারণত বাঘের গায়ের রঙ গাঢ় কমলা আর কালো মেশানো। কিন্তু বাঘ কখনো কখনো সাদাও হতে পারে। জিনগত এক অদ্ভুত পরিবর্তনের কারণে গায়ের কমলা রঙ হারিয়ে সাদা পশম আর নীল চোখ নিয়ে জন্ম নেয় কিছু বিশেষ বেঙ্গল টাইগার। অতীতে ভারতের রেওয়া অঞ্চলের জঙ্গলে অবাধে ঘুরত এই সাদা বাঘ। তবে বুনো জঙ্গলে এদের দেখা পাওয়া এখন ভাগ্যের ব্যাপার! আবার শতভাগ কুচকুচে একরঙা কালো বাঘ না থাকলেও অতি ঘন ও গাঢ় ডোরাকাটা দাগের কারণে পুরো শরীর কালো দেখায়, এমন বাঘমামা বাস্তবে টিকে আছে। এই বিশেষ অবস্থাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘সিউডো-মেলানিজম’; জিনের পরিবর্তনের ফলে এটা ঘটে। ১৮৪৬ সালে বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রামের গহিন অরণ্যে বিষাক্ত তীরের আঘাতে এমন এক রহস্যময় বাঘ মারা পড়েছিল। এদিকে ভারতের ওডিশার সিমলিপালের বিচ্ছিন্ন বনে বিভিন্ন উপপ্রজাতির বাঘদের মধ্যে প্রজননের ফলে সেখানে বর্তমানে প্রায় ১৩টি সিউডো-মেলানেস্টিক বাঘ স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
বাঘ কিন্তু কালেভদ্রে মানুষখেকো হয়। ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর মানুষখেকো বাঘগুলোর একটি চম্পাবতের বাঘিনী নেপাল ও ভারতের কুমায়ুনে চারশর বেশি মানুষ মেরেছিল। অন্যদিকে সুন্দরবনে বেশ কয়েকটি মানুষখেকো বাঘ শিকার করেন কিংবদন্তি শিকারি পচাব্দী গাজী। সাধারণত বাঘ মানুষকে এড়িয়েই চলে; তবে বৃদ্ধ বয়সে অন্য শিকার ধরতে না পারলে কিংবা মানুষের গুলিতে আহত হলে বাধ্য হয়ে এরা মানুষখেকো হয়।
বাংলাদেশ, ভারত, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া— এই চার দেশের জাতীয় পশু বাঘ। একশ বছর আগেও পৃথিবীতে যত বুনো বাঘ ছিল, আজ তার মাত্র ৫ শতাংশ টিকে আছে! সর্বশেষ কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম থেকেও এরা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের মাত্র ১০টি দেশে বুনো পরিবেশে বাঘ বেঁচে আছে। আর একসময় সারা দেশে অবাধে ঘুরে বেড়ানো বাঘগুলো আজ শুধু সুন্দরবনের ছোট এক কোণে টিকে থাকার শেষ লড়াই চালাচ্ছে। যদিও আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামে এখনো মাঝেমধ্যে বাঘ দেখার কথা বলেন পাহাড়ের মানুষরা। কিন্তু বাঘের এ হাল কেন হলো?
শত শত বছর ধরে স্রেফ বিনোদনের জন্য বাঘ শিকার করা হয়েছে। এমনকি আগের আমলের কোনো কোনো রাজা-মহারাজা ও ইংরেজ কর্মকর্তা একাই এক হাজারটি পর্যন্ত বাঘ মেরেছেন! আর আছে বাঘের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ওষুধ তৈরির ভুয়া বিশ্বাসে চোরাশিকার। বিশেষ করে চীনে এমন ওষুধের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। তা ছাড়া মানুষ প্রতিনিয়ত গাছ কেটে বন ধ্বংস করছে, ফলে বাঘ হারাচ্ছে মাথা গোঁজার ঠাঁই। কমে যাচ্ছে তাদের শিকার। কিন্তু আমরা কি ভুলে যাচ্ছি, বাঘ না থাকলে যে বন বাঁচবে না! আর বন না থাকলে আমরা কীভাবে বাঁচব? তাই বনের এই আসল রাজাদের বাঁচাতেই হবে। নিশ্চয়ই বড় হয়ে তোমরা ওদের বাঁচানোর চেষ্টা চালাবে?




