দ্রগবার ডাকে

ফুটবল যে একটি দেশের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ থামানোর হাতিয়ার হতে পারে— তার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল পশ্চিম আফ্রিকার দেশ আইভরি কোস্টের জাতীয় ফুটবল দল। লিখেছেন ইমরানুর রহমান
ঘটনার সূত্রপাত ২০০৫ সালের ৮ অক্টোবর। সেদিন সুদানের ওমদুরমান স্টেডিয়ামে স্বাগতিক সুদানকে ৩-১ গোলে পরাজিত করে আইভরি কোস্ট জাতীয় ফুটবল দল। এই জয়ের মাধ্যমে ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে তারা। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায় তারা। তবে এই অভূতপূর্ব অর্জনের পরও দলের ড্রেসিংরুমে কোনো উল্লাস ছিল না, বরং পুরো পরিবেশ ছিল থমথমে। কারণ খেলোয়াড়রা জানতেন, তাদের প্রিয় মাতৃভূমি তখন এক ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
দেশের উত্তরভাগ নিয়ন্ত্রণ করছিল মুসলিমপ্রধান শক্তিশালী বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘নিউ ফোর্সেস’ এবং দক্ষিণভাগ ছিল খ্রিস্টানপ্রধান সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারায় এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।
‘দি এলিফ্যান্টস’ নামে পরিচিত আইভরি কোস্ট ফুটবল দলটির বিশেষত্ব ছিল, এতে দেশের দুই অঞ্চলের খেলোয়াড়রাই একসঙ্গে খেলতেন। দলের প্রধান তারকা দিদিয়ের দ্রগবা ছিলেন দক্ষিণের সন্তান, অন্যদিকে রক্ষণভাগের কলো তুরে ও মিডফিল্ডের ইয়াইয়া তুরে ছিলেন উত্তরের মুসলিম পরিবারের সন্তান।
সুদানের বিপক্ষে ম্যাচটি জেতার পর ড্রেসিংরুমে উপস্থিত একটি লাইভ টিভি ক্যামেরার সামনে এসে দাঁড়ান চেলসি কিংবদন্তি দিদিয়ের দ্রগবা। তার ইশারায় ইয়াইয়া তুরে, কলো তুরে, দিদিয়ের জোকোরা ও এমানুয়েল ইবুর মতো তারকা ক্যামেরার সামনে গোল হয়ে দাঁড়ান। এরপর সবাইকে চমকে দিয়ে দ্রগবা মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসেন এবং সতীর্থরাও হাত ধরাধরি করে তার সঙ্গে হাঁটু গেড়ে বসেন।
সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে দ্রগবা দেশবাসীর উদ্দেশে বললেন, ‘আইভরি কোস্টের উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমের ভাই-বোনেরা, আজ আমরা প্রমাণ করেছি যে সমস্ত আইভরিয়ান একসঙ্গে মিলেমিশে একটি সাধারণ লক্ষ্য নিয়ে লড়তে পারে।’
এরপর হাত জোড় করে তিনি বললেন, ‘আফ্রিকার এত সুন্দর একটি দেশ এভাবে যুদ্ধে ধ্বংস হতে পারে না। আমরা আপনাদের কাছে হাঁটু গেড়ে ভিক্ষা চাচ্ছি, দয়া করে আপনারা অস্ত্র নামিয়ে রাখুন এবং দেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হতে দিন।’ তার সতীর্থরা সমস্বরে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা ও শান্তি চেয়ে গান গাইতে শুরু করেন।
এই সম্প্রচারের পর আশ্চর্যজনকভাবে দেশের পরিস্থিতি শান্ত হতে শুরু করে এবং উভয় পক্ষ একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়ে আলোচনার টেবিলে বসে। সাময়িকভাবে থমকে যায় বছরের পর বছর ধরে লা গৃহযুদ্ধ।
স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২০০৭ সালের শুরুতে দ্রগবা আরও একটি যুগান্তকারী ও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। আফ্রিকান কাপ অব নেশনসের বাছাইপর্বে মাদাগাস্কারের বিরুদ্ধে আইভরি কোস্টের হোম ম্যাচটি দ্রগবার বিশেষ অনুরোধে স্থানান্তর করা হয় বিদ্রোহীদের প্রধান ঘাঁটি ‘বুয়াক’ শহরে।
সেদিন সরকারি সেনা ও বিদ্রোহী বাহিনীর সদস্যরা যৌথভাবে স্টেডিয়ামের নিরাপত্তা দেন। এই ঐতিহাসিক ম্যাচের পর আইভরি কোস্টের দুই পক্ষ পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করে এবং দেশটিতে স্থায়ীভাবে শান্তি ফিরে আসে।




