কিংবদন্তিদের কথা বলছি

ছোটবেলা থেকে সেরাদের খেলা দেখেই বেড়ে উঠেছেন এই সাবেক ফুটবলার ও কোচ। পেলে, ম্যারাডোনা, মেসি, রোনালদোর খেলা নিয়ে তার মূল্যায়ন বলেছেন সনৎ বাবলার কাছে
৬৪-তে মামার বিয়ে হলো। মামা ডাক্তার। ময়মনসিংহে বিয়ের পর ঢাকায় বউভাত, বউভাতের পর ফুলবাড়িয়া স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠিয়ে দিতে গেলাম। মামি আমার বয়সীই হবে। স্টেশনে ম্যাগাজিনের স্টল থেকে আট আনায় একটা ইন্ডিয়ান ম্যাগাজিন কিনলাম। মামিই প্রথম পাতা ওল্টাতে লাগল। হঠাৎ বলে ওঠে, ‘আরে তুমি কি এটার জন্য কিনেছ নাকি!’ আমাকে দেখাল একটি খেলোয়াড়ের ছবি। তখন ১৯৬৪ সালে ফার্স্ট ডিভিশনে খেলি আমি। তো দেখি একজন খেলোয়াড়ের ছবি। তিনি পেলে। ক্যাপশনে লেখা— ‘কপর্দকহীন থেকে কোটিপতি!’
আমার মাথায় ঢোকে না, ফুটবল খেলে কোটিপতি, এটা কেমনে করে হয়? সেই সময়ে আমরা দুই আনা, চার আনা দিয়ে নিজের পয়সায় বুটের ফিতা কিনি। জানলাম ৫৮-তে পেলে প্রথম বিশ্বকাপ খেলেছে, ১৭ বছর বয়সে। সেবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ৬২-তে আবার বিশ্বকাপ জিতেছে। পুরো ক্যারিয়ারটাই কেটেছে তার সান্তোসেই। সম্ভবত ব্রাজিলের বাইরে তার খেলতে যাওয়া মানা ছিল। ৭০-এ ওয়ার্ল্ড কাপ খেলার পরেই তো সে রিটায়ার করল।
একজন খেলোয়াড়ের ছবি। তিনি পেলে। ক্যাপশনে লেখা— ‘কপর্দকহীন থেকে কোটিপতি!’
তো, ওই গেল প্রথম পরিচয় আমার পেলের সঙ্গে। এরপর পড়েছি তার অটোবায়োগ্রাফি ‘Pele and the Beautiful Game of Football’। পেলের সঙ্গেই ‘বিউটিফুল ফুটবল’ শব্দটা যায়। শৈল্পিক একটা ব্যাপার যে ফুটবলের ভেতরে থাকতে পারে, হি ওয়াজ দ্য ফার্স্ট ম্যান, সে এটা দেখিয়েছে। ব্রিটেনের রানী তাকে দিয়েছিল ‘কিং’ উপাধি। এটা তো আর কেউ পায়নি।
অন্য কারণেও আমি পেলের ভক্ত। তার হাইট ৫ ফিট ৮ ইঞ্চি, অন্য প্লেয়ারদের তুলনায় খাটো। ম্যারাডোনাও খাটো, মেসিও খাটো। এটার আবার অন্য সুবিধাও আছে। আমি পেলের ১৯৫৮ বিশ্বকাপে সুইডেনের বিপক্ষের রেকর্ডেড খেলা দেখেছি। সুইডেনের লম্বা লম্বা প্লেয়ারদের সঙ্গে সে দাঁড়িয়ে আছে প্রতিপক্ষের রক্ষণে। ওখানে দাঁড়িয়ে উড়ে আসা বল বুকে রিসিভ করার বদলে বুক দিয়ে পাঞ্চ করে ওপরে তুলে দিল। মাথার ওপর দিয়ে সেটা পেছনে নিয়ে মাটিতে পড়ার আগেই ডান পায়ের ভলিতে জড়িয়ে দিল জালে। অবিশ্বাস্য এক গোল। এখনকার দর্শকরা যারা নিয়মিত ফুটবল দেখেন তারা বলতে পারেন, এটা তো হতেই পারে। কিন্তু আমার কাছে সেটা ছিল অসাধারণ এক মুভমেন্ট, দুর্দান্ত এক ফুটবলশৈলী। ১৭ বছর বয়সের একটা বেঁটে মতো ছেলে ওই লম্বা ডিফেন্ডারদের মাঝে দাঁড়িয়ে ওই জিনিসটা করার সাহস দেখিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছে, এটা দারুণ ব্যাপার।
