বিশ্বকাপে গোয়েন্দাগিরি

ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি গোলকিপার গর্ডন ব্যাংকস
আধুনিক ফুটবলে প্রতিপক্ষের কৌশল জানার অদৃশ্য লড়াইকে অনেকে বলেন ‘স্পাই গেম’। লিখেছেন রবিউল কমল
একটি ড্রোন। একটি দুরবিন। একটি লুকানো ক্যামেরা। এমনকি একটি পর্যটকবাহী বেলুনও হয়ে উঠতে পারে এ স্পাই গেমের মাধ্যম বা গুপ্তচরবৃত্তির হাতিয়ার।
২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপ। দক্ষিণ কোরিয়ার অনুশীলন চলছে। দূরে এক ব্যক্তি দুরবিন হাতে দাঁড়িয়ে। পরে জানা গেল, তিনি সুইডেন দলের স্কাউট। ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পেতেই আলোড়ন ওঠে। মজার বিষয়, দক্ষিণ কোরিয়ার কোচ তখন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘তারা ইচ্ছে করেই খেলোয়াড়দের জার্সির নাম্বার অদলবদল করে অনুশীলন করাচ্ছেন।’ কারণ যদি কেউ দেখেও, তাহলে যেন বিভ্রান্ত হয়। মানে গোয়েন্দাগিরির জবাবে পাল্টা গোয়েন্দাগিরি!
২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিক। নারী ফুটবল শুরু হওয়ার আগেই হইচই পড়ল। নিউজিল্যান্ড দলের অনুশীলন করছিলেন যেখান তার ওপর উড়ছিল একটি ড্রোন। তদন্তে উঠে আসে, সেটি কানাডা দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি ড্রোন। ঘটনাটি মুহূর্তেই আন্তর্জাতিক শিরোনাম হয়ে যায়।
পরে কানাডার কোচিং স্টাফদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিষয়টি শুধু অলিম্পিকেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিশ্ব ফুটবলেও নতুন করে প্রশ্ন ওঠে, ড্রোন কি এখন প্রতিপক্ষের অনুশীলন দেখার সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র?
আসলে ড্রোন ছোট। দ্রুত উড়তে পারে। দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আর আধুনিক ক্যামেরা কয়েকশ মিটার দূরের ছবিও স্পষ্ট তুলে আনতে পারে। ফলে অনুশীলনের গোপনীয়তা রক্ষা করা আগের চেয়ে অনেক কঠিন হয়ে গেছে।
২০২৬ বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্র দলের অনুশীলন কেন্দ্র ছিল ক্যালিফোর্নিয়ার আরভাইনের গ্রেট পার্কে। সবকিছুই ঠিকঠাক। শুধু একটি সমস্যা, পার্কের বিখ্যাত পর্যটকবাহী বেলুন। চারশ ফুট ওপরে উঠে যায় সেটি। এত ওঠার মানে পুরো অনুশীলন মাঠ চোখের সামনে। যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল ফেডারেশনের কর্মকর্তারা তাই চিন্তায় পড়ে যান।
যদি প্রতিপক্ষের কেউ টিকিট কেটে ওপরে উঠে যায়? যদি পুরো অনুশীলন ভিডিও করে? একটি সাধারণ পর্যটন কেন্দ্র মুহূর্তেই সম্ভাব্য গুপ্তচরবৃত্তির আলোচনায় চলে এলো। এটাই আধুনিক ফুটবল।
ফুটবলের এ স্পাই গেম নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত স্বীকারোক্তিগুলোর একটি এসেছে মার্সেলো বেলসার কাছ থেকে। ২০১৯ সালে ইংল্যান্ডে লিডস ইউনাইটেডের কোচ ছিলেন তিনি। একদিন খবর বেরোল, প্রতিপক্ষের অনুশীলনের পাশে একজনকে দেখা গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই জানা গেল, লোকটি লিডসের। সাধারণত এমন অভিযোগ এলে ক্লাব অস্বীকার করে।
কিন্তু বেলসা করলেন উল্টোটা। সংবাদ সম্মেলন ডাকলেন। বললেন, ‘হ্যাঁ, প্রতিপক্ষের অনুশীলন পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।’ শুধু তাই নয়, তিনি ব্যাখ্যাও দিলেন— ‘আমি যত বেশি তথ্য পাই, তত বেশি নিশ্চিন্ত থাকি।’
