নবম-দশম শ্রেণি (বাংলা প্রথম পত্র)
অনুধাবনমূলক প্রশ্ন-উত্তর : সুভা

মূলভাব
‘সুভা’ গল্পের মূল চরিত্র সুভা। ছোট গল্পের জনক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) বিখ্যাত ছোট গল্পগুলোর মধ্যে ‘সুভা’ অন্যতম প্রধান এবং সুভা চরিত্রও বিশেষ আবেদনকারী একটি চরিত্র। সুভা বাক্প্রতিবন্ধী, তার পোশাকি নাম সুভাষিণী। সুভাকে মা তার গর্ভের কলঙ্ক মনে করলেও বাবা বাণীকণ্ঠের ছিল সুভার প্রতি হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা ও স্নেহ। সুভার মুখের ভাষা না থাকলেও চোখের অভিব্যক্তি তার মুখের ভাষার অভাব পূরণ করে দেয়। সুভার হৃদয় অনুভূতি ও অনুমান শক্তি প্রখর। চণ্ডীপুর গ্রামের অন্য বাচ্চারা তার সঙ্গে মিশত না, সবাই তাকে অদ্ভুত ভাবত। ভাষাহীন হওয়াই প্রকৃতির সঙ্গে সুভার সখ্যতা নিবিড়। আর নিবিড় ভাব ছিল প্রাণিকুলের সঙ্গে। ভাষাহীন প্রাণীর মধ্যে দুটি গাভী— সর্বশী ও পাঙ্গুলি, একটি ছাগল ও বিড়াল শাবক তার নিত্যসঙ্গী। নির্বাক প্রকৃতি ও নির্বাক মেয়ে সুভার অন্তরঙ্গতা বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে এ গল্পে। জ্যোৎস্নায় প্লাবিত প্রকৃতির সঙ্গে সুভার যৌবনে পদার্পণের সাদৃশ্যের বর্ণনায় ছোট গল্পকার অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়েছেন।
বাক্প্রতিবন্ধী মেয়ে সুভাষিণীর জন্য বাণীকণ্ঠের উৎকণ্ঠাও ছিল। তার বিয়ে নিয়ে বাণীকণ্ঠ চিন্তিত। বিয়ের বয়সী মেয়েকে নিয়ে সমাজে কানাঘুষাও বাড়তে থাকে। বাণীকণ্ঠকে এক ঘরে করে দেওয়ার কথা শোনা যায়। সমাজের কানাঘুষায় বাণীকণ্ঠ অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত নেন। ফলে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিন্তায় সুভার চির পরিচিত পরিবেশকে আঁকড়ে ধরে রাখার প্রচেষ্টায় গল্পটির আকস্মিক সমাপ্তি ঘটে।
অনুধাবনমূলক প্রশ্ন
১) সুভা শষ্পশয্যায় লুটিয়ে পড়ল কেন?
উত্তর: চিরচেনা প্রকৃতি ও মাতৃভূমি, নদীর পাড়, আমতলা, জামতলা ছেড়ে সুভা চলে যেতে চায় না। তাই সুভা শষ্পশয্যায় লুটিয়ে পড়ল।
বাক্প্রতিবন্ধী সুভার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রকৃতির সঙ্গে। এক মূকপ্রকৃতি ছেড়ে আর এক নির্বাক মেয়ে কোথাও যেতে চায় না। এই ভাষাহীন নীরব জগৎই সুভার বিশ্বস্ত সঙ্গী। প্রকৃতপক্ষে প্রকৃতিই সুভার সবচেয়ে কাছের জন। তাই সুভা তার চিরচেনা প্রকৃতি পরিবেশ ছেড়ে শহরে চলে যেতে চায় না। ফলে এক বুক কষ্ট নিয়ে সে প্রকৃতির অবারিত তৃণের বিছানায় লুটিয়ে পড়ে কাঁদতে থাকে।
২) সুভার সমস্ত হৃদয় অশ্রুবাষ্পে ভরে গেল কেন?
উত্তর: সুভার বিয়ের জন্য কলকাতায় যাওয়ার কথা শুনে সুভার সব হৃদয় অশ্রুবাষ্পে ভরে ওঠে।
প্রকৃতির সান্নিধ্যা সুভা চণ্ডীপুর গ্রামের পরিবেশে বেড়ে উঠেছে। সুভার মুখের ভাষা ছিল না, কিন্তু তার চোখের ভাষায় মনের অভিব্যক্তি ফুটে উঠত। সমাজের রক্তচক্ষুর ভয়ে বাণীকণ্ঠ সুভাকে বিয়ে দিতে কলকাতা যেতে চায়। কলকাতার মতো অচেনা শহরের কথা শুনে সুভার মন অশ্রুবাষ্পে ভরে ওঠে। সমাজের চাপ এবং কথা বলতে না পারার অনুভূতি তো ছিলই, সেই সঙ্গে বিয়ের মাধ্যমে চিরচেনা পরিবেশ ছেড়ে নতুন শহরের কথায় তার মন কেঁদে ওঠে।
৩) মা সুভাকে নিজের গর্ভের কলঙ্ক মনে করত কেন?
উত্তর: সুভা প্রতিবন্ধী, তাই তার মা তাকে নিজের গর্ভের কলঙ্ক মনে করত।
বাক্প্রতিবন্ধী সুভার কথা বলার ক্ষমতা নেই বলে সে সবার কাছে মূল্যহীন ও অপ্রয়োজনীয়। মায়েরা সন্তানদের সবসময়ই নিজের একটা অংশ মনে করে। পুত্রসন্তানের চেয়ে কন্যাসন্তানের ক্ষেত্রে তাদের এ বোধটি আরও প্রবল হয়ে থাকে। মেয়ে প্রতিবন্ধী হওয়ার জন্য সুভার মা নিজেকেই দায়ী বলে ভাবত। তাই সুভাকে সে গর্ভের কলঙ্ক মনে করত এবং তার ওপর বিরক্তিবোধ করত।
৪) নির্বাক সুভার চোখের ভাষা কীভাবে ভাবের স্ফুরণ ঘটিয়েছে?
উত্তর: অতলস্পর্শ গভীর চোখের ভাষার প্রভাবে সুভার মুখে ভাষা না থাকলেও ভাবের স্ফুরণ ঘটেছে।
সুভাষিণী নাম হওয়া সত্ত্বেও সুভার মুখে ভাষা ছিল না। সে ছিল বাক্প্রতিবন্ধী। কিন্তু কালো গভীর চোখের ভাষা কখনো এতটাই উদার হয়ে ওঠে যে, মনের কথার ছায়া মুখেও ফেলে। সুভার ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল। মুখে ভাষা না থাকলেও কালো গভীর চোখ কখনো প্রসারিত, কখনো মুদিত হয়ে স্ফুরিত হয়ে উঠত তার মনের ভাব। নির্বাক প্রকৃতি যেমন করে নিজ অভিব্যক্তি প্রকাশ করে ঠিক তেমনি সুভাও চোখের ভাষায় সবকিছু বুঝিয়ে দিত।



