রোক্সানের জন্য এলিজি

ইয়ান ডিওমান্ডে তার অকালপ্রয়াত ছোট বোন
২০১৪ সালে সাবেক বেসবল তারকা ডেরেক জেটার প্রতিষ্ঠিত দ্য প্লেয়ার্স ট্রিবিউন খেলোয়াড়দের একেবারে আন্তরিক, খোলামেলা অনুভূতি প্রকাশের জন্য চিঠি লেখার সুযোগ করে দেয়। আইভরি কোস্টের তারকা ইয়ান ডিওমান্ডে তার অকালপ্রয়াত ছোট বোনকে উদ্দেশ্য করে একটি আইকনিক চিঠি লেখেন। চিঠিটির নির্বাচিত অংশ আগামীর সময়ের পাঠকের জন্য বাংলায় রূপান্তর করেছেন মোহাম্মদ ওয়াহিদ হোসেন
প্রিয় রোক্সান,
মনে পড়ে, যখন একজন কেউ আমাকে একটা ফেইক ম্যানইউ শার্ট এনে দিয়েছিল, আর আমি একটা কালো শার্পি দিয়ে পেছনে লিখেছিলাম ‘রোনালদো ৭’? আমরা জানতাম না ধনী আর গরিব কাকে বলে। আমরা ছিলাম সুখী।
মনে পড়ে, একটা মাত্র বাড়িতে ২৫ জন মানুষ ঘুমানো। মা চাইত টিভিতে তার প্রিয় সোপ অপেরা দেখতে! সবাই চাইত সিনেমা দেখতে। মনে পড়ে, আমি ভান করতাম যে ঘুমিয়ে পড়েছি আর মাঝরাতে উঠে লুকিয়ে টিভি রুমে যেতাম? খুব কম ভলিউমে টিভি ছাড়তাম। আমি অন্ধকারে বসে টিভি দেখতাম আর দেখতাম স্বপ্ন।
তোমার মনে আছে, বড়রা ধুলোমাঠে ফুটবল খেলতে দেখে জোরে কিক করা দেখে আমার ডাকনাম দিয়েছিল রবার্তো কার্লোস। আমি এ নিয়ে খুবই রাগান্বিত ছিলাম, কারণ সিআরসেভেন ছিল আমার আইডল।
মনে আছে যখন বাড়ি থেকে অনেক দূরে খেলতে চলে গিয়েছিলাম? আমার বয়স তখন মাত্র ৯ বছর। অনেক দূরে, ঘানা সীমান্তের কাছে ইন্টার ফুট সুড কোমোতে।
মনে পড়ছে না তোমাকে বলেছি কি না যে, আমি এবং অন্য বাচ্চারা পাশের গ্রামে গিয়ে আলু চুরি করতাম, কারণ আমরা এত ক্ষুধার্ত ছিলাম! আমরা এটাকে বলতাম ‘ব্যাংক ডাকাতি!’ দুটো বাচ্চা দোকানিকে অন্যদিকে ব্যস্ত রাখত আর অন্য আঠারোজন আলু নিয়ে চম্পট দিত। আলুগুলো খুব ভালোও ছিল না। তবুও সেগুলো লাগত অমৃতের মতো। হা হা হা! এখনো আলুই আমার সবচেয়ে প্রিয় খাবার। সিদ্ধ আলু আর অল্প একটু তেল। এ খাবার আমাকে সেই দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
মনে আছে কি, আমি যখন আমার প্রথম ক্লিটস (স্পাইকওয়ালা জুতো) জোড়া পেলাম, সেগুলো নিয়ে ঘুমিয়েছিলাম। বড় হয়ে ওঠার সময়ে আমি সবসময় আমার সাদা প্লাস্টিক স্যান্ডেলগুলো পরে খেলেছি। এখনো যখন বাড়ি ফিরে যাই, ওগুলো পরেই খেলি। এটা তো আমাদের ঐতিহ্য!
