ফ্লাইওভারে পুণ্ড্রনগর!

উত্তরের প্রবেশদ্বার বগুড়া শহরের মহাসড়কে গাড়ি ছুটিয়ে যাওয়ার সময় হুট করেই মনে হতে পারে, সময়ের চাকা যেন ঘুরে গেছে বহুকাল পেছনে। কংক্রিটের নিথর ও ধূসর দেয়াল যে শুধু বিজ্ঞাপন আর পোস্টার লাগানোর স্থান নয়, তার এক অনন্য প্রমাণ হয়ে উঠেছে বারোপুর ফ্লাইওভার। চার লেনের জাতীয় মহাসড়কে নির্মিত এই উঁচু গাঁথুনির ফ্লাইওভারের দেয়াল জুড়ে এখন জ্বলজ্বল করছে আড়াই হাজার বছরের পুণ্ড্রবর্ধনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস, পৌরাণিক গল্প আর লোকসংস্কৃতির অপূর্ব মেলবন্ধন। তুলির আঁচড় ও অ্যাক্রিলিক রঙের ছোঁয়ায় ফ্লাইওভারটি আজ পরিণত হয়েছে এক বিস্তৃত উন্মুক্ত আর্ট গ্যালারিতে।
দূর থেকে চোখ মেললেই নজর কাড়ে নীল আকাশের নিচে ইট-মাটির তৈরি প্রাচীন দুর্গনগরীর প্রতিরক্ষাপ্রাচীর, গোকুল মেধ বা বেহুলার বাসরঘর, ঐতিহাসিক জিয়ত কুণ্ডুর অবয়ব এবং প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক তোরণ। মহাসড়কের সৌন্দর্যায়ন এবং স্থানীয় সাংস্কৃতিক পরিচয়কে নতুন প্রজন্মের সামনে ভাস্বর করে তুলতে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ এই উদ্যোগ নিয়েছে। ওভারপাসের পূর্ব ও পশ্চিমের চারটি অংশ মিলে মোট ১১ হাজার বর্গফুট এলাকা জুড়ে আঁকা হচ্ছে এই বিশালাকার মুরালচিত্র।
বগুড়া প্রাচীন বাংলার প্রাচীনতম নগরী ‘পুণ্ড্রনগর’-এর ঐতিহ্যবাহী পুণ্যভূমি। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে করতোয়া নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল সুরক্ষিত দুর্গনগরী মহাস্থানগড়, যা ছিল প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্তির রাজধানী। মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন রাজবংশের উত্থান-পতনের নীরব সাক্ষী এই প্রাচীন নগরী।
ফ্লাইওভারের ক্যানভাসে রূপ পেয়েছে লোককাহিনি ও পৌরাণিক গাথা। মনসামঙ্গল কাব্যের অমর চরিত্র বেহুলা-লখিন্দরের স্মৃতিবিজড়িত ‘গোকুল মেধ’ এবং অলৌকিক জলের কাহিনিতে ঘেরা ‘জিয়ত কুণ্ডু’র ছবি পথচারীদের অতীত অনুরাগে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। দেয়ালের অন্য অংশে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বগুড়ার লোকসংস্কৃতি, কৃষি সমৃদ্ধি ও সাধারণ মানুষের জীবিকা। বগুড়ার সুপরিচিত কৃষিপণ্য লাল মরিচ ও আলুর উৎপাদন নিপুণভাবে আঁকা হয়েছে। ক্যানভাসে ভেসে উঠেছে প্রখর রোদে ছাতা মাথায় দিয়ে নারীদের আলু
এই সুবৃহৎ শৈল্পিক কর্মযজ্ঞের নেপথ্যে দিন-রাত মেধা ও শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন একঝাঁক নবীন ও তরুণ চারুশিল্পী। বগুড়া বিয়াম মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রভাষক ও ডিজিটাল আর্টিস্ট মো. আবু লায়েছ নিক্সনের দক্ষ দিকনির্দেশনায় চলছে এই চিত্রাঙ্কন। তিনি বললেন, ‘তরুণ প্রজন্মের কাছে বগুড়ার সমৃদ্ধ ইতিহাস তুলে ধরাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য। এই পথ দিয়ে যারা যাবে, তারা এই মুরাল চিত্রটি দেখলেই প্রাচীন পুণ্ড্রসভ্যতার ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে।’



