২৫ সেপ্টেম্বর বিশ্ব ফুসফুস দিবস
ফুসফুসের সুরক্ষায় কী করবেন

ফুসফুস সুস্থ না থাকার মানে আপনি ভালো নেই। কিন্তু ফুসফুসে কেন রোগ বাসা বাঁধে? ফুসফুস সুস্থ রেখে নিজে ভালো থাকার উপায়ই বা কী? লিখেছেন ডা. মোহাম্মদ এমরান হোসেন সোহেল
ফুসফুস আমাদের শরীরের এমন একটি অঙ্গ, যা ছাড়া জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত অচল। আমরা জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে যে প্রাণশক্তি গ্রহণ করি, তার মূল কেন্দ্র এই ফুসফুস। এ বছর ফুসফুস দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘A Lifetime of Lung Health’ বা ‘জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে ফুসফুসের সুরক্ষা’।
ফুসফুসের প্রধান রোগ
আমাদের ফুসফুস নানা কারণে অসুস্থ হতে পারে। এর প্রধান রোগের মধ্যে রয়েছে অ্যাজমা বা হাঁপানি, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ বা সিওপিডি (COPD), নিউমোনিয়া, যক্ষ্মা বা টিবি (TB), ব্রঙ্কিয়েক্টেসিস, ইন্টারস্টিশিয়াল লাং ডিজিজ, ফুসফুসের ক্যানসার এবং শ্বাসনালির বিভিন্ন সংক্রমণ।
অ্যাজমা: এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসনালির রোগ। ধুলোবালি, ধোঁয়া, পরাগরেণু, ঠান্ডা বাতাস কিংবা কিছু বিশেষ সংক্রমণে এর উপসর্গগুলো বেড়ে যেতে পারে। এতে কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুকে চাপ বা ভারী লাগা এবং শ্বাসের সঙ্গে বাঁশির মতো শাঁই শাঁই শব্দ বা হুইজিং হতে পারে।
সিওপিডি (COPD): সাধারণত দীর্ঘদিনের ধূমপান, বায়ুদূষণ বা কর্মক্ষেত্রের ধুলোবালি ও ধোঁয়ার সংস্পর্শে এই রোগ হয়। দীর্ঘস্থায়ী কাশি, কফ, পরিশ্রমে শ্বাসকষ্ট এবং ধীরে ধীরে দৈনন্দিন কাজের সক্ষমতা কমে যাওয়া এর মূল লক্ষণ।
নিউমোনিয়া: এটি ফুসফুসের একটি গুরুতর সংক্রমণ, যা ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা অন্যান্য জীবাণুর কারণে হয়ে থাকে। এতে জ্বর, কাশি, কফ, শ্বাসকষ্ট, বুকের ব্যথা ও চরম দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং আগে থেকেই অন্য কোনো রোগে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া খুব দ্রুত গুরুতর রূপ নিতে পারে।
যক্ষ্মা (TB): বাংলাদেশে ফুসফুসের যক্ষ্মা একটি অতি পরিচিত সংক্রামক রোগ। দীর্ঘমেয়াদি কাশি, জ্বর, ওজন কমে যাওয়া, ক্ষুধামান্দ্য এবং ক্ষেত্রবিশেষে কফের সঙ্গে রক্ত আসা এর অন্যতম সতর্কতামূলক লক্ষণ।
ফুসফুসের ক্যানসার: এই রোগ দীর্ঘদিন শরীরে নীরবে থাকতে পারে। তবে দীর্ঘস্থায়ী বা পরিবর্তিত ধরনের কাশি, কাশির সঙ্গে রক্ত যাওয়া, বুকে ব্যথা, ওজন কমে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট বা বারবার বুকের সংক্রমণ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। ধূমপান ফুসফুসের ক্যানসারের প্রধান ঝুঁকির কারণ। পাশাপাশি বায়ুদূষণ এবং কিছু পেশাগত রাসায়নিকের ক্ষতিকর সংস্পর্শও এই ঝুঁকি বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়।
কোন লক্ষণগুলো অবহেলা করা উচিত নয়
সর্দি-কাশি বা সাময়িক শ্বাসকষ্ট অনেক সময় সাধারণ কারণেও হতে পারে। তবে তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে কাশি থাকা, বারবার শ্বাসকষ্ট বা হুইজিং হওয়া, কাশির সঙ্গে রক্ত আসা, দীর্ঘস্থায়ী বুকের ব্যথা, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, বারবার নিউমোনিয়া বা বুকের সংক্রমণ হলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়।
