প্রাচীন মন্দির ও কুয়ার রহস্য

আঁকা : ফারজিন
বিখ্যাত শিকারি কেনেথ এন্ডারসনের অনেক রহস্যময়-অতিপ্রাকৃত অভিজ্ঞতা হয়েছে। এমন একটি পাঠকদের সামনে তুলে ধরেছেন ইশতিয়াক হাসান
ভারতের চিতলদ্রুগ শহরের কাছে, মহীশূরের শিমোগা জেলার পুবে অবস্থিত সামপিগেহাল্লি নামে এক ছোট্ট গ্রাম। সেখান থেকে বনের মধ্য দিয়ে বুদহাল্লি গ্রামের দিকে চলে যাওয়া নির্জন পথ ধরে মাইল চারেক এগোলে অরণ্যের একেবারে গভীরে এক প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ চোখে পড়ে। পাশে রয়েছে এক গভীর ও গা ছমছমে কুয়া। দিনের আলোতেও কেউ কাছে ঘেঁষে না, আর সূর্য অস্ত গেলে এটি পুরোপুরি নিষিদ্ধ এলাকা। লোকশ্রুতি রয়েছে, এই স্থানটি প্রচণ্ড ভুতুড়ে।
একবার সামপিগেহাল্লি ও বুদহাল্লি গ্রাম থেকে দুই ব্যক্তি হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গেল। তাদের কোনো সন্ধান মেলেনি। ঠিক সে সময়েই এলাকায় আগমন ঘটল এক বিশাল বাঘের। গ্রামবাসীর গবাদি পশু একের পর এক নিখোঁজ হতে লাগল। ভোরের আলোয় মন্দিরের দিকে বাঘের পায়ের ছাপ দেখে সবাই ধরে নিল, এটিই সেই মানুষখেকো বাঘ এবং দুই গ্রামবাসীর মর্মান্তিক পরিণতির জন্য এটিই দায়ী। বাঘের আতঙ্ক থেকে বাঁচতে গ্রামবাসী কেনেথ এন্ডারসনকে চিঠি লিখল। গল্পটা অন্তত ৭০ বছর আগের।
১৫ দিন পর এন্ডারসন গ্রামে পৌঁছালেন। নিখোঁজ দুই যুবকের বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে জানতে পারলেন, তারা দুজনেই এক দরিদ্র তরুণীর পাণিপ্রার্থী ছিল এবং অদৃশ্য হওয়ার সময় প্রচুর অর্থ ছিল সঙ্গে। মেয়েটির সঙ্গে কথা বলে এন্ডারসনের মনে হলো, সে বাঘের চেয়েও বিপজ্জনক এবং অনেক কিছু গোপন করছে। তবে এন্ডারসনের আসল লক্ষ্য ছিল বাঘটি।
হঠাৎ রহস্যময় ঘটনাটি ঘটল। কুয়া থেকে ভেসে এলো তিনটি তীক্ষ্ণ শিসের শব্দ
দুপুরের খাবারের পর রাইফেল, কার্তুজ, চায়ের ফ্লাস্ক, পানির বোতল, বৈদ্যুতিক টর্চ ও বিস্কুট নিয়ে এন্ডারসন একা রওনা হলেন সেই মন্দিরের উদ্দেশে। এক ঘণ্টার পথ পেরিয়ে ধ্বংসস্তূপে পৌঁছালেন। চারপাশের পরিবেশ ভীষণ বিষণ্ণ। মন্দিরের বাইরে বালুময় মাটিতে বাঘের আসা-যাওয়ার তাজা ছাপ দেখে বুঝলেন, প্রাণীটি মূল মন্দিরের ভেতরেই ঘুমাচ্ছে। ভেতরে ঢুকে বাঘটির মুখোমুখি হওয়ার চেষ্টা করা আত্মঘাতী। তাই তিনি পাশের কুয়াটির এক গজ উঁচু ভাঙা দেয়ালের পেছনে অবস্থান নিলেন। গ্রানাইটের কিছু পাথর সাজিয়ে উঁকি দেওয়ার ও গুলি চালানোর মতো ছয় বর্গইঞ্চির একটি ফাঁক তৈরি করলেন। গরম, উড়ন্ত পোকা কিংবা গায়ের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া গিরগিটি— কিছুই তার একাগ্রতা ভাঙতে পারল না।
