মাল্টি মিলিয়ন ডলারের জালিয়াত ড্যারেন লি

ড্যারেন লি সুপরিকল্পিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অন্তত ৭৪টি ভুয়া শেল কোম্পানি বা কাগুজে প্রতিষ্ঠান খুলেছিলেন
ক্রিপ্টোকারেন্সির বৈশ্বিক জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ড্যারেন লি। ২০ বছরের সাজা হলেও রয়েছেন পলাতক। লিখেছেন শুভ রহমান
বিংশ শতাব্দীর ত্রাস কিংবা একবিংশ শতাব্দীর সাইবার দুনিয়ার ডন— যাই বলা হোক না কেন, আধুনিক অর্থনৈতিক অপরাধের ইতিহাসে ড্যারেন লি নামটি এখন এক আতঙ্কের প্রতীক। রক্তপাতহীন অথচ নিখুঁত এক বৈশ্বিক আর্থিক লুণ্ঠন সাম্রাজ্যের মূল কারিগর হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ব জুড়ে আলোড়ন তোলেন এই ব্যক্তি। চীন ও সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের দ্বৈত নাগরিক ৪২ বছর বয়সী ড্যারেন লি বিশ্ব জুড়ে বহুল আলোচিত ‘পিগ বুচারিং’ বা ‘শূকর জবাই’ কায়দায় ক্রিপ্টো কেলেঙ্কারির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকায়। সাইবার অপরাধের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া কোটি কোটি ডলার অত্যন্ত সুকৌশলে মানি লন্ডারিং করার এক বিশাল আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের নেতৃত্ব দিতেন তিনি।
ড্যারেন লির অপরাধ সাম্রাজ্যের মূল ভিত্তি গড়ে উঠেছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কম্বোডিয়ার দুর্গম সব স্ক্যাম ক্যাম্প বা সাইবার অপরাধ চক্রকে কেন্দ্র করে। এ ক্যাম্পগুলোতে মূলত আধুনিক দাসের মতো তরুণ-তরুণীদের আটকে রেখে বিশ্ব জুড়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা হতো। স্ক্যামাররা হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম কিংবা বিভিন্ন ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত বিশ্বের নাগরিকদের টার্গেট করত। প্রথমে রোমান্টিক সম্পর্ক বা বন্ধুত্বের জাল পেতে দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বাস অর্জন করা হতো, যাকে বলা হয় ‘গ্রুমিং’। এরপর শিকারকে অত্যন্ত লাভজনক ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ভুয়া ট্রেডিং প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগে প্ররোচিত করা হতো। ভুক্তভোগীরা যখন দেখতেন ভুয়া ড্যাশবোর্ডে তাদের বিনিয়োগ বহুগুণ বেড়ে গেছে, তখন তারা সর্বস্বান্ত হয়ে আরও টাকা ঢালতেন। কিন্তু সেই অর্থ একবার চলে যাওয়ার পর আর ফেরত পাওয়া যেত না।
তদন্তে জানা যায়, ড্যারেন লি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অন্তত ৭৪টি ভুয়া শেল কোম্পানি বা কাগুজে প্রতিষ্ঠান খুলেছিলেন। এই কোম্পানিগুলোর কোনো বাস্তব বা বৈধ ব্যবসায়িক অস্তিত্ব ছিল না; এগুলোর একমাত্র কাজ ছিল প্রতারণার মাধ্যমে লুট করা অর্থ গ্রহণ করা। আদালতের নথিপত্র অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উৎস থেকে কমপক্ষে ৭ কোটি ৩৬ লাখ ডলার ভুক্তভোগীদের অ্যাকাউন্ট থেকে এই শেল কোম্পানির মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। লুট করা এ বিপুল পরিমাণ অর্থ সাধারণ মুদ্রায় রাখলে ধরা পড়ার ঝুঁকি থাকে— বিষয়টি খুব ভালোভাবেই জানতেন ড্যারেন লি। তাই তিনি ও তার সহযোগীরা শেল কোম্পানির অ্যাকাউন্টে আসা সব অর্থ বাহামা