বিশেষ করে ধূমপায়ী, বয়স্ক ব্যক্তি, দীর্ঘদিন বায়ুদূষণের মধ্যে থাকা মানুষ এবং যাদের পারিবারিক বা পেশাগত ঝুঁকি রয়েছে, তাদের এসব উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
ফুসফুস ভালো রাখার উপায়
ফুসফুস সুস্থ রাখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো ধূমপান সম্পূর্ণ বন্ধ করা। শুধু সিগারেট নয়; জর্দা, গুলসহ সব ধরনের তামাকই ফুসফুসের জন্য ক্ষতিকর।
যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলো, শিল্পকারখানা এবং ঘরের ধোঁয়া ফুসফুসের ক্ষতি করতে পারে। রান্নার সময় পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করা, পরিষ্কার জ্বালানি ব্যবহার এবং অতিরিক্ত দূষণের সময় বাইরে অবস্থান কমানো উপকারী।
নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম যেমন, বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী হাঁটা, সাইক্লিং বা অন্যান্য ব্যায়াম করা যেতে পারে। তবে দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্ট বা হৃদরোগ থাকলে ব্যায়ামের ধরন চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত।
সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রয়োজন অনুযায়ী ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিউমোকক্কাল ও কভিড-১৯-এর টিকা নেওয়া, হাত পরিষ্কার রাখা এবং সংক্রমিত ব্যক্তির কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা জরুরি। সিওপিডি রোগীদের ক্ষেত্রে টিকাদান ও ধূমপান বন্ধ করা রোগের জটিলতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ফুসফুসের ব্যায়াম
ডায়াফ্রাম্যাটিক ব্রিদিং: পিঠে ভর দিয়ে শুয়ে বা আরামে বসে কাঁধ ও ঘাড়ের পেশি শিথিল রাখুন; এক হাত বুকের ওপর এবং অন্য হাত পেটের ওপর রাখুন। নাক দিয়ে ধীরে ধীরে ২ সেকেন্ড শ্বাস নিন, যাতে বুক স্থির থাকে এবং পেটের হাতটি ওপরের দিকে ওঠে। এরপর ঠোঁট গোল করে বা বাঁশি বাজানোর মতো করে ২ সেকেন্ড ধরে মুখ দিয়ে ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়ুন।
পার্সড-লিপ ব্রিদিং: চেয়ারে সোজা হয়ে বসে ঘাড় ও কাঁধের পেশি সম্পূর্ণ শিথিল করুন। মুখ বন্ধ রেখে নাক দিয়ে গভীরভাবে এবং ধীরে ধীরে বাতাস গ্রহণ করুন। এরপর মোমবাতি নেভানোর মতো ঠোঁট সামান্য ফাঁক করে বা কুঁচকে অন্তত দ্বিগুণ সময় নিয়ে আস্তে আস্তে মুখ দিয়ে সব বাতাস বের করে দিন।
রিব স্ট্রেচ : সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বা বসে দুই হাত কোমরে রাখুন। গভীরভাবে নাক দিয়ে শ্বাস নিয়ে ফুসফুস ও বুক পূর্ণ করুন। এরপর সুবিধাজনক সময় (১০ থেকে ১৫ সেকেন্ড) শ্বাস আটকে রাখুন এবং ধীরে ধীরে মুখ বা নাক দিয়ে ছেড়ে দিন।
আজ থেকেই শুরু হোক ফুসফুসের যত্ন
ফুসফুসের স্বাস্থ্য কেবল অসুস্থ হলে চিকিৎসা নেওয়ার বিষয় নয়; এটি একটি আজীবন সচেতনতার ব্যাপার। শিশুর বেড়ে ওঠার সময় তার জন্য ঘরের ভেতরে ও বাইরে পরিষ্কার বাতাস নিশ্চিত করা থেকে শুরু করে তরুণ প্রজন্মকে ধূমপান ও ভ্যাপিং থেকে দূরে রাখা, কর্মজীবনে পেশাগত ঝুঁকি কমানো এবং বয়স্কদের দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগের সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা— জীবনের প্রতিটি পর্যায়েই আমাদের সচেতন হতে হবে।
লেখক: বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ, নোয়াখালী মেডিকেল কলেজ, নোয়াখালী ।