সেই স্বীকারোক্তির পর লিডসকে জরিমানা করা হয়। কিন্তু বেলসার অকপট স্বীকারোক্তি ফুটবল দুনিয়ায় আজও আলোচনার বিষয়।
বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে যুক্তরাষ্ট্র দলের স্টাফদের একটি বিশেষ দায়িত্ব ছিল। অনুশীলনের আগে পুরো স্টেডিয়াম ঘুরে দেখা। কোথাও লুকানো ক্যামেরা আছে কি না, কোনো রেকর্ডিং ডিভাইস রাখা হয়েছে কি না, স্টেডিয়ামের ওপরের রিং, ট্রেনারের বেঞ্চের নিচে, অতিরিক্ত গোলপোস্টের পাশে ভালো করে দেখত তারা। কারণ, এমন অনেক জায়গা থেকে ছোট ক্যামেরা উদ্ধার করার অভিজ্ঞতা আছে তাদের।
কখনো কখনো এসব সন্দেহ হাসির জন্ম দেয়। একবার কানাডা নারী দলের কর্মকর্তারা অভিযোগ করলেন, স্টেডিয়ামের ছাদে ক্যামেরা বসিয়ে তাদের অনুশীলন রেকর্ড করা হচ্ছে। সবাই ছাদে তাকাল। পরে দেখা গেল, ওগুলো ক্যামেরা নয়। কবুতর তাড়ানোর জন্য বসানো প্লাস্টিকের পাখি।
এবার এক লাফে অনেক বছর পেছনে ফেরা যাক, ১৯৭০ বিশ্বকাপে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এটি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত রহস্যগুলোর একটি। কোয়ার্টার ফাইনালের আগে ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি গোলকিপার গর্ডন ব্যাংকস হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে তিনি কোয়ার্টার ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে খেলতে পারেননি। ইংল্যান্ড ২-০ গোলে এগিয়ে থেকেও ৩-২ গোলে হেরে যায়।
দশকের পর দশক ধরে গুজব ছিল, ব্যাংকসকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিষপ্রয়োগ করা হয়েছিল। ২০২৬ সালে সাংবাদিক গ্যাব্রিয়েল গেটহাউস তার ফাউল প্লেতে দাবি করেন, কিছু সাক্ষ্য ও স্মৃতিচারণ সিআইএর সম্পৃক্ততার সম্ভাবনার দিকটি ইঙ্গিত করে। তবে এখনো পর্যন্ত সিআইএর সংশ্লিষ্টতার কোনো সরকারি নথি বা চূড়ান্ত প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি।
তারও আগে ১৯৬৬ বিশ্বকাপে একটি গুজব ছড়িয়েছিল যে, সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি ইংল্যান্ডের তারকা খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করছিল, যেন মানসিক চাপ তৈরি করা যায়। বহু বই ও স্মৃতিকথায় এ গল্পের উল্লেখ থাকলেও এর পক্ষে কোনো সরকারি নথি নেই।
১৯৭৮ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ও পেরু ম্যাচ ঘিরে এখনো বিতর্ক আছে। সবচেয়ে বড় বিতর্ক ৬-০ গোলের ম্যাচ। সেবার আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে যেতে বড় ব্যবধানে জিততে হতো। তারা পেরুকে ৬-০ গোলে হারায়। বহু বছর ধরে অভিযোগ আছে, সামরিক সরকার রাজনৈতিক চাপ দিয়েছিল। গোয়েন্দা সংস্থা এসআইডিই আলোচনায় ছিল। বলা হয়, এজন্য বিনিময় ও খাদ্যশস্য সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তবে কোনো অভিযোগই আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। বিষয়টি নিয়ে অসংখ্য গবেষণা ও বই লেখা হয়েছে এবং এটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত ম্যাচগুলোর একটি।
আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ফুটবলার ম্যারাডোনা বহুবার দাবি করেছিলেন, ইতালিতে খেলার সময় এবং পরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সফরে তাকে গোয়েন্দারা নজরদারিতে রাখতেন। ইতালির মাফিয়া, নিরাপত্তা সংস্থা ও কর কর্তৃপক্ষ— সব মিলিয়ে তার জীবন ঘিরে অসংখ্য নজরদারির গল্প রয়েছে। তবে এসবের অনেকটাই ব্যক্তিগত দাবি; সবকিছু স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি।
স্পেনের ক্লাব ফুটবলে বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদের ব্যক্তিগত গোয়েন্দা নিয়োগের অভিযোগ বেশ পুরনো। সংবাদমাধ্যমে একাধিকবার খবর এসেছে যে, ক্লাব-রাজনীতিতে প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষ করে সভাপতিদের নির্বাচন, বোর্ড সদস্যদের তথ্য সংগ্রহ এবং সম্ভাব্য ফাঁসকারীদের শনাক্ত করতে ব্যক্তিগত গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান নিয়োগের অভিযোগ উঠেছে। এগুলো মূলত ক্লাব প্রশাসনকে ঘিরে, মাঠের কৌশল চুরি নয়।
এবার বলি কাতারের প্রজেক্ট মার্সিলেসের কথা। এটিকে বলা হয়, ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গোয়েন্দা অপারেশন। এটি শুধু একটি অনুশীলন দেখার ঘটনা নয়। এটি ছিল বিশ্ব ফুটবল প্রশাসনের ভেতরে ঢুকে তথ্য সংগ্রহ ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ।
২০২১ সালে অ্যাসোসিয়েটস প্রেসের অনুসন্ধানে দাবি করা হয়, ২০২২ বিশ্বকাপ আয়োজন নিশ্চিত করতে ও পরে সেই আয়োজন রক্ষা করতে কাতার সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা কেভিন চকারের প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল রিস্ক অ্যাডভাইজরসকে নিয়োগ করেছিল।
অভিযোগ অনুযায়ী, অপারেশনের লক্ষ্য ছিল বিশ্বকাপ আয়োজক নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তথ্য সংগ্রহ, ফিফার নির্বাহীদের ওপর নজরদারি, ইমেইল ও ডিজিটাল যোগাযোগে অনুপ্রবেশ, সমালোচকদের চিহ্নিত করা, কাতারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে ওঠা ঠেকানো, ফিফার অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আগাম তথ্য সংগ্রহ করা।
তদন্তে আরও দাবি করা হয়, এ অপারেশনটি প্রায় ৯ বছর ধরে চলেছিল এবং এতে কয়েক ডজন অপারেটিভ কাজ করতেন।
তদন্তে যেসব কৌশলের কথা এসেছে, তার মধ্যে ছিল ভুয়া পরিচয়ে লক্ষ্যবস্তুর কাছে পৌঁছানো, হানিপট বা ভুয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচয় ব্যবহার করে সম্পর্ক তৈরি, হ্যাকিংয়ের চেষ্টা, ফোন ও ইমেইল পর্যবেক্ষণের অভিযোগ, হোটেল ও বৈঠকের ওপর নজরদারি, ফিফার কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ।
এসব অভিযোগের অনেকটাই এপি, সুইস সম্প্রচারমাধ্যম এইআরএফ ও সুইস ইনফোর যৌথ অনুসন্ধানে উঠে আসে।
তবে কাতার সরকার সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য, এগুলো ভিত্তিহীন এবং দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে আনা হয়েছে।
এ ছাড়া তৎকালীন পূর্ব জার্মানির গোয়েন্দা সংস্থা স্টেসি শুধু রাজনীতিবিদ নয়, ফুটবলারদেরও নজরদারিতে রাখত। খেলোয়াড়রা কার সঙ্গে কথা বলছে, বিদেশ সফরে কেউ পালিয়ে যেতে পারে কি না, কোন সাংবাদিকের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে ইত্যাদি তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করা হতো। অনেক ক্লাবে স্টেসির গোপন তথ্যদাতা ছিল বলে জার্মানি এক হওয়ার পর প্রকাশিত নথিতে উঠে এসেছে।





