পাহাড়ের রহস্য

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বান্দরবানের গহিন পাহাড়ে গিয়ে নানা রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা হয় পর্যটকদের। কোনো কোনোটি তো রীতিমতো ভুতুড়ে। এর সঙ্গে যোগ হয় পাহাড়ি মানুষের মনে লালিত নানা বিশ্বাস। লিখেছেন সত্যজিৎ কাঞ্জিলাল
ভর সন্ধ্যায় ট্রেকারদের দল নেমেছে মাতামুহুরী নদীতে। পানি কম, কিন্তু কাদা ভয়ংকর। একেকবার পা তুলতে গিয়ে মনে হচ্ছে, নদী যেন পা আটকে ধরে আছে। নদীর মাঝামাঝি এসে শাওন হঠাৎ ডুবে যেতে লাগল! জাহিদ ভাই এক ঝটকায় তার হাত ধরে ফেললেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই টেনে তুললেন তাকে। আশ্চর্যের বিষয়, জায়গাটায় পানি বা কাদা— কোনোটাই এত গভীর নয়। শাওনের চোখমুখ বলে দিচ্ছে, ঘটনা শুধু পড়ে যাওয়ার নয়। সে হাঁপাচ্ছে। চোখ দুটো কেমন ঘোলাটে! নদীর স্রোত তখনো একইভাবে বয়ে যাচ্ছে। চারপাশে জঙ্গলের ভেতর থেকে ভেসে আসছে অচেনা সব শব্দ। শাওন নিজেকে সামলে খুব নিচু গলায় বলল, ‘ভাই... কেউ যেন আমারে নিচ থেকে টান দিল!’ তখন কথা শোনার সময় নেই। তাড়াতাড়ি পেরোতে হবে নদী।
পাহাড়ের চূড়ায় বসে ভরা পূর্ণিমা দেখতে আমাদের গন্তব্য মাতামুহুরী রিজার্ভ ফরেস্ট। চাঁদের হাসি যখন বাঁধ ভাঙবে, আমরা রিজার্ভ ফরেস্টের কোনো পাহাড়ের চূড়ায় বসে গা ভেজাব জোছনায়। এমন রোমান্টিক ভ্রমণের শুরুটা যে আতঙ্ক দিয়ে হবে, তা কে জানত? শাওন অবশ্য মাঝেমধ্যেই ভূতের গল্প বলে, নানান কিছু দেখে। তাই নদী পার হওয়ার পর তার কথায় খুব একটা পাত্তা দিল না কেউ। বিপদ যেহেতু কেটে গেছে, শাওন হয়ে উঠল সবার হাসির পাত্র। আমরা হাসতে হাসতে, নাচতে নাচতে আশ্রয় নিলাম এক পাহাড়ি পাড়ায়।
মোরগ জবাই করতে হবে। প্রায় তিন কেজি ওজনের মোরগটা ধরতেই সেটা তারস্বরে ডেকে উঠল, যেন কাঁদছে! মোরগের কান্না কেউ কখনো শুনেছে কিনা জানি না, তবে সেই কান্না আমাদের বুক কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। মোরগটা কাঁদছেই। থামার নাম নেই। জাহিদ ভাই বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘ওই, তাড়াতাড়ি জবাই কর! কানের মাথা তো খাইয়া ফেলল!’
আলম ভাই মোরগটাকে চেপে ধরলেন, ছুরি চালালেন আরেকজন। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছিল। মোরগটা আচমকা হাত থেকে ফসকে গিয়ে পড়ল ঝোপের মাঝে। আলম ভাইয়ের ওপর চটে গেলেন জাহিদ ভাই। বললেন, ‘একটা মোরগ ধরতে পারস না!’
আমরা হাঁটছি, বিড়ালটাও হাঁটছে। কখনো সামনে, কখনো একটু দূরত্ব রেখে। আমরা পিছিয়ে পড়লে সে যেন অপেক্ষা করছে। আবার হাঁটতে শুরু করলে সেও এগিয়ে যাচ্ছে
যাই হোক, গলাকাটা মোরগের পালানোর কোনো উপায় নেই। ঝোপের ভেতরেই আছে। হেডটর্চ জ্বালিয়ে শুরু হলো মোরগের খোঁজ। তন্নতন্ন করে ঝোপঝাড় খুঁজে কোথাও পাওয়া গেল না সেটাকে। আমরা হতভম্ব! হট্টগোল শুনে জুমঘর থেকে বেরিয়ে এলেন পাড়ার কারবারি। সব শুনে ঠান্ডা গলায় ভাঙা ভাঙা বাংলায় বললেন, ‘বলছিলাম না, ঘরের সাইডে জবাই করতে?’
