উর্দির আড়ালে

নির্জন কোনো রাতের অন্ধকারে গাড়ির ইঞ্জিনটা নষ্ট হলো। এমন সময় সামনে দেখা গেল গাড়ি থামিয়েছেন এক পুলিশ কর্মকর্তা। যে কেউ এমন পরিস্থিতিতে ভরসা পাবেন। কিন্তু সবসময় গল্পটা ভরসার হয় না। লিখেছেন ইমরানুর রহমান
রাশিয়ার সাইবেরিয়ার বরফাবৃত আঙ্গারস্ক শহর। রাতের গভীরতা ঝিরিঝিরি বরফঝড়ের মাঝে শহরের প্রধান সড়কগুলো একেবারে সুনসান, হিমশীতল বাতাসের সাঁ সাঁ শব্দ ছাড়া আর কোনো কোলাহল নেই। ঠিক তখনই অন্ধকার চিরে লাল-নীল নীলিমার এক রহস্যময় আলোয় ঝলসে উঠল একটি পুলিশ প্যাট্রল কার। রাস্তার ধারের কুঁকড়ে থাকা এক তরুণী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। মধ্যরাতে একা ঘরে ফেরার পথে এই উর্দিপরা পুলিশ অফিসার যেন তার কাছে সাক্ষাৎ দেবদূত।
দরজা খুলে হাসিমুখে গাড়িতে উঠে বসার পর তরুণীটি বিন্দুমাত্র ঘুণাক্ষরেও টের পাননি যে, এই উষ্ণ গাড়ির কেবিনটি আসলে নরকের প্রবেশদ্বার এবং সামনে বসে থাকা সুপুরুষ চালকটি মানুষের রূপ ধারণ করা এক রক্তপিপাসু দানব। মিখাইল পপকভ নামের সেই নরপিশাচ সেদিন শিকারকে গাড়িতে তুলে বরফাবৃত অরণ্যের গভীরে নিয়ে গিয়েছিল, যেখান আর কোনো তরুণী জীবিত ফিরে আসে না। অথচ এ দানবটি নিজেই ছিল শহরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা একজন পুলিশ কর্মকর্তা।
সাইবেরিয়ার ইরিখুতস্ক অঞ্চলের আঙ্গারস্ক শহরে নব্বইয়ের দশকের প্রারম্ভে যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনোত্তর অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা চরমে, তখন থেকেই শুরু হয় মিখাইল পপকভের সেই ত্রাসের রাজত্ব। ১৯৯২ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত টানা প্রায় দুই দশক ধরে রাশিয়ার এই অংশে আতঙ্ক হয়ে বেঁচেছিল সে। দিনের আলোয় মিখাইল ছিল অত্যন্ত সাধারণ, শান্ত স্বভাবের একজন পুলিশ কনস্টেবল। পাড়া-প্রতিবেশী বা সহকর্মীদের কাছে তার সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক ধারণা ছিল না; বরং একজন দায়িত্বশীল পুলিশ সদস্য হিসেবেই পরিচিত ছিল। কিন্তু অন্ধকার নামলেই তার ভেতরকার পশুটি বেরিয়ে আসত। নিজের পেশাগত অবস্থান, পুলিশি ক্ষমতা এবং ইউনিফর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করত। রাতের বেলা বাড়ি ফেরার জন্য যানবাহনের অপেক্ষায় থাকা অসহায়, তরুণী বা নারীরাই হতো তার প্রধান টার্গেট। পুলিশের ইউনিফর্ম পরা থাকায় নারীরাও বিনাদ্বিধায় এবং কোনোরকম সন্দেহ ছাড়াই তার গাড়িতে উঠে বসতেন। গাড়িতে তোলার পর মিখাইল কৌশলে নির্জন বা বরফে ঢাকা বনের দিকে গাড়ি চালিয়ে যেত। সেখানে পৌঁছানোর পর শুরু হতো চরম অমানবিক নির্যাতন। ধর্ষণ ও পাশবিক অত্যাচারের পর অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় হাতুড়ি, ছুরি, কুঠার কিংবা স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে তাদের হত্যা করত। তার এ নির্মমতার ধরন এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, রাশিয়ার মিডিয়া তাকে ‘দ্য ওয়্যারউলফ’ বা নেকড়েমানব উপাধি দেয়। মিখাইল এতটাই ধূর্ত ছিল যে, হত্যার পর আলামত মুছে ফেলার জন্য পুলিশি ট্রেনিং এবং নিজের পেশাগত জ্ঞান কাজে লাগাত। অপরাধের স্থান থেকে আঙুলের ছাপ, ডিএনএ বা অন্যান্য ফরেনসিক প্রমাণ যেন না থাকে, সে বিষয়ে চরম সতর্কতা অবলম্বন করত। টানা দুই দশক ধরে রাশিয়ার গোয়েন্দা ও পুলিশ বাহিনী হন্যে হয়ে খুঁজলেও এই অদৃশ্য খুনিকে পাকড়াও করতে পারছিল না, কারণ যার খোঁজে তল্লাশি চলছিল, খোদ সেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যই ছিল এ খুনি। শিকারের সংখ্যা যখন দিনে দিনে বাড়তে থাকে, তখন পুলিশ প্রশাসনের মধ্যেও তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়। তদন্তকারীরা লক্ষ করতে শুরু করেন, অপরাধের আশপাশের এলাকাগুলোতে নির্দিষ্ট একটি অফ-রোড লাদা ফোর-বাই-ফোর গাড়ির টায়ারের দাগ পাওয়া যাচ্ছে, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা নির্দিষ্ট কিছু অফিসিয়াল কাজে ব্যবহৃত হতো। এই সূত্র ধরে ২০১২ সালে রাশিয়া ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ডিএনএ স্ক্রিনিং বা নমুনা পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়। ইরিখুতস্ক এলাকার তৎকালীন ও সাবেক প্রায় সাড়ে তিন হাজার পুলিশ সদস্যের ডিএনএ স্যাম্পল সংগ্রহ করা হয়। এই ব্যাপক ও বৈজ্ঞানিক তদন্তের মাধ্যমেই আড়ালে থাকা মুখোশ খুলে পড়ে। ২০১২ সালের জুন মাসে পুলিশ মিখাইল পপকভকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।



