বিশ্বকাপ উন্মাদনায় আমরাই এগিয়ে

ইংল্যান্ডে একসঙ্গে খেলা দেখছেন ফুটবলপ্রেমীরা
তখন মাঝরাত। চারপাশ নিস্তব্ধ, ল্যাম্পপোস্টের আলোতে ভুতুড়ে পরিবেশ। রাস্তায় মাঝেমধ্যে চোখে পড়বে কিছু মানুষ, পাহারায় ব্যস্ত নাইটগার্ডরা। কিছুদূর হেঁটে গেলে একটি নির্দিষ্ট মোড়ে হঠাৎই আলোর ঝলকানি। হাজারো চোখ আটকে আছে ধবধবে সাদা কাপড়ের এক বড় পর্দায়। রেফারি বাঁশি বাজানোর সঙ্গে সঙ্গে পুরো এলাকার উল্লাস। সেই উল্লাস-উত্তেজনা চলল ৯০ মিনিট জুড়েই।
এ কিন্তু কোনো ফুটবল স্টেডিয়াম নয়, বাংলাদেশের চেনা কোনো পাড়া, চেনা কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। চার বছর পর বিশ্বকাপ যখন আসে, ফুটবল মানচিত্রে না থেকেও বাংলাদেশ যেন হয়ে ওঠে ফুটবলের এক ‘অঘোষিত রাজধানী’। বড় পর্দায় খেলা দেখার যে উৎসব এ দেশে তৈরি হয়, তা পুরো পৃথিবীতে অনন্য।
ফুটবলকে বলা হয় ‘দ্য বিউটিফুল গেম’। খেলার আসল সৌন্দর্য যদি আপনি দেখতে চান, তবে বিশ্বকাপের সময় ঢু মারতে হবে বাংলাদেশের পাড়া-মহল্লা, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে। ইউরোপ-আমেরিকায় খেলা দেখাটা যেখানে গ্যালারি বা ইনডোর পাবকেন্দ্রিক, বাংলাদেশে সেটা উন্মুক্ত আকাশের নিচে।
বড় স্ক্রিনের সামনে হাজারো মানুষের এই যে জমায়েত, টানটান উত্তেজনা— এ যেন বাঙালির এক অনন্য সামাজিক মেলবন্ধন।
বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার মাসখানেক আগে থেকেই বদলে যেতে শুরু করে বাংলাদেশের পাড়া-মহল্লাগুলোর চালচিত্র। কে কার চেয়ে বড় পতাকা টানাবে, কোন পাড়ার চেয়ে কার বড় স্ক্রিন, এ নিয়েই শুরু হয় লড়াই।
মহল্লার ছেলেরা চাঁদা তুলে ভাড়া করে প্রজেক্টর, সঙ্গে সাদা কাপড়ের বড় পর্দার। খোলা গ্যারেজ, বাড়ির ছাদ, আঙিনা, চায়ের দোকানের সামনের চত্বর রাতারাতি রূপ নেয় এক স্টেডিয়ামেরর। চেয়ার, পিঁড়ি, এমনকি মাটিতেই বসে পড়ে সব বয়সী মানুষ।
৭০ বছরের বৃদ্ধ থেকে শুরু করে ৫ বছরের শিশু, একসঙ্গে সেই উৎসবের অংশ হয় এলাকার সবাই। গোলের আনন্দ, গোল মিসের হতাশা, প্রিয় দল জিতলে উল্লাস, হারলে কান্না— এ যেন এক অবিশ্বাস্য সামাজিক মেলবন্ধন। খেলা শেষে চলে তর্ক-বিতর্ক আর সঙ্গে ধোঁয়া ওঠা চায়ের আড্ডা।
মহল্লার গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্যাম্পাসে এ উন্মাদনা পায় এক ভিন্ন মাত্রা। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, মুহসীন হলের মাঠ কিংবা সলিমুল্লাহ হলের বারান্দা, সবখানেই চলে বিশ্বকাপ উন্মাদনা।
বিশ্ববিদ্যালয়ে
আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের ম্যাচগুলোর উত্তেজনার পারদ থাকে আকাশচুম্বী। হাজারো তরুণ-তরুণী
জার্সি গায়ে, গালে প্রিয় দলের পতাকা এঁকে বিকেলে থেকেই অপেক্ষায় থাকেন। পুরো সময়টাই
চলে আনন্দ, উল্লাস, হাসি, কান্না। জয়ের উল্লাস কিংবা হারের বেদনা, ভাগাভাগি করে নেন
সবাই।
অনেকেই বলতে পারেন, ইউরোপ বা লাতিন আমেরিকার দেশগুলোই তো ফুটবলের আসল জায়গা। সেখানেও গ্যালারিতে লাখো মানুষ গলা ফাটায়। পাব বা ফ্যান জোনে খেলা দেখার সংস্কৃতিও সেখানে আছে। কিন্তু বাংলাদেশ কেন আলাদাভাবে জায়গা করে নিয়েছে?
