রাকিবের আকুতি শোনেনি কেউ

আঁকা : সোহানুর রহমান
সংসারের অভাব মেটাতে ১২ বছরের শিশু কাজ নিয়েছিল খুলনার এক গ্যারেজে। কাজ ছেড়ে অন্যত্র যাওয়ার জেরে সেখানেই নির্যাতনের শিকার হয় সে— অভিযোগ এমনই। সেই রাতেই হাসপাতালে মারা যায় রাকিব হাওলাদার। খুলনার টুটপাড়ার ওই গ্যারেজে সেদিন কী ঘটেছিল? লিখেছেন আখলাকুজ্জামান অনিক
২০১৫ সালের ৩ আগস্ট, সোমবার; খুলনা নগরের টুটপাড়ায় সেদিন সন্ধ্যা নেমেছিল আর দশটা দিনের মতোই স্বাভাবিক ছন্দে। রাস্তায় যানবাহনের অন্তহীন ভিড়, দোকানপাটে জ্বলে ওঠা উজ্জ্বল আলো আর চেনা শহরের চেনা কোলাহলের মধ্যে টুটপাড়া কবরস্থানের পাশের একটি মোটর গ্যারেজ থেকে সেদিন এমন এক লোমহর্ষক ঘটনার খবর বেরিয়ে এলো, যা পরের কয়েক দিন পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।
ওই গ্যারেজের একসময়ের কর্মী ছিল রাকিব হাওলাদার, যার বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর। যে বয়সে কোমল হাতে খাতা-কলম ও বই থাকার কথা, ঠিক সে বয়সে তার ছোট্ট আঙুলগুলোতে উঠেছিল ভারী যন্ত্রপাতি। দীর্ঘ দুই বছর ধরে প্রতিদিন গ্যারেজের কালো তেল-কালিতে সর্বাঙ্গ মাখামাখি করে দিনরাত খেটে যেত সে। বিনিময়ে তার পরিশ্রমে জুটেছিল দিনে মাত্র ৫০ টাকার মজুরি। অথচ অভাবের সংসারে ওই সামান্য টাকাই ছিল তার পরিবারের কাছে বেঁচে থাকার বড় ভরসা।
রাকিবের বাবা নুরুল আলম হাওলাদার একজন দিনমজুর। তিন বছর আগে জীবনের তাগিদে, ভাগ্য বদলের আশায় সুদূর সাতক্ষীরা ছেড়ে স্ত্রী-সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে খুলনায় এসেছিলেন তিনি। কিন্তু এই ব্যস্ত শহর তাদের ভাগ্যের কোনো সুখের দরজা খুলে দেয়নি। শহরের এক ব্যস্ত সড়কের পাশে ছোট্ট একটি ঝুপড়ি ঘরে ঠাঁই হয়েছিল এই নিঃস্ব পরিবারটির। চরম অভাবের সেই সংসারে বাবার একার স্বল্প আয়ে সংসার চলছিল না কোনোমতে। তাই অবুঝ শিশু রাকিব নিজেই স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিয়েছিল সংসারের ভারী বোঝা। বাবা পরে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, সংসারের ঘানি টানতে বাধ্য হয়েই ছেলেকে কাজে পাঠাতে হয়েছিল।
টুটপাড়ার মতো জনবহুল এলাকার গ্যারেজ, ছোট দোকান কিংবা ওয়ার্কশপে শিশুদের শ্রমে নিয়োজিত থাকা নতুন কোনো দৃশ্য ছিল না। রাকিবও তাদের ভিড়ের একজন ছিল। দিনের ক্লান্তি শেষে সে ফিরত ঝুপড়ির সেই ভাঙা ঘরে, যেখানে বাবার মজুরির সঙ্গে ছেলের জমানো সামান্য কটা টাকা যোগ হয়ে চলত তাদের চারবেলা দুমুঠো ভাতের সংস্থান। রাকিবের বাবার ভাষ্য অনুযায়ী, গ্যারেজ মালিকের মা বিউটি বেগম কারণ-অকারণে প্রতিনিয়ত তার ছেলেকে মারধর ও অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতেন। এই মানবেতর নিপীড়ন সইতে না পেরে এক পর্যায়ে রাকিব ওই গ্যারেজের কাজ ছেড়ে এলাকারই অন্য এক মালিকের কাছে কাজ নেয়। মূলত এই পদক্ষেপে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে সাবেক মালিকপক্ষ।
আর্তনাদ করে উঠেছিল রাকিব ‘চাচা, এবার থামেন নইলে আমি মরে যাব’
