ভৌতিক অভিজ্ঞতা
খেজুর ভাঙা সন্ন্যাসী নাচের এক রাতে

আঁকা : অনন্যা প্রমা
নদীতীরের জঙ্গলের পাশেই আমাদের বাড়ি। এই জঙ্গলের পাশের একটি আধভাঙা কাঁচা মাটির অব্যবহৃত মন্দিরের সামনের ফাঁকা জায়গায় চড়ক পূজার উৎসব হয়। বড় একটা প্রাচীন উঁচু খেজুরগাছে চড়ক পূজার দিনে গাছের ওপর ‘খেজুর ভাঙা সন্ন্যাসী’ নাচ হয়।
তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি, গ্রামের ছেলে বলে আব্বার মাছের ঘেরের ছোট্ট টংঘরে একটা টর্চলাইট নিয়ে রাতে ঘেরের মাছ পাহারা দিয়েছি। চৈত্রের শেষের দিন চৈত্রসংক্রান্তিতে চড়ক পূজা হয়। দূরদূরান্ত থেকে চড়ক নাচের সন্ন্যাসীরা গ্রামে আসেন। চড়কের মেলা বসে।
সবচেয়ে ভয়ংকর হয় খেজুর ভাঙা নাচ। চড়ক পূজার দিন সন্ন্যাসীরা একটা খেজুরগাছ বেছে নেন, তার গোড়ায় পূজা করেন। এরপর একজন সন্ন্যাসী খালি গায়ে-খালি পায়ে লকলকে কাঁটা বেড়ে ওঠা সবচেয়ে উঁচু খেজুরগাছের একেবারে চূড়ায় উঠে নাচেন। নিচে চলে দ্রুত লয়ের বাজনা। যে নাচে তাকে তখন আর রক্তমাংসের মানুষ বলে মনে হয় না। মনে হয় অন্যজগতের কেউ।
ঘটনাটি যেবারের, সেবার চড়ক পূজার দিনে দুজনে খেজুর ভাঙা নাচ নাচে। একজন আমাদের মতো ছোটমানুষ। বাবা আর ছেলে। বাবার সঙ্গে ছেলেটি তরতর করে কাঁটা গাছে উঠে যায়। তারপর শুরু হয় নিচ থেকে উলুধ্বনি, শঙ্খধ্বনি, ঢাকঢোল। ওপরে বাপ-বেটার দ্বৈত নাচ। রাতে শুয়ে শুয়ে খেজুর ভাঙা নাচের ছেলেটার কথা ভাবছি। বাইরে কালবৈশাখীর তাণ্ডব নৃত্য চলছে। আমাদের ঘরের টিনের চালে ঝড়ের সে কী দাপট আর শব্দ! মনে হয়, টিনের চালই উড়িয়ে নিয়ে যাবে। বাইরে বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ।
গুটিসুটি মেরে শুয়েছি। ঝড়ের দাপটে আধমরা বকগুলো ধরে আনতে হবে। আধমরা বক পেতে হলে সবার আগে ফজরের আজানের সময় উঠতে হবে। চোখ-কান বুজে ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করলাম। ঝড়ের বেগ বাড়ছে। বাড়ুক।
ঘুম থেকে জেগে আজানের শব্দ শুনতে পেলাম। পড়িমড়ি করে উঠে পড়লাম। সময় নেই। ঝড়ের বাড়ি খেয়ে ফাঁকা জায়গায় বক বেশি পড়ে থাকে। সে হিসাবে চড়কের মাঠের দিকেই যাওয়া উচিত। বক তো সব ওর পাশের গাছগুলোতে থাকে দেখেছি।
খুব সাবধানে কাঠের দরজায় কোনোরকম শব্দ না করে বেরিয়ে পড়লাম। বাইরে এখনো অন্ধকার। আজান শেষ হয়ে গেছে। এ সময় কি বাইরে এত অন্ধকার থাকে? সকালের কোনো আভাই কি দেখা যায় না? ঝড় এক্কেবারে থেমে গেছে। এখন মনে হচ্ছে, টর্চলাইটটা আনতে হতো। এত অন্ধকার থাকবে কে জানত। দুরু দুরু বুকে চড়কের মাঠের দিকে এগোতে থাকলাম। অন্ধকারে আমার গতি কমে গেছে। এই অন্ধকারে অবশ্য বক খুঁেজ পাওয়া খুব একটা সমস্যা নয়। কালো অন্ধকারের বুকে সাদা বক সহজে চোখে পড়বে।
