বিশ্বকাপের মাঠে নৌকাবাইচ!

বিশ্বকাপ কাঁপাচ্ছে নরওয়ের ঐতিহাসিক ভাইকিং রোয়িং। বিশ্বকাপের বিচিত্র উদযাপনের গল্প শুনিয়েছেন সত্যজিৎ কাঞ্জিলাল
খ্রিস্টীয় ৮০০ থেকে ১০৫০ অব্দের মধ্যবর্তী সময়ে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অঞ্চল জুড়ে ছিল পরাক্রমশালী ভাইকিং যোদ্ধাদের রাজত্ব, যা আধুনিক নরওয়ে গঠনে বিশাল ভূমিকা রেখেছিল। ভাইকিংদের রাজত্বের অবসান হয়েছে সেই এগারো শতকে। মূলত নিজেদের সেই সমৃদ্ধ ইতিহাস ও পূর্বপুরুষদের বীরত্বকে শ্রদ্ধা জানাতেই এই অভিনব উদযাপনের সৃষ্টি। আইসল্যান্ডের বিখ্যাত ‘ভাইকিং ক্ল্যাপ’-এর কথা ফুটবলপ্রেমীদের জানা থাকলেও ‘ভাইকিং রোয়িং’-এর আইডিয়াটি একদমই নতুন। ওলে ফ্রয়েস্তাদ নামে নরওয়ের এক একনিষ্ঠ ফুটবল সমর্থক এই উদযাপনের জনক। চলতি বছরের মার্চ মাসে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচে নরওয়ের সমর্থক গোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়ে ওলে প্রথম এই নৌকাবাইচ উদযাপন করেন। তখন এটি গ্যালারিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে চলতি বিশ্বকাপে এসে এই উদযাপন পরিণত হয়েছে বৈশ্বিক উন্মাদনায়।
সেনেগালের বিপক্ষে ৩-২ গোলে জয়ের ম্যাচ শেষে ভাইকিং উদযাপন ফুটবলবিশ্বে ঝড় তোলে। উদযাপনের মূল দৃশ্যটি বেশ উপভোগ্য। মাঠে থাকা ফুটবলার এবং গ্যালারির হাজার হাজার সমর্থক একসঙ্গে বসে পড়েন। এরপর একটি ড্রামের তালে তালে সবাই একসঙ্গে নিজেদের কাল্পনিক জাহাজের দাঁড় টানার ভঙ্গিতে শরীর সামনে-পেছনে দুলিয়ে যান। ড্রামের প্রতি দুই বিট পর পুরো স্টেডিয়াম একসঙ্গে সমস্বরে চিৎকার করে ওঠে— ‘রো!’, যার অর্থ ‘দাঁড় টানো’। ড্রামের গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাঁড় টানার গতি আর গ্যালারির গর্জনও তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। স্টেডিয়ামের গ্যালারি ছাপিয়ে আমেরিকার এস্কেলেটর, নিউ ইয়র্ক সিটির সাবওয়ে স্টেশন, এমনকি খোদ টাইমস স্কয়ারের বুকেও দেখা গেছে নরওয়েজিয়ানদের এই অভিনব নৌকাবাইচ উদযাপন।
গোল যদি হয় ফুটবলের প্রাণ, তবে উদযাপন তার ভাষা। এর সেরা বহিঃপ্রকাশগুলো যুগে যুগে মনে দাগ কেটেছে ফুটবলপ্রেমীদের
ফুটবল নিয়ে মার্কিনিদের অনীহা চিরন্তন। তবে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ভাইকিং ঢেউয়ে তারাও গা ভাসিয়েছেন। আমেরিকার জনপ্রিয় টিভি শো ‘গুড মর্নিং আমেরিকা’র স্টুডিওতে নরওয়ের একদল ফুটবল সমর্থককে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তারা সেখানে গিয়ে ভাইকিং উদযাপন করে দেখান। ব্রাজিলের বিপক্ষে শেষ ষোলোতে ঐতিহাসিক জয়ের পর এই উদযাপন রীতিমতো পাগলামির পর্যায়ে চলে যায়। ওসলোর রাস্তায় লক্ষাধিক মানুষের ঢল নামে, চলে নৌকাবাইচ উদযাপন। নরওয়ের পার্লামেন্টেও আইনপ্রণেতারা অধিবেশন থামিয়ে একসঙ্গে নৌকার দাঁড় বাইতে থাকেন। দেশটির সেনাবাহিনী পর্যন্ত ভাইকিং রোয়িং উদযাপন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে ভিডিও। শুধু তাই নয়, রাজকীয় আভিজাত্যের খোলস ভেঙে সাধারণ মানুষের বাঁধভাঙা উল্লাসে যোগ দেন খোদ নরওয়ের যুবরাজ হ্যাকন। ভক্তদের সঙ্গে মাটিতে বসে তিনিও নৌকার দাঁড় টেনেছেন!
এবার একটু অন্যদিকে চোখ ফেরাই। বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে আনন্দ ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনে সৃষ্ট কিছু দলীয় উদযাপন অমর হয়ে আছে। ২০১০ বিশ্বকাপে মেক্সিকোর বিপক্ষে গোল করে দক্ষিণ আফ্রিকার সিপিওয়ে শাবালালা ও তার সতীর্থদের সারিবদ্ধ আফ্রিকান নাচ আজও চোখে ভাসে। ২০১৪ আসরে কলম্বিয়ার হামেস রদ্রিগেসদের চমৎকার ছন্দের ‘সালসা নাচ’ ছড়াত উৎসবের আমেজ। ২০০২ সালে ফ্রান্সকে হারিয়ে সেনেগালের জার্সি ঘিরে বৃত্তাকার আফ্রিকান নৃত্য ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা বিজ্ঞাপন। মাঠের এসব মেলবন্ধন আর যৌথ উল্লাস ফুটবলকে করেছে আরও রঙিন ও বৈচিত্র্যময়।
গোল যদি হয় ফুটবলের প্রাণ, তবে উদযাপন হলো তার ভাষা। এই ভাষার সেরা বহিঃপ্রকাশগুলো যুগে যুগে দাগ কেটেছে ফুটবলপ্রেমীদের মনে। ১৯৭০ সালে জার্জিনহোর কোলে চড়ে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল সম্রাট পেলের ‘লিপ অব জয়’ কিংবা ১৯৯৪ সালে বেবেতোর নবজাতককে দোলানোর সেই ভঙ্গি আজও ফুটবল ইতিহাসের সেরা বিজ্ঞাপন। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ক্যামেরার সামনে দিয়েগো ম্যারাডোনার সেই হিংস্র চিৎকার কিংবা জার্মানির ফিলিপ লামের হাঁটু গেড়ে স্লাইড নেওয়ার দৃশ্যগুলো যেমন ভোলার নয়, ঠিক তেমনই আইকনিক হয়ে উঠেছে ফ্রান্সিসকো তোত্তির বুড়ো আঙুল চোষার পারিবারিক আবেগ। আর বর্তমান ফুটবল বিশ্ব তো বুঁদ হয়ে আছে রোনালদোর ট্রেডমার্ক ‘সিউউউউউ’ আর লিওনেল মেসির কানের পাশে হাত রেখে ‘টোপো গিগিও’র জাদুতে।





