এফবিআই ফাইলস
অ্যানথ্রাক্স আতঙ্কে কেঁপেছিল যুক্তরাষ্ট্র

বোমা কিংবা বন্দুক হামলা নয়। ডাকযোগে জীবাণুর আনাগোনা দুশ্চিন্তায় ফেলেছিল যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইকে। লিখেছেন ইমরানুর রহমান
অক্টোবর, ২০০১। নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের জোড়া টাওয়ারের ধ্বংসস্তূপ থেকে তখনো ধোঁয়া উঠছে। ১১ সেপ্টেম্বরের বিভীষিকা কাটিয়ে ওঠার আগেই দেশটিকে মুখোমুখি হতে হলো এক অদৃশ্য, নিঃশব্দ আতঙ্কের। এবার মৃত্যু নেমে এলো রাজপথের সাধারণ লাল-নীল রঙের ডাকবাক্সগুলো থেকে। সংবাদমাধ্যমের অফিস এবং মার্কিন সিনেটরদের ঠিকানায় আসতে শুরু করল সাধারণ কিছু চিঠি। খামের ভেতরে ছিল শুধু সাদা রঙের মিহি একগুচ্ছ গুঁড়ো। আর সেই পাউডারের ভেতরে লুকিয়ে ছিল পৃথিবীর অন্যতম প্রাণঘাতী অস্ত্র— অ্যানথ্রাক্স ব্যাসিলাস অ্যানথ্রাসিস ব্যাকটেরিয়ার রেণু।
শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে এ রেণু শরীরে প্রবেশ করলে ফুসফুস অকেজো হয়ে যায়, রক্তে ছড়িয়ে পড়ে বিষ। চিকিৎসা পাওয়ার আগেই মানুষ ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে। ডাক বিভাগের কর্মী থেকে শুরু করে সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি— চিঠির স্পর্শ পেয়েই হাসপাতালে ভর্তি হতে শুরু করলেন বহু মানুষ। পাঁচজন নাগরিক প্রাণ হারালেন, ১৭ জন মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হলেন। গোটা যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ল নজিরবিহীন মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক। মানুষ পোস্টবক্সে হাত দিতে ভয় পেতে শুরু করল, সাধারণ ঘরের খাম খুলতেও হাত কাঁপতে লাগল সবার।
শুরু হলো ইতিহাসের অন্যতম জটিল ও ব্যয়বহুল তদন্ত, যার সাংকেতিক নাম দেওয়া হলো ‘আমেরিকান ব্যাকস’। এফবিআইয়ের শত শত এজেন্ট, অণুজীববিজ্ঞানী ও গোয়েন্দারা নেমে পড়লেন আততায়ীকে খুঁজতে। ল্যাব টেস্টের ফলাফল আসতেই তাদের মেরুদণ্ড দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। চিঠিতে ব্যবহৃত অ্যানথ্রাক্স কোনো সাধারণ জৈব উপাদান ছিল না। এগুলোকে অত্যন্ত উচ্চপ্রযুক্তিতে প্রক্রিয়াজাত করে উইপেন-গ্রেড বা অস্ত্র-উপযোগী করে তোলা হয়েছে, যা শুধু গবেষণাগারেই তৈরি করা সম্ভব। অর্থাৎ, শত্রু কোনো বিদেশি গুহায় বসে নেই; আততায়ী যুক্তরাষ্ট্রেরই অত্যন্ত সুরক্ষিত কোনো বায়োল্যাবরেটরির ভেতরে বসে রয়েছে।
গোয়েন্দাদের নজর ঘুরে গেল আমেরিকার নিজস্ব জৈব-অস্ত্র গবেষণা কেন্দ্র মেডিকেল রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব ইনফেকশাস ডিজিজেসের দিকে। বছরের পর বছর তদন্তের পর ২০০৮ সালে এফবিআই তাদের প্রধান সন্দেহভাজনকে চিহ্নিত করল। তিনি কোনো সাধারণ অপরাধী নন। ড. ব্রুস আইভাইনস, মার্কিন সরকারের একজন শীর্ষস্থানীয় অণুজীববিজ্ঞানী, যিনি নিজেই অ্যানথ্রাক্সের প্রতিষেধক তৈরির গবেষণায় যুক্ত ছিলেন।
এফবিআই যখন তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই ২০০৮ সালের ২৯ জুলাই অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যা করেন ড. ব্রুস আইভাইনস। কোনো প্রত্যক্ষদর্শী নেই, তাই কোনো চূড়ান্ত বিচার প্রক্রিয়াই সম্পন্ন হতে পারল না। ২০১০ সালে এফবিআই আনুষ্ঠানিকভাবে কেসটি বন্ধ ঘোষণা করে আইভাইনসকেই একমাত্র অপরাধী বলে দাবি করে।
তবে গল্প কি আসলেই সেখানে শেষ? নাকি এটা ছিল কোনো গভীর ষড়যন্ত্রের ঢাকনা? সেটি নিশ্চিত করে বলার সুযোগ নেই।
ব্রুস আইভাইনস সত্যিই মানসিক ভারসাম্যহীন আততায়ী ছিলেন, নাকি তাকে বলির পাঁঠা বানিয়ে মূল অপরাধীকে আড়াল করা হলো?