... তোমার বয়স ছিল মাত্র দশ বছর, আর তখনই তুমি আমার এজেন্ট হয়ে গিয়েছিলে।
তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে, আমরা কীভাবে বসে গল্প করতাম আর স্বপ্ন দেখতাম ফ্রান্স চলে যাওয়ার! আমরা কত শপিং করব, আমাদের নিজেদের অ্যাপার্টমেন্ট থাকবে, আমি হব এক ধনী ফুটবলার, আমাদের থাকবে গাড়ি আর বড় একটা বাড়ি, আর তোমাকে কোনো কিছু নিয়েই দুশ্চিন্তা করতে হবে না। অন্য সবাই যখন হাসত, তুমিই ছিলে সেই একজন যে বিশ্বাস করত আমি হতে যাচ্ছি পরবর্তী ক্রিশ্চিয়ানো।
মনে আছে তো, আমি যখন ১৫ বছর বয়সে হাই স্কুলে পড়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গেলাম, কী প্রচণ্ডভাবেই না বাড়ি মিস করছিলাম? মাসের পর মাস আমি বুঝতেই পারতাম না অন্যরা কী বলছে। ওরা আমাকে এক ফরাসি ছেলের পাশে বসতে দিল এবং সে আমাকে শিক্ষক যা বলছেন তা বুঝিয়ে দিত। তোমার হয়তো মনে আছে, ওই যে আমি তোমাকে কল করে বলেছিলাম, তুমি বিশ্বাস করবে না, এখানে বাচ্চারা শিক্ষকের সঙ্গে তর্ক করে! তুমি তো জানোই, দেশে আমরা বয়োজ্যেষ্ঠদের দিকে এমনকি চোখ তুলে তাকাতামও না!
তোমার মনে আছে, যখন আমাকে ওরা বোর্নমাউথে ট্রায়ালের জন্য নিয়ে গিয়েছিল? তারপর... চেলসি, রেঞ্জার্স, অলিম্পিয়াকোস, ক্রিস্টাল প্যালেস? এক ট্রেইনিং সেশনের পর এজে (এবেরেচি এজে, ইংলিশ ফুটবল স্টার) আর ওলিসে (ফরাসি ফুটবল স্টার) আমার কাছে এলো এবং বলল— ‘বাচ্চা, তুমি অনেক ভালো খেলো।’ কিন্তু তবুও ওরা আমাকে সাইন করেনি।
আমার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। আমার স্বপ্ন শেষ হয়ে গিয়েছিল। ওরা আমাকে আফ্রিকা ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিল এবং আমরা একসঙ্গে কেঁদেছিলাম। একমাত্র তুমিই আমার ওপর থেকে বিশ্বাস হারাওনি।
কয়েক সপ্তাহ পরে, আমি লেগানেসে (ফরাসি লিগ ওয়ানের দল) সাইন করলাম এবং আমরা আবার কাঁদলাম, সুখের কান্না।
সেই সময় পর্যন্ত আমার ভেতর অনুভূতি ছিল। এখন, আমি কিছুই অনুভব করি না। নিজেকে এমনকি আর মানুষ বলেও মনে হয় না। তোমার মৃত্যু আমাকে শূন্য করে দিয়ে গেছে।
আমার মনে হয় না যখন ওরা আমাকে বলল তুমি চলে গেছ, তখন আমি একফোঁটা চোখের পানিও ফেলেছি। এটি আমার কাছে ছিল এমনই এক অপ্রত্যাশিত ধাক্কা!
লেগানেসের পক্ষে আমার ডেব্যুর সপ্তাহ কয়েক পরেই এটি ঘটল। মাত্র ১৮ বছর বয়সে রিয়াল মাদ্রিদের বিরুদ্ধে কয়জনের ডেব্যু হয়?
এটি পাগলামি।
এটি একটি স্বপ্ন।
আর এর পরেই সেই দুঃস্বপ্ন। বাড়ি থেকে কেউ একজন আমাকে কল করেই যাচ্ছিল। আমি বিরক্ত হচ্ছিলাম। বুঝতে পারছিলাম না কেন ওরা আমাকে কল করেই যাচ্ছিল।
আমি কলটা ধরলাম এবং ওরা এমনকি খবরটি একটু নরমভাবেও বলল না। তুমি তো জানোই আমরা কেমন। কোনো ইমোশন নয়। কেবল...
‘তোমার বোন আর নেই।’
মানে?
‘ও মারা গেছে।’
কী বলছ তুমি?
‘কেউ একজন ওর পানীয়তে কিছু মিশিয়ে দিয়েছিল এবং ও আর জেগে ওঠেনি। ও চলে গেছে।’
তুমি ছিলে মাত্র ১৫ বছর বয়সী।
১৫!