এরপর তো ৬৬ ওয়ার্ল্ড কাপে ইনজুরিতে পড়ে আর খেলতে পারল না। দেশে ফেরত যাওয়ার সময় এয়ারপোর্টে সাংবাদিকরা জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি তো শ্রেষ্ঠ ফুটবলার, মানুষের তো আশার শেষ থাকে না। তুমি ফুটবলের কাছে আর কী চাও?’ পেলে হাসতে হাসতে উত্তর দিল, ‘আমি যদি গারিঞ্চার মতো হতে পারতাম!’ গারিঞ্চা ব্রাজিলের আরেক বিখ্যাত তারকা। ৬৬-তে খেলেনি, ৫৮, ৬২-তে খেলেছে। সাংবাদিকরা পাল্টা জিজ্ঞাসা করেন, ‘এটার অর্থ কী?’ পেলের জবাব ছিল, ‘দেখো, আমি যখন বল নিয়ে দৌড়াই, কখনো পাঁচ-সাতজন আমাকে আটকাতে পারে না। আবার কখনো আমাকে আটকানোর জন্য একজনই যথেষ্ট।’ গারিঞ্চার এক পা কিন্তু একটু খাটো। সেজন্য ওই ডজটা সে ন্যাচারালি করতে পারত। তার পুরো কথাতেই যেটা প্রকাশ পেয়েছে তা হলো— বিনয়। মানে গারিঞ্চার মতো সে হতে পারেনি, অনায়াসে প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়কে কাটাতে পারতেন এই খেলোয়াড়।
মেসি ম্যারাডোনার মতো নয়। ইমোশন ব্যাপারটা কমই দেখেছি। মিসরের সঙ্গে জেতার পর অবশ্য কেঁদেছে।
পেলের ক্যারিয়ারে বড় কোনো বদনাম নেই। লিওনেল মেসিরও কিন্তু এসব নেই। তার ফ্যামিলি লাইফ অনেক সুন্দর। খুব গরিব ফ্যামিলি থেকে এসেছিল পেলে, মাকে খুব শ্রদ্ধা করত। মায়ের কষ্টটা সে বুঝত। মাকে সে প্রথম গিফট দিয়েছিল একটা কয়লার চুলা। স্টেশনে জুতা পালিশও করেছিল। মাঠের বাইরের এসব ঘটনা আমাকে ইমপ্রেস করেছে। এজন্য তিনিই আমার হিরো।
ম্যারাডোনাও গ্রেট। ম্যারাডোনার ওই শিল্ডিংটা— ওই হাইট নিয়ে পায়ে বল রেখে ব্যারিকেড নেওয়া— এটা ম্যারাডোনা এত সুন্দর করতে পারত! তার যে পায়ের কাজ এবং কিলিং অ্যাটিচিউড, এর জন্য আর্জেন্টাইনরা তাকে ‘ঈশ্বর’ বলে। ১৯৮৬-এর ওয়ার্ল্ড কাপটা তো ম্যারাডোনারই ওয়ার্ল্ড কাপ বলা যায়। ওই ঈশ্বরের হাতে গোল, এরপর যে ছয়জনকে কাটিয়ে নিয়ে গোল, ওটা তো অবিশ্বাস্য! ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এক ম্যাচেই বাজে ও সেরা গোল, এর তুলনা হয় না। মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামে বলটা ধরেছিলেন প্রায় নিজের হাফ থেকে। ওইখান থেকে দৌড় শুরু। বাঁ পায়ের খেলোয়াড় হলেও দৌড় দিয়েছেন ডানদিক থেকে। ইংল্যান্ডের প্লেয়ারদের কাটিয়ে গোলকিপারের কাছে গিয়ে ওয়ান-ওয়ান সিচুয়েশনে আস্তে করে বাম পায়ে শেষ টোকাটা দিয়েছেন। দৌড়টাই তো অবিশ্বাস্য!