আমরা চুপ!
কারবারি বললেন, ‘মোরগের জানের ওপর দিয়ে গেছে। এখনই ঘরে যান! আজ রাতে বাইরে আসবেন না।’
বাথরুম পেলে কী হবে?
জবাব এলো, ‘চেপে রাখবেন।’
কারবারির শেষ কথাটি আসলে নির্দেশ। আমরা সুড়সুড় করে ঢুকে গেলাম জুমঘরে।
সন্ধ্যা থেকে চলমান ভৌতিক ঘটনার চেয়ে মোরগ হারানোর কষ্টটাই আমাদের কুরে কুরে খাচ্ছিল। জুমঘরে চুলা জ্বালিয়ে হাঁড়িতে চাপানো হলো বিন্নি চাল আর আলু। আজ রাতে এটা দিয়েই ক্ষুধা মেটাতে হবে।
শাওন ঘরের বেড়ায় ঠেস দিয়ে বসে আছে। চোখ দুটি স্থির। তাকে একটা খোঁচা মারতেই ফিসফিস করে বলল, ‘মোরগা ডাকতেছে! ওই মোরগাটা ডাকতেছে!’
শাওনের কথায় আবারও হাস্যরস ফিরল বটে, কিন্তু সবার মধ্যে ছড়াল একধরনের অস্বস্তি। জাহিদ ভাই একবার বলেই ফেললেন, ‘সত্যিই মোরগ ডাকে!’
খাওয়াদাওয়া শেষ করে স্লিপিং ব্যাগে গা এলিয়ে দিলাম। কানে যেন বাজতে লাগল মোরগের ডাক। ঘুম আসছে না। আড্ডাও জমছে না। ওদিকে কারবারি ঘুমে আচ্ছন্ন। তাকে ডেকে তুলে বলা হলো ঘটনা।
ভীষণ বিরক্ত হয়ে কারবারি নিজেদের ভাষায় বিড়বিড় করতে করতে ঘরের বাইরে গেলেন। জুমঘরের নিচেই শূকরদের আবাস। তিনি একটি শূকরছানা ধরে নিয়ে এগিয়ে চললেন সেই ঝোপটির দিকে। ঝোপের মাঝে ছানাটিকে ছুড়ে দিলেন। ভেসে এলো শূকরছানার আর্তনাদ। তারপর সব নিস্তব্ধ।
বাকি রাতে আর মোরগের ডাক শোনা যায়নি।
দুই
দেবতা পাহাড়ে তখন কনে দেখা আলো। রূপসী আমিয়াখুমের জলে ঝাঁপ দিয়ে, ভেলাখুমে ভেসে সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলেছিলাম আমরা। বান্দরবানের গহিনে তখন পর্যটকদের এত আনাগোনা ছিল না। দুপুরে দেবতা পাহাড় বেয়ে নেমেছিলাম আমরা। সন্ধ্যায় সেই খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠতে গিয়ে দেখা হয়ে গেল বাঘের মাসির সঙ্গে! একটা নিরীহ বিড়াল যে পাহাড়ের আদিবাসীদের মধ্যে ছোটখাটো আতঙ্কের ঝড় বইয়ে দেবে, তা কে জানত?
দেবতা পাহাড়ের চূড়ায় রয়েছে প্রকাণ্ড এক গাছ। স্থানীয় আদিবাসীদের কাছে গাছটি দেবতাতুল্য। শুধু গাছ নয়, পুরো পাহাড়টিই তাদের কাছে পবিত্র। সন্ধ্যার পর এই পাহাড়ে ওঠা নিষেধ। কিন্তু আমাদের সেদিন দেরি হয়ে গিয়েছিল। পাহাড়ে না উঠে উপায় ছিল না। মাঝপথে পৌঁছাতেই চারপাশে নেমে এলো অন্ধকার। ঠিক তখনই আবছা আলোয় চোখে পড়ল একটি বিড়াল। কালো বিড়ালটি আমাদের সামনে সামনে হাঁটছে। অবলীলায় উঠে যাচ্ছে খাড়া পাহাড় বেয়ে। নিতান্তই স্বাভাবিক একটা দৃশ্য। পাহাড়ে বিড়াল থাকতেই পারে। কিন্তু কয়েক মিনিট পর একটু অন্যমনস্ক হতেই চোখের সামনে থেকে উধাও হয়ে গেল সেটি!