একসময় সন্ধ্যা নেমে এলো। আকাশে দেখা দিল পূর্ণিমার আগের রুপালি চাঁদ। চারধার শান্ত হয়ে আসতেই হঠাৎ প্রথম রহস্যময় ঘটনাটি ঘটল। কুয়া থেকে ভেসে এলো তিনটি তীক্ষ্ণ শিসের শব্দ! প্রথমটি নিচু, দ্বিতীয়টি চড়া এবং তৃতীয়টি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও ছোট। পরমুহূর্তে মন্দিরের প্রবেশপথে এক ধূসর অবয়ব ফুটে উঠল— সেই বিশাল বাঘ! জন্তুটি ধীরপায়ে বেরিয়ে এসে সামনের পা চাটতে লাগল। ঠিক তখনই আবার সেই তিন শিসের আওয়াজ। আশ্চর্য বিষয়, বাঘটি যেন কিছুই শুনতে পেল না! সে সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে নিজের চামড়া চাটতে লাগল। বাঘটি কি বধির, নাকি এই শব্দ শুধু মানুষেরই কানে যায়?
এরপর কুয়ার গভীর থেকে ভেসে এলো ভারী ও ধীর ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ। যেন বিশাল কোনো পাখি বা বাদুড় ওপরে উঠে আসছে। চতুর্থবারের মতো শিস বাজার পর কুয়ার মুখে উদয় হলো এক অবর্ণনীয়, বীভৎস দৃশ্য। চাঁদের আলোয় কোনো স্পষ্ট আকৃতি দেখা গেল না; কুয়া থেকে যেন ঘন এক কালো ধোঁয়ার পর্দা বা মেঘের মতো স্তম্ভ বের হয়ে এলো, যার ব্যাস ও উচ্চতা প্রায় ছয় ফুট।
সেই ধোঁয়ার ছোঁয়া লাগতেই এন্ডারসনকে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা ও অদম্য হতাশা চেপে ধরল। মনের ভেতর থেকে কে যেন ভেসে উঠে বলতে লাগল, ‘এই দুঃখময় জীবনে বেঁচে থেকে লাভ কী? তার চেয়ে কুয়ায় ঝাঁপ দিয়ে সব যন্ত্রণা শেষ করে দাও না কেন!’ মাথা ঝাঁকালেন, নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলেন। একমুহূর্ত স্থির থেকে সেই ধোঁয়াটে মেঘ বাতাসে মিলিয়ে গেল। মেঘ সরে যেতেই মনের সেই আত্মঘাতী বিষণ্ণতা নিমেষে উধাও!
এরই মধ্যে বাঘটি আড়ালে চলে গিয়েছিল। তবে এন্ডারসন নিশ্চিত, ওটা মানুষখেকো নয়। কারণ, রাতে যখন বাঘটি ঘুরে এসে এন্ডারসনের পেছনে প্রায় ৪০ গজ দূরে দাঁড়ায় এবং মৃদু গর্জন করে, তখন তাকে আক্রমণ করতে পারত, কিন্তু তা করেনি। তিনিও রাইফেল নামিয়ে বাঘটিকে চলে যেতে দেন।
পরদিন সকালে গ্রামে ফিরে এন্ডারসন স্থানীয় এক বন্ধুকে রাতের ডানা ঝাপটানো ও কুয়ার ঘটনা খুলে বললেন। বন্ধুটির মুখ ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে শোনাল ২০০ বছর আগের এক রক্তহিম করা ইতিহাস:
এই মন্দিরটি একসময় খুবই প্রভাবশালী ছিল। মন্দিরের শক্তিশালী প্রধান পুরোহিতের সঙ্গে জমিদারের এক পরামর্শদাতার দ্বন্দ্ব বাধে। পরে পুরোহিতের চক্রান্তে লোকটির মৃত্যুদণ্ড হয় এবং তাকে জ্যান্ত ছুড়ে ফেলা হয় এই কুয়ার মধ্যে। মৃত্যুর আগে সে অভিশাপ দিয়ে যায়। এক সপ্তাহের মধ্যে প্রধান পুরোহিতের লাশ কুয়ায় ভেসে ওঠে। তার পর থেকে একের পর এক পুরোহিত রহস্যময়ভাবে নিখোঁজ হতে থাকেন এবং তাদের লাশ মিলতে থাকে ওই অভিশপ্ত কুয়ায়। এভাবে নািক বহু পুরোহিতকে টান মেরে কুয়ায় ফেলে হত্যা করে সেই অতৃপ্ত, অশুভ আত্মা!