ম্যারাডোনার ওই শিল্ডিংটা— ওই হাইট নিয়ে পায়ে বল রেখে ব্যারিকেড নেওয়া— এটা ম্যারাডোনা এত সুন্দর করতে পারত!
ম্যারাডোনার আরেকটা বিষয় শ্রদ্ধা করার মতো। সে পলিটিক্যালি কনশাস ছিল। তার ইমোশনের জায়গাটা শ্রদ্ধা করার মতো। পেলে তো দুই-একটা ইংরেজি শব্দ বলার চেষ্টা করত। ম্যারাডোনা কিন্তু বলতই না। কারণ তার বুকে ফকল্যান্ড যুদ্ধ, ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনার ঐতিহাসিক বিরোধ। তার দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদ— এগুলো তার মাথায় সারা জীবন কাজ করেছে। এজন্য সে চিকিৎসা নিতে কিউবায় চলে যেত, ফিদেল কাস্ত্রোর দেশে। পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে তার সবসময় সোচ্চার অবস্থান ছিল। অনেকে তার নিষিদ্ধ ড্রাগ সেবনের কথা বলে। আমি ওদিকে যাবই না, আমি তার মধ্যে খুঁজেছি খেলা এবং ইতিবাচক দিকগুলো।
মেসি ম্যারাডোনার মতো নয়। ইমোশন ব্যাপারটা কমই দেখেছি। মিসরের সঙ্গে জেতার পর অবশ্য কেঁদেছে। ওর প্রতি টিম মেম্বারদের যে ভালোবাসা... রোনালদোর ক্ষেত্রে তো তা না, রোনালদো একটু আইসোলেটেড। মেসি মেসিই। এমন কিছু অবিশ্বাস্য জিনিস সে মাঝে মাঝে করে! তার কিছু কিছু গোল কোনো ব্যাখ্যায় মেলানো যাবে না। মানুষ কীভাবে এটা করতে পারে! এবারে গত ওয়ার্ল্ড কাপের চেয়েও কম দৌড়াচ্ছে সে। তবে সময়মতো জেগে উঠছে। কখন এবং কোথায় বল পেলে দৌড়াবে, সেটা হয়তো সতীর্থরা জানে।
আর্জেন্টিনার বড় বেনিফিট ওদের মেসি আছে। পি কে ব্যানার্জি একটা কথা বলেছিল, ‘পোলাও রান্ধতে হইলে পোলাওয়ের চাল লাগে। অর্ডিনারি চাল দিয়া খিচুড়ি হয়, পোলাও হবে না।’ ঠিকই তো, ইউ নিড রিসোর্স। মেসি না থাকলে এই ম্যাচে ওরা ফিরতে পারত না।
গত ২০ বছর ধরে মেসি আর রোনালদো দুই গ্রেট ফুটবলারের লড়াই দেখছি। রোনালদোর ব্যাপার হলো, সে পরিশ্রম করে ওই জায়গায় পৌঁছেছে। আর মেসি অনেকখানিই গড গিফটেড, বাকিটা সে নার্চার করেছে। মেসি তো রোনালদোর মতো অত এক্সারসাইজও করে না।