দ্বীপপুঞ্জসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করতেন এবং পরে তা ক্রিপ্টোকারেন্সি বা বিশেষ করে টিথারে (ইউএসডিটি) রূপান্তর করতেন। ক্রিপ্টোকারেন্সির বিকেন্দ্রীভূত ও ছদ্মবেশী প্রকৃতির সুযোগ নিয়ে এ কালো টাকাগুলোকে সম্পূর্ণ সাদা বা বৈধ করার এক গোলকধাঁধা তৈরি করেছিলেন তিনি। এ পুরো প্রক্রিয়ায় ড্যারেন লি নিজের আসল পরিচয় গোপন রাখতে টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপে গোপন কোড ব্যবহার করতেন। কম্বোডিয়া থেকে নিয়মিত এ অ্যাপগুলোর মাধ্যমে তিনি তার নেটওয়ার্কের প্রতিটি লেনদেন ও শেল কোম্পানির কার্যক্রম দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করতেন।
তবে অপরাধের জাল যত্নে বুনলেও শেষ রক্ষা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের সিক্রেট সার্ভিস ও ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিসের সমন্বিত সাইবার ইন্টেলিজেন্স ও ব্লকচেইন অ্যানালাইসিস প্রযুক্তির মাধ্যমে ড্যারেন লির এই গোপন নেটওয়ার্কের নাগাল পায়।
ট্রানজেকশন ট্রেস করে তদন্তকারীরা দেখতে পান, ভুক্তভোগীদের অ্যাকাউন্ট থেকে পাচার হওয়া অর্থ সরাসরি ড্যারেন লির নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন ক্রিপ্টো ওয়ালেটে গিয়ে জমা হচ্ছে। এর ভিত্তিতেই আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর যৌথ অভিযানে ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ড্যারেন লিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারের পর আদালতের মুখোমুখি হয়ে ড্যারেন লি তার অপরাধের ভয়াবহতা স্বীকার করতে বাধ্য হন। ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে ক্যালিফোর্নিয়ার সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে মানি লন্ডারিংয়ের ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকার কথা স্বীকার করে প্লিয়া চুক্তি স্বাক্ষর করেন। কিন্তু মামলার বিচার প্রক্রিয়া চলাকালে এক চাঞ্চল্যকর অধ্যায়ের সৃষ্টি হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ড্যারেন লি তার পায়ে থাকা ইলেকট্রনিক অ্যানোঙ্কল মনিটরিং ডিভাইস বা ট্র্যাকিং ডিভাইসটি কেটে ফেলেন এবং অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে মার্কিন জিম্মাদারি বা নজরদারি এড়িয়ে পালিয়ে যান। আন্তর্জাতিক সীমারেখা এবং দ্বৈত নাগরিকত্বের সুযোগ নিয়ে তিনি মার্কিন বিচারব্যবস্থার নাগালের বাইরে চলে যান এবং পলাতক হিসেবে চিহ্নিত হন। ড্যারেন লিকে ধরিয়ে দিতে ৪০ লাখ ডলার পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়।
তার এ পলায়ন ও অনুপস্থিতি আইনি প্রক্রিয়ায় কোনো বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি। দীর্ঘ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে ক্যালিফোর্নিয়ার সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট আদালত তাকে তার অনুপস্থিতিতেই সর্বোচ্চ ২০ বছরের কারাদণ্ড এবং মুক্তি-পরবর্তীতে আরও ৩ বছরের পোলিশ বা সুপারভাইজড রিলিজের নির্দেশ দেন।
আদালত তার রায়ে স্পষ্ট করে দেন, ড্যারেন লি বর্তমানে পলাতক থাকলেও বিশ্ব জুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো তাকে ফিরিয়ে এনে এই দীর্ঘ কারাদণ্ড কার্যকর করতে বদ্ধপরিকর।