মাথা তুলে তাকালাম। ওই তো সেই মন্দিরের ভাঙাবাড়ি। খেজুর ভাঙা নাচের খেজুরগাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। হাঁটতে হাঁটতে চড়কের মাঠের দিকে চলে এলাম। মাঠ বলে যে সুন্দর ঘাসে ছাওয়া পরিছন্ন জায়গা, তা কিন্তু নয়। গাছ-টাছ একটু যেদিকে, সেদিকেই প্রথম বকটা পেলাম। মরে শক্ত হয়ে আছে। তবুও ওটা হাতে নিলাম। বক যে পেয়েছি, সেটি দেখাতে পারব। মন্দিরের আধভাঙা বারান্দার নিচে খোঁড়াতে থাকা একটা বক পেলাম। ডানা ভেঙে গেছে। মরমর অবস্থার একটা বক পেলাম। বড় খেজুরগাছটার কাছেই। বাড়ি পর্যন্ত নেওয়ার আগেই ওর কম্মো কাবার। মনোযোগটা বকের দিকে ছিল বলে শব্দটা বুঝতে পারিনি। এবার মাথা উঁচু করে শব্দটা শোনার চেষ্টা করলাম। ঢাকঢোলের বাজনার শব্দ।
বকটা পড়ে গেল হাত থেকে। শব্দটা বাড়ছে। সঙ্গে শঙ্খ ও উলুধ্বনি। ভয়ে শক্ত হয়ে গেছি। নড়ার শক্তি নেই এমন অবস্থা। শব্দ এখন যেন আসছে চারদিক থেকে। আসছে খেজুরগাছের গোড়া থেকে; আসছে ভাঙা মন্দিরের ভেতরের অন্ধকার থেকে। এমনকি একবার মনে হলো অনেক উঁচু থেকে, খেজুরগাছের মাথা থেকে আসছে।
দৌড়ে পালিয়ে বাড়ির দিকে আসব, সেটি না করে খেজুরগাছের আরও কাছে এগিয়ে গেলাম। খেজুরগাছের মাথার দিকে তাকালাম। স্পষ্ট দেখলাম, দুজন মানুষ নাচছে। খেজুর ভাঙা নাচ। একজন আমার মতো ছোট। আরেকজন বড়। ঠিক যেমনটি দেখেছি আজ দুপুরে। শুধু পার্থক্য হলো তখন দেখেছিলাম আসল মানুষ। আর এখন দেখছি কালো মানুষ বা মানুষের ছায়া। মাতালের মতো ছোট ও বড় ছায়া বা বাপ-বেটার ছায়া নেচে চলেছে। আর চারদিকের অদৃশ্য থেকে ভেসে আসছে ঢাকঢোলের বাজনা, শঙ্খ আর উলুধ্বনি!
হঠাৎ করে ইলেকট্রিক সুইচ খুলে নেওয়ার মতো সব বাজনা একসঙ্গে বন্ধ হয়ে গেল। বাতাসের শব্দ পর্যন্ত নেই।
বাজনা কেন বন্ধ হয়ে গেল, খুঁজতে তাকালাম গাছের দিকে। দেখি, গাছের মাথার নাচও থেমে গেছে। আর ছোট-বড় দুই ছায়ামূর্তি গাছ বেয়ে তরতর করে নেমে আসছে নিচের দিকে। ওদের নামার ভঙ্গি দেখেই মনে হলো, ওরা আমার দিকেই আসছে। ভয়ে জমে পাথর হয়ে গেছি। নড়তে পারছি না। মনে হচ্ছে, পায়ের সঙ্গে কয়েক মণ পাথর বাঁধা। আবার নড়ার চেষ্টা করলাম। এবার কাজ হলো। নড়তে পারছি দেখে দৌড়াতে শুরু করলাম; বকটক ফেলেই।
দৌড়াচ্ছি, যাকে বলে একেবারে পড়িমড়ি করেই। পেছনে তাকানোর সাহস নেই। দৌড়াতে দৌড়াতে লিজ ঘেরের পানির মধ্যে গিয়ে পড়লাম। ঘেরের অল্প পানির মধ্য দিয়ে ছপছপ শব্দ তুলে এক প্রকার হামাগুড়ির মতো করে দৌড়াতে থাকলাম। হঠাৎ তীব্র চোখ ধাঁধানো টর্চের আলো এসে পড়ল আমার ওপরে। ঘেরের পাহারাদার।
আমাকে ভয়ে কাঁপতে দেখে এবং চিনতে পেরে কোলে করে বাড়িতে নিয়ে আসে। ঘেরের পানিতে ভিজে একাকার। ভয়ে শীতে কেঁপে জ্বর এসে গিয়েছিল।