এন্ডারসন বন্ধুটির কথা শুনে হেসেই উড়িয়ে দিলেন এবং ঘটনাকে আজগুবি বলে বিদায় নিলেন। কিন্তু ছয় মাইল যাওয়ার পর মনে অনুশোচনা হলো। তিনি রহস্যটির শেষ দেখতে আবার গ্রামে ফিরে এলেন এবং ঘোষণা করলেন— বাঘ নয়, কুয়ার অশুভ আত্মাকে শিকার করতে যাচ্ছেন!
দ্বিতীয় রাতে আবার কুয়ার পাশে অবস্থান নিলেন। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার সেই চড়া তিন শিসের আওয়াজ এবং গভীর কুয়া থেকে উঠে আসা তীব্র ডানা ঝাপটানোর শব্দ শোনা গেল। এবার এন্ডারসন এগিয়ে গিয়ে টর্চের তীব্র আলো কুয়ার ভেতরে ফেললেন।
আলোর রশ্মি কুয়ার অন্ধকারে প্রবেশ করতেই তা থমকে গেল ঘন, কালো এক কুয়াশার রাজ্যে। সেই কালো মেঘ বা ধোঁয়ার স্তম্ভ সর্পিল গতিতে কুয়ার মুখ ঠেলে ওপরে উঠতে শুরু করল। টর্চের আলো সেই মেঘ ভেদ করতে পারছিল না। ধোঁয়া এন্ডারসনের মাথা ও কাঁধকে পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলল।
সঙ্গে সঙ্গে আবারও সেই অশুভ কুহক জেঁকে বসল তার মগজে! প্রচণ্ড অবসন্নতা, চরম নৈরাশ্য আর কুয়ার বিষাক্ত টানে তার চেতনা অবশ হয়ে এলো। মনে হতে লাগল, কুয়ার কালচে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়াই জীবনের শ্রেষ্ঠ আনন্দদায়ক মুক্তি! পা কুয়ার দিকে এগোতে চাইল, তিনি আত্মাহুতির একদম দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেলেন। পুরোহিতদের যে পরিণতি হয়েছিল, সেই একই অভিশাপ এন্ডারসনকেও গিলতে উদ্যত হলো!
ঠিক শেষ মুহূর্তে অদম্য মানসিক শক্তি দিয়ে নিজেকে সামলে পিছিয়ে এলেন। কুয়াশার মেঘটি ধীরে ধীরে মাথার ওপর উঠে বাতাসে মিলিয়ে গেল। প্রায় ১০ মিনিট পর চেতনা পুরোপুরি ফিরে এলো। বুঝতে পারলেন, অশুভ আত্মাটি তাকেও কুয়ার অতলে টেনে নিতে চেয়েছিল।
গ্রাম ছাড়ার আগে এখানকার বন্ধুদের খুলে বললেন তার অভিজ্ঞতা। সবাই মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, ‘আমরা তোমাকে তাই বলেছিলাম!’ একজন বললেন, ‘তুমি সৌভাগ্যবান, কারণ বেঁচে আছো। অন্যরা যারা কুয়ায় ডুবে মরেছে, তাদের দলে যোগ দেওয়ার থেকে তোমাকে আরও একবার বাঁচিয়েছে ভাগ্য। এটা হয়েছে, কারণ তোমার সময় এখনো আসেনি। তবে তৃতীয় রাত যদি ওখানে কাটাও, তবে সাহেব তোমার সময় হয়ে যাবে। নিশ্চিতভাবেই অশুভ কুয়ায় ঝাঁপ দেবে।’