ঘটনার দিন, অর্থাৎ ৩ আগস্ট রাকিব স্থানীয় এক দোকানে রঙ আনতে গিয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, ঠিক সে সুযোগেই তাকে কৌশলে ডেকে নেওয়া হয় পুরনো সেই গ্যারেজে। পুলিশ ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভেতরে ওত পেতে থাকা গ্যারেজ মালিক ওমর শরীফ, তার মা বিউটি বেগম ও সহযোগী মিন্টু মিলে চড়াও হন নিরাশ্রয় ওই শিশুর ওপর। এরপর তারা যা করেন, তা যেন মানবসভ্যতার সব সীমানাকে লুণ্ঠিত করে। মোটরসাইকেলের টায়ারে হাওয়া দেওয়ার শক্তিশালী পাম্প মেশিন এনে রাকিবের পায়ুপথের ভেতরে পাইপ ঢুকিয়ে শরীরের অভ্যন্তরে প্রচণ্ড চাপে বাতাস প্রবেশ করাতে শুরু করেন তারা।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে স্থানীয় এক সংবাদমাধ্যমের কাছে রোমহর্ষক সেই বিবরণ দিয়েছিল রাকিবের এক বন্ধু। সে তখন গ্যারেজের ঠিক পাশ দিয়েই হেঁটে যাচ্ছিল। পাম্প দিয়ে শরীরে বাতাস ঢোকানোর সেই ভয়াবহ মুহূর্তে সে বাইরে থেকেই শুনতে পেয়েছিল রাকিবের আকুল আর্তনাদ, ‘চাচা, এবার থামেন; নইলে আমি মরে যাব।’ কিন্তু নরপিশাচদের মনে শিশুর সেই প্রাণভিখারি কাকুতি-মিনতিতে বিন্দুমাত্র দয়া বা অনুকম্পার সৃষ্টি হয়নি।
একপর্যায়ে অমানুষিক নির্যাতন থামে এবং নিস্তেজ হয়ে জ্ঞান হারায় রাকিব। দ্রুত তাকে প্রথমে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে ও পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পৌঁছানোর পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসক পরে গণমাধ্যমকে জানান, শরীরে অস্বাভাবিক ও অতিরিক্ত পরিমাণে বাতাস প্রবেশ করার ফলে রাকিবের ভেতরের অন্ত্র সম্পূর্ণ ছিঁড়ে গিয়েছিল এবং ফুসফুস ফেটে গিয়ে তার মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে।
রাকিবের নির্মম মৃত্যুর সংবাদ মুহূর্তের মধ্যে দাবানলের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সেই রাতেই সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় যুবকরা ক্ষোভে ফেটে পড়ে গ্যারেজে ঢুকে পড়েন এবং অভিযুক্ত তিনজনকে হাতেনাতে ধরে পুলিশে সোপর্দ করেন। বিচারহীনতার আশঙ্কায় খুলনার রাজপথে নেমে আসেন শত শত বিক্ষুব্ধ মানুষ, যাদের একটাই দাবি ছিল— রাকিবের নৃশংস হত্যার উপযুক্ত বিচার। ঘটনার পরদিন, অর্থাৎ ৪ আগস্ট রাকিবের বাবা বাদী হয়ে খুলনা সদর থানায় ওমর শরীফ, মিন্টু ও বিউটি বেগমকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন।
যেহেতু ঘটনাস্থল থেকেই আসামিরা জনরোষের মধ্য দিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিল, তাই গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে কোনো আইনি জটিলতা তৈরি হয়নি। সবার চোখ নিবদ্ধ ছিল আদালতের দিকে। কারণ, এর মাত্র কিছুদিন আগেই দেশ জুড়ে আরেকটি শিশু হত্যার শোক মানুষের মনে দগদগে ঘা হয়ে ছিল। ওই বছরের ৮ জুলাই সিলেটে ১৩ বছরের শিশু শেখ মোহাম্মদ সামিউল আলম রাজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল, যার প্রতিবাদে পুরো দেশ উত্তাল হয়ে উঠেছিল।
রাকিবের এই চাঞ্চল্যকর মামলার বিচারকাজ দ্রুতগতিতে সম্পন্ন হয়। ২০১৫ সালের ৩ আগস্ট ঘটনার প্রায় ৯৭ দিন পর ৮ নভেম্বর খুলনা মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। আদালত তার রায়ে ১২-১৩ বছর বয়সী শিশু রাকিবের হত্যাকাণ্ডকে ‘নৃশংস ও বর্বর’ হিসেবে উল্লেখ করেন। প্রধান আসামি ওমর শরীফ, তার চাচা ও সহযোগী মিন্টুকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। মামলার অপর আসামি ওমর শরীফের মা বিউটি বেগমকে খালাস দেওয়া হয়। মাত্র ১১ কর্মদিবসে বিচার সম্পন্ন হয়। পরে ২০১৭ সালের ৪ এপ্রিল হাইকোর্ট ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শেষে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন।



