স্তন্যদান যে কারণে জরুরি
ডা. ফারহানা মোবিন

মডেল: সুমাইয়া (মা), আরজান (ছেলে), ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
শিশুর জন্য জরুরি সব ধরনের পুষ্টি রয়েছে মায়ের দুধে। মায়ের বুকের দুধ থেকে বঞ্চিত অনেক শিশুই নানা ধরনের অসুখের ঝুঁকিতে রয়েছে। বিস্তারিত জানিয়েছেন ডা. ফারহানা মোবিন
মায়ের বুকের দুধের উপকারিতা
- নবজাতক নরমাল ডেলিভারি বা সিজারিয়ান অপারেশন, যেভাবেই জন্ম হোক, জন্ম নেওয়ার পরপরই (এক ঘণ্টার মধ্যে) মায়ের বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। এই সময়ের দুধকে বলা হয় শালদুধ। এতে সন্তানের জন্য জরুরি সব ধরনের পুষ্টি ও ভিটামিন থাকে
- শালদুধ নবজাতকের কাঁচা নাভি শুকাতে, জন্ডিস প্রতিরোধ, রোগপ্রতিরোধ শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে
- শালদুধে লেকটোফেরিন নামে এক ধরনের উচ্চমাত্রার আমিষ রয়েছে, যা ইনফেকশন প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হাম, নাভির ইনফেকশন, নিউমোনিয়াসহ ছোঁয়াচে অসুখগুলো থেকে নবজাতককে দূরে রাখে
- মায়ের দুধে উচ্চমাত্রার ভিটামিন-এ, সি নবজাতকের চোখ, ত্বক, চুল, দাঁত, মেধা বিকাশে অপরিহার্য। এতে থাকা জিংক, কপার, খনিজ লবণ সন্তানের বৃদ্ধির জন্য ভীষণ জরুরি
- ফিডারে কৌটার দুধের পরিবর্তে মায়ের বুকের দুধ পান করলে নবজাতকের চোয়াল, দাঁত শক্ত হয়
মাতৃদুগ্ধ দানে মায়েরও উপকার হয়
- স্তন, জরায়ু ও ওভারিতে ক্যানসারের ঝুঁকি কমে
- প্রসব-পরবর্তী রক্তপাতের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কমে যায়
- টাইপ টু ডায়াবেটিসের প্রবণতা কমে।
- মা ও সন্তানের মধ্যে আত্মিক বন্ধন তৈরি হয়
- নিয়মিত মাতৃদুগ্ধ দানে মায়ের জরায়ু তুলনামূলকভাবে তাড়াতাড়ি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যায়
মায়ের দুশ্চিন্তা, উচ্চ রক্তচাপ অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস হরমোনজনিত অসুখ থাকলে অনেক সময় সন্তান সঠিক পরিমাণে দুধ পায় না
মাতৃদুগ্ধ দানের কৌশল
- দুশ্চিন্তামুক্ত হয়ে শতভাগ মনোযোগের সঙ্গে সন্তানকে দুধ পান করাতে হবে
- মায়ের দুশ্চিন্তা, উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, হরমোনজনিত অসুখ থাকলে অনেক সময় সন্তান সঠিক পরিমাণে দুধ পায় না। এ ধরনের সমস্যা থাকলে চিকিৎসা নিতে হবে
- সন্তানকে দুধ পান করানোর আগে এক গ্লাস পানি এবং পরে এক গ্লাস পানি পান করতে হবে
- সন্তানকে সমান্তরালভাবে এক হাতের ওপর নিয়ে বুকের খুব কাছে নিতে হবে, আরেক হাত দিয়ে দুধ পান করাতে হবে
- মাকে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার, দুধ, ডিম, শাকসবজি, মৌসুমি ফলসহ প্রতিদিন আড়াই থেকে তিন লিটার পানি পান করতে হবে
- বুকের উভয় পাশ থেকে পান করালে একপাশে দুধ জমে ব্যথা বা ইনফেকশন হওয়ার ঝুঁকি কমবে
- মায়ের ছোঁয়াচে অসুখ থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। মায়ের দুধের মাধ্যমে অনেক ওষুধ নবজাতকের দেহে পৌঁছে যায়। তাই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ খাবেন না
- অনেক সময় শিশু দুধ টেনে খেতে পারে না। আবার অনেক মায়ের বুকে দুধ আসে না। এ ধরনের সমস্যায় নবজাতককে বারবার খাওয়ানোর চেষ্টা করতে হবে
- অনেক সময় অপরিণত বয়সের শিশু দুর্বলতার জন্য মাতৃদুগ্ধ পান করতে পারে না। মা বা শিশুর শারীরিক ত্রুটি আছে কি না, জানতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে
- মাতৃদুগ্ধের সরবরাহ নিশ্চিতে মাকে লাউ, কালিজিরা, ডাল, ডাবের পানি, দুধ, স্যুপ, সাগুদানা নিয়মিত খেতে হবে
- মাকে বাইরে যেতে হলে পাম্প মেশিনের সাহায্যে পরিষ্কার পাত্রে দুধ রাখা যাবে। শিশুকে ফিডারের পরিবর্তে বাটি-চামচ দিয়ে খাওয়াতে হবে
- মাতৃদুগ্ধ ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় চার ঘণ্টা, ফ্রিজে চার দিন সংরক্ষণ করা যায়। তবে যত তাড়াতাড়ি খাওয়ানো যায় ততই ভালো
- অনেক মায়ের বুকের দুধ অতিরিক্ত পরিমাণে সরবরাহ হয়। নবজাতক সঠিকভাবে পান করতে না পারলে কিছুটা দুধ ফেলে দিতে হবে। না হলে বুকে অতিরিক্ত দুধ জমে ব্যথা হতে পারে। অনেক সময় মায়ের স্তন শক্ত হয়ে যায়। ব্যথা থেকে অনেক মায়ের জ্বরও এসে যায়। সেক্ষেত্রে সেঁক দিয়ে, পাম্প মেশিনের সাহায্যে বের করে ফেলতে হবে। দীর্ঘদিন এ ধরনের সমস্যা চলতে থাকলে মিল্ক অ্যাবসেস নামে অসুখ হতে পারে
লেখক: মেডিকেল কর্মকর্তা, স্ত্রী ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগ, পালস পয়েন্ট হেলথকেয়ার লিমিটেড, ঢাকা




