জাতীয় ফুটবলারের জীবনে ঘোর অমানিশা

রেহেনা আক্তার, ছবি: রেহেনার সৌজন্যে
দুয়ারে বিশ্বকাপ। ফুটবলজ্বরে আচ্ছন্ন দুনিয়া। এমন সময়ে দেশি ফুটবলের এক গর্বিত তারকা ধুঁকছেন জীবনযুদ্ধে। জাতীয় নারী ফুটবল দলে টানা ছয় বছর খেলা রেহেনা আক্তারের সংগ্রামের গল্প শোনাচ্ছেন আখলাকুজ্জামান অনিক
গ্রামের নাম সাঙ্গুর। ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার শুক্তাগড় ইউনিয়নের ছোট্ট একটি পাড়া। এর গায়ে লেগে থাকা কাদামাটি আজও রেহেনার ফুটবল জুতার ফাঁকে লুকিয়ে রয়েছে। কিন্তু সেই জুতা জোড়া পরে তিনি আর মাঠে নামেন না। ঘরের ধুলোয় অযত্নে পড়ে থাকা জুতাগুলোর দিকে তাকালে চোখে জল আসে তার।
সাঙ্গুরে রাস্তার পাশে একটি ছোট্ট ঘর। স্কুল মাঠের ঠিক পাশেই। ঘরের ভেতরে দেয়ালে টাঙানো একেকটি মেডেল আর ট্রফি ঝকমক করছে। কিন্তু প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে অন্দরমহলে নিস্তেজ হয়ে পড়ে রয়েছেন রেহেনার বাবা মোহাম্মদ শাহালাম আকন। মা নাসিমা বেগম মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে আক্রান্ত হয়েছেন তিনবার। ঘরের কোণে ছোট্ট বিছানায় তিনিও দিনভর নির্বাক পড়ে থাকেন। অসুস্থতাকে চিরসঙ্গী করা এই মা-বাবার স্মৃতির চৌহদ্দিতে হয়তো ক্ষণে ক্ষণে উঁকি দিয়ে ওঠে কন্যা রেহেনা আক্তারের উদ্দাম দিনগুলো। একসময় যিনি খালি পায়ে মাঠে নেমে বলের পেছনে ছুটতেন; তারপর বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলে খেলেছেন টানা ছয় বছর। পুরো বরিশাল বিভাগের তিনিই একমাত্র নারী ফুটবলার, জাতীয় দলে এতদিন খেলার গৌরব রয়েছে যার।
ফুটবল খেলে যে টাকা পেতেন, সব চলে গেছে মা-বাবার চিকিৎসায়। তার ওপর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার খরচ
বিকেএসপিতে নারী ফুটবলের যাত্রা শুরু হয়েছিল মাত্র পাঁচজন মেয়েকে নিয়ে। রেহেনা তাদেরই একজন। সেখান থেকে অনূর্ধ্ব-১৪ জিএফ কাপ খেলে জাতীয় দলে ডাক পান ২০১৮ সালে। তারপর একে একে অনূর্ধ্ব-১৫, অনূর্ধ্ব-১৬, অনূর্ধ্ব-১৮, অনূর্ধ্ব-১৯, অনূর্ধ্ব-২০— বয়সভিত্তিক প্রতিটি পর্যায়ে খেলে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপানোর সৌভাগ্য হয় তার।
ফুটবল মাঠের অনেক সুখস্মৃতি আছে রেহেনার। সবচেয়ে স্মরণীয় ম্যাচ অনূর্ধ্ব-১৯-এর হয়ে। মাঠে এত দর্শক এসেছিল, দাঁড়ানোর জায়গা ছিল না। সেদিন রেহেনার মনে হয়েছিল, স্বপ্ন সত্যি হয়েছে।
২০২৪ সালে এই তারকা ফুটবলারের জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূত্রপাত ঘটে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান তিনি, লোকপ্রশাসন বিভাগে। কিন্তু প্রথম সেমিস্টারেই মুখোমুখি হন সর্বনাশা ঝড়ের। তার বাবা আক্রান্ত হন প্যারালাইসিসে। এ ধাক্কায় পড়াশোনা থেমে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল তার। অনেক কষ্ট করে কোনোমতে সামলে নেন। তারপর খাঁড়ার ঘা হয়ে আসে মায়ের অসুখ। সংসারে আরও আছেন রেহেনার বড় ভাই আর বড় বোন; সঙ্গে বোনের ছোট তিন সন্তান। ভগ্নিপতির আয় যৎসামান্য। বড় ভাই পরিশ্রমী; কিন্তু সবসময় কাজ পাওয়া মুশকিল। যতটুকু আয় করেন, তা দিয়ে ভাইয়ের পক্ষে নিজের সংসার আর সন্তানদের খরচ মেটানো অসম্ভবপ্রায়। এখন সংসারে মা-বাবার দায়িত্ব রেহেনার কাঁধেই।
ফুটবল খেলে যে টাকা পেতেন, সব চলে গেছে মা-বাবার চিকিৎসায়। তার ওপর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার খরচ নিজেকেই বহন করতে হয়। একসময় বুঝতে পারলেন, কঠিন সময়ের মুখোমুখি তিনি, যেখানে অনিশ্চয়তা আর ঘোর অমানিশা নিত্যসঙ্গী। কখনো কারও কাছে আর্থিক সাহায্য না চাইলেও, তাই এবার দ্বিধা ও লাজ ভুলে বাড়িয়েছেন হাত।