ইউরোপ বা লাতিনে ফুটবল একটি বিশাল ‘ইন্ডাস্ট্রি’। সেখানে খেলা দেখাটা অনেক বেশি নিয়মতান্ত্রিক। অন্যদিকে, বাংলাদেশে ফুটবল নিয়ে কোনো বাণিজ্যিক স্বার্থ নেই, নেই কোনো নিজস্ব প্রাপ্তিও। বাংলাদেশ আদৌ কখনো বিশ্বকাপের মঞ্চে জায়গা করে নিতে পারবে কি না, সেও অজানা। এ উন্মাদনা তাই সম্পূর্ণ রূপেই এক নিখাদ, নিঃস্বার্থ আবেগ।
ইউরোপে কনকনে শীতে বা কঠোর নিয়মের বেড়াজালে এভাবে মাঝরাতে খোলা আকাশের নিচে হাজারো মানুষের সমাগম রীতিমতো অসম্ভব ব্যাপার। বাংলাদেশের আবহাওয়ার উষ্ণতা আর মানুষের মনের উন্মুক্ততায় এ আয়োজন রূপ নেয় অনন্য এক আয়োজনে।
তবে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর বা আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেসের বস্তি, লাতিন ফুটবলের প্রাণকেন্দ্রে বিশ্বকাপ আসা মানেই যেন বড় এক উৎসব। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে থেকেই এখানকার অলিগলি সেজে ওঠে প্রিয় দলের পতাকার রঙে। ভাঙাচোরা দেয়ালগুলো রূপ নেয় ক্যানভাসে— যেখানে হাসিমুখে তাকিয়ে থাকেন পেলে, ম্যারাডোনা কিংবা মেসি, নেইমার।
খেলা দেখার জন্য কোনো দামি টিকিটের প্রয়োজন নেই এখানে, দরকার হয় না শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরেরও। একটি ভাঙা টেবিলের ওপর রাখা পুরনো টেলিভিশন সেটকে কেন্দ্র করেই জমে ওঠে হাজারো মানুষের ভিড়। ড্রামের আওয়াজ, আতশবাজির ধোঁয়া আর সাম্বার ছন্দ; বিশ্বকাপ এখানে পায় অনন্য এক রূপ।
লাতিন বস্তির মানুষের কাছে ফুটবল কেবল বিনোদন নয়, দারিদ্র্য আর কঠিন বাস্তবতাকে ভুলে কয়েক ঘণ্টার জন্য স্বর্গীয় আনন্দে মেতে ওঠার একমাত্র চাবিকাঠিও বটে।
হাজার মাইল দূরের ইউরোপে চিত্রটা একেবারে ভিন্ন। বাইরে হয়তো টিপটিপ বৃষ্টি বা কনকনে ঠান্ডা, কিন্তু ছোট্ট কোনো পাবের ভেতরের পরিবেশ তখন আয়েশ অনুভবের মতো গরম। কাঠের তৈরি প্রাচীন টেবিল-চেয়ার, আবছা আলো আর জায়ান্ট স্ক্রিন; ইউরোপীয় ফুটবলের প্রাচীন এ উপভোগের ধারা যেন এখনো বহমান।
পাবের ম্যাচ দেখার
সংস্কৃতি অদ্ভুত এক মেলবন্ধন তৈরি করে। এখানে সমর্থকরা আসেন গায়ে প্রিয় ক্লাবের বা
দেশের জার্সি জড়িয়ে।
লাতিনের মতো এখানে হয়তো প্রকাশ্য নাচ-গান নেই। খেলা শুরুর আগেই গ্লাসে গ্লাসে ফেনা তোলে ‘শিল্ড’ বা ‘আইরিশ স্টাউট’ বিয়ার। ইউরোপের পাবে খেলা দেখার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো তাদের সমবেত গান বা ‘চ্যান্ট’। পুরো পাবের শত শত মানুষ এক সুরে গান গেয়ে প্রিয় দলকে অনুপ্রেরণা দেয়।
লাতিন বস্তির উন্মাদনা খোলা আকাশের নিচে। যেখানে ধুলোবালি আর অকৃত্রিম আবেগের ছোঁয়া। আর ইউরোপের পাবের উন্মাদনা চার দেয়ালের ভেতরে। আছে বিয়ারের চুমুক আর তীব্র স্নায়ুচাপ। একটিতে আছে লাতিন সাম্বার ছন্দ ও বেঁচে থাকার লড়াই, অন্যটিতে আছে ইউরোপীয় ঘরানার শৃঙ্খলা ও মেলবন্ধন। দিনশেষে এ দুই ভিন্ন জগৎকে এক সুতোয় বেঁধে রাখে ফুটবলের সেই চিরন্তন জাদু।
তবে বাংলাদেশের মানুষের হিসাবটা একেবারেই আলাদা। ২০২২ বিশ্বকাপে এই পাড়া-মহল্লা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আর্জেন্টিনার প্রতি বাংলাদেশের মানুষের অবিশ্বাস্য ভালোবাসা পৌঁছে গিয়েছিল আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের কাছে। দুই দেশের মধ্যে এরপর থেকেই যেন আত্মার সম্পর্ক। বাংলাদেশি শুনলেই আর্জেন্টাইনরা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তেই তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন!
বাংলাদেশের মানুষের এ ফুটবল প্রেমকে ফিফা নিজেও বহুবার প্রশংসায় ভাসিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশের সমর্থকদের এ উন্মাদনার ভিডিও বিশ্ব জুড়ে কোটি মানুষের নজর কেড়েছে। তাই সব মিলিয়ে ফুটবল বিশ্বে রীতিমতো অপরিচিত, বিশ্বকাপে যাওয়ার স্বপ্ন যাদের সুদূরপরাহত; সেরকম একটি দেশের সমর্থকদের এমন ফুটবল আগেব অবশ্যই অনন্য।