আমি কোনো জবাব খুঁজে পাইনি। আমি আসলে জানি না জবাবটা জানতে চাই কি না। হয়তো এটি ঈর্ষা। হয়তো এটি আমাদের দেশে যেমনটি সচরাচর ঘটে তেমনই কিছু। হয়তো আমি তোমাকে সুরক্ষা দিতে পারতাম। আমি আসলে জানি না।
... ফুটবল মাঠে আমি যা কিছুই, তা তোমার জন্য।
তোমার সঙ্গে শেষবার দেখা হওয়ার পর এত কিছু ঘটেছে... তুমি বিশ্বাসই করবে না। আমি নিজে বিশ্বাস করি কি না, তাও জানি না।
তুমি জানো পাগলামি কাকে বলে? আমার ডেব্যুর পর আমি আসলেই এমবাপ্পের সঙ্গে জার্সি বদল করেছিলাম! মনে আছে আমরা যখন ওকে টিভিতে দেখতাম এবং তুমি বলতে, এমবাপ্পে? ঠিক, ও ভালো। কিন্তু আমার ভাই ওর চেয়েও ভালো।
একটা বিষয়ে আমি ভুল ছিলাম। আমি ধনী হতে চাই না। আমি দেখেছি এটা মানুষকে কীভাবে বদলে দেয়, এমনকি পরিবারের সদস্যদেরও। যখন লেগানেসে ছিলাম, আমি যা উপার্জন করতাম তার সবটাই বাড়িতে পাঠাতাম। একপর্যায়ে এমন হলো যে, আমি আর টাকা-পয়সা চাইতামই না। এটা হয়ে দাঁড়াল শুধু একটা বোঝা। ওদের চাওয়ার কোনো শেষ ছিল না। আমার ধারণা ওরা ভাবত যে আমি এরই মধ্যে মিলিয়নেয়ার হয়ে গেছি। আমার এমনকি একটা অ্যাপার্টমেন্টও ছিল না! আমি ট্রেইনিং মাঠের পাশে একটা রুমে থাকতাম যেখানে একটা টিভিও ছিল না। শুধু ফুটবল আর ঘুম, ফুটবল আর ঘুম।
আমি এখন আর একটা বড় বাড়ি চাই না। আমি গাড়ি চাই না। আমি শুধু ফুটবলে আমার সবটুকু ঢেলে দিতে চাই। সবকিছু। এই পৃথিবীকে দেখানোর জন্য যে, আমার বোন ঠিক ছিল।
হাহ্... তুমি ভাবছ এটা হাসির। আমি যখন আর বি লাইপজিগে (জার্মান বুন্দেসলিগা ক্লাব) গেলাম, আমি সবসময় লেট হতাম। আসলে লেট না। আমি সময়মতো যেতাম, জার্মানিতে যার মানে আমি অনেক লেট।
তো তুমি তো জানোই এরপর আমি কী করতে পারি। আমি সবখানে নির্ধারিত সময়ের ৯০ মিনিট আগে হাজির হওয়া শুরু করলাম। আমি সবসময়ই এত আগে পৌঁছাচ্ছিলাম যে, ওরা আমাকে ‘দ্য জার্মান’ নামে ডাকা শুরু করল!
... আমরা আগামীকাল বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছি। সত্যি সত্যিই। তোমার ভাই আইভরি কোস্টের হয়ে খেলতে যাচ্ছে, দ্রগবার মতো, ইয়া তোরের মতো, গারভিনিয়োর মতো।
একমাত্র ফুটবল মাঠকেই এখন আমার ঠিকানা মনে হয়। এই একটিমাত্র জায়গায় আমি শান্তি অনুভব করি এবং আমি তোমার সঙ্গে কথা বলতে পারি। আমার শুধু মনে হয় তুমি যদি এখনো এখানেই থাকতে, আমি তোমাকে বলতে পারতাম— আমরা করতে পেরেছি।
তুমি সবসময় বলতে আমি ক্রিশ্চিয়ানোর চেয়েও ভালো হতে পারি। আমার যদি ওর সঙ্গে ওখানে দেখা হয়, আমি ওকে তোমার কথা বলব।
আমি এখন এটিকে আর একটি খেলার মতো করে দেখি না। আমি এটিকে দেখি একটি মঞ্চ হিসেবে। তুমি আমার মধ্যে যা দেখেছিলে, তা সারা বিশ্বকে দেখানোর সুযোগ হিসেবে দেখি। আমি যতবার গোল করব, আমি নিশ্চিত করব যে, সবাই তোমার নাম জানবে। আমি নিশ্চিত করব যেন ওরা তোমাকে ভুলতে না পারে।
... শান্তিতে ঘুমাও, রোক্সান