থেমে গেল পুরো দল। বিড়ালটা কোথায় গেল? চোখের সামনে দিয়ে চলে গেল, অথচ কেউই খেয়াল করলাম না! পাহাড়ি বিড়াল আমাদের চেয়ে অভিজ্ঞ; হয়তো দ্রুত চলে গেছে— এমন একটা যুক্তি দাঁড় করিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করলাম। কিন্তু বেশিক্ষণ স্বাভাবিক থাকা গেল না। কিছুক্ষণ পর টর্চের আলোয় জ্বলজ্বল করে উঠল দুটি চোখ! দৃশ্যটা দেখে সবার আত্মারাম খাঁচাছাড়া। দেবতা পাহাড়ের ট্রেইল তখন বেশ সংকীর্ণ। সামিউল ভয়ের চোটে প্রায় নিচে পড়ে যাচ্ছিল। কোনোমতে তাকে ধরে ফেললেন সাইদ ভাই। শরীর ঘেমে উঠছে, বুকের ধুকপুকানি বাড়ছে। একটু ধাতস্থ হয়ে টর্চের আলোয় ভালো করে তাকাতেই দেখা গেল, সেই কালো বিড়াল শান্তভাবে আমাদের দিকে ফিরে তাকিয়ে আছে। টর্চের আলো পড়েছে তার চোখে। অন্ধকার পাহাড়ে জ্বলজ্বলে সেই চোখের দিকে তাকিয়ে মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, সামনে বুঝি কোনো ভূত দাঁড়িয়ে আছে!
পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছাতে তখনো অনেকটা পথ বাকি। এখনকার মতো লোহার সিঁড়িও ছিল না দেবতা পাহাড়ে। গাছের শিকড়বাকড় ধরে বহু কষ্টে উঠতে-নামতে হতো। দলের কয়েকজন বেশ ভয় পেয়ে গেছে। কালো বিড়ালকে অশুভ মনে করার ধারণাটা বেশ পুরনো। আমরা হাঁটছি, বিড়ালটাও হাঁটছে। কখনো সামনে, কখনো একটু দূরত্ব রেখে। আমরা পিছিয়ে পড়লে সে যেন অপেক্ষা করছে। আবার হাঁটতে শুরু করলে সেও এগিয়ে যাচ্ছে। এভাবে কতক্ষণ চলেছিলাম, মনে নেই। শুধু মনে আছে, অন্ধকার পাহাড়ে আমাদের সামনে সামনে হাঁটছিল কালো বিড়ালটি। তার উপস্থিতি কখনো অস্বস্তি বাড়াচ্ছিল, কখনো মনে হচ্ছিল, সে-ই যেন পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কোথায়?
দীর্ঘ ট্রেকিং শেষে অবশেষে দেবতা পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছালাম আমরা। চূড়ায় ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই প্রকাণ্ড গাছটির পেছনে অদৃশ্য হয়ে গেল বিড়ালটি। আমরা স্বস্তি পাব, নাকি আতঙ্কিত হব— বুঝতে পারছিলাম না। আপাতত পাহাড়ের চূড়ায় নিরাপদে পৌঁছাতে পেরেছি, এটাই স্বস্তি।
রাতের আশ্রয় থুইসাপাড়ায়। পাড়ায় পৌঁছানোর পর অতি সুমিষ্ট পাকা পেঁপে দিয়ে আমাদের আপ্যায়ন করলেন কারবারি। পেঁপে খেতে খেতেই তিনি জানতে চাইলেন, এত রাতে আমরা কোথায় ছিলাম? আমরা দেবতা পাহাড়ে ওঠার কথা বললাম। কালো বিড়ালের ঘটনা আসতেই কারবারির মুখ অন্ধকার হয়ে গেল! রেগেমেগে ভাঙা ভাঙা বাংলায় বললেন, ‘আপনাদের বলেছিলাম, রাতে দেবতা পাহাড়ে না যেতে! এখন কী হবে?’
আমাদের কিছু বলার ছিল না। দু-একজন আমতা আমতা করে কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু ততক্ষণে পাড়ায় ছোটখাটো তুলকালাম বেধে গেছে। শুরু হয়েছে ছোটাছুটি। কারবারির ছেলে দ্রুত একটা শূকর ধরে আনলেন। সেটাকে জবাই করে রক্ত ঢালা হলো একটি মাটির পাত্রে। ফলমূল, খাবার আর আরও কিছু জিনিসপত্র নিয়ে কারবারি ছুটলেন দেবতা পাহাড়ের দিকে। আমরা তখন নির্বাক দর্শক। কিছুটা অপরাধবোধও হচ্ছিল সময়ক্ষেপণের জন্য। অনেক প্রশ্ন মাথায় নিয়ে পরদিন ভোরে ফেরার পথে পা বাড়ালাম। পশুর রক্তে দেবতা পাহাড়ের অদৃশ্য শক্তি সন্তুষ্ট হয়েছিলেন কি না, তা-ও আর জানা হয়নি।